পৃষ্ঠাসমূহ

ওয়াহিদ সুজন লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
ওয়াহিদ সুজন লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

শিল্পের জগত: অমরত্বের সাথে পাতি খেলাঘর

শিল্পের জগত: অমরত্বের সাথে পাতি খেলাঘর 
ওয়াহিদ সুজন
.
শিল্প সম্পর্কে আমাদের বিবেচনা “কি”? অথবা “কি হওয়া উচিত?” প্রথমটি নিয়ে আপাতত সন্তুষ্ট হতে হবে, “'হয়'” (কি) না বুঝে “'“উচিত”'” এর প্রশ্নে কিভাবে যাওয়া যেতে পারে। শিল্পকে নিতান্ত জাগতিক বিষয় আকারে দেখা যেতে পারে, এই বিশ্বে দৈনন্দিন চাহিদার জায়গায় সে জ্ঞাতে হোক আর অজ্ঞাতে তার নিজের স্থান দখল করে নিয়েছে। কিন্তু কি আকারে? এইখানে কৌতুহল জাগায়। এর সাথে অপার্থিব ঘ্রাণ লেগে আছে বুঝি। দ্বিধা নিয়ে বলছি শিল্প বলতে এমন কিছু একটাকে বুঝছি, যা সচরাচর অন্যান্য বিদ্যমান সম্পর্কের ভেতর ভিন্ন ভিন্ন রূপে ধরা পড়ে কিন্তু তার মাঝে অন্যান্য ঘটনার সাথে জাহিরী বাতেনী দুই পার্থক্যই ঘটে। যা দেখার চোখে নয় অন্য চোখে ধরা পড়ে। অর্থাৎ আমরা দেখি, বুঝি তাদের অর্থে দ্ব্যর্থক ভাব প্রবল হয়ে উঠে। এই পার্থক্যগুলোকে আমরা সরলভাবেই, অনেকক্ষেত্রে না বুঝে অভ্যাসের কারণে ব্যবহার করি। শিল্প বিষয়টি এমন যে, সে দৈনন্দিন সাধারণ কিছু কিন্তু এর মানেটা অসাধারণ। তাই একে নির্ধারণ করতে গেলে এক ধরণের ভাষাগত এবঙ চিন্তাগত সংকট প্রকট হয়ে উঠে (একজন শিল্পী সচরাচর এই ধরণের ভাবনা মোকাবেলা করে কাজ শুরু করেন কি!)। অন্যভাবে, শিল্পকে তার ভাবের স্থান হতে বুঝতে হবে। শিল্পের বোঝাপড়া শিল্পের তুলনামূলক আলোচনায় কিছুটা সম্ভব। কিন্তু, এখানে ত্র“টি থাকে। যেহেতু এই দেখাটা ভেতরকার জিনিস তাই কোন বিবেচনাকে আমি সহী বলব তাও সমস্যা। তাই বলি, মন যা চায় তাই কর ... এই মনটা আসলে কোন মন? শিল্প তার ধরণ, চলন-বলন, অন্তর্গতভাবে কোন সত্যকে ব্যাখ্যা করে, উৎপাদন করে, তার বিকাশ এবঙ জগতে এর কি প্রতিরূপ দেখতে পায় তার সাথে গভীরভাবে শিল্পীর অন্তর্দৃষ্টিকে প্রতিফলিত করে, তা একজন শ্রোতা দর্শক বুঝতে পারুক আর নাই পারুক। তাই শিল্পীর অসীম স্বাধীনতার জায়গায় দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করি শিল্পীর মন কোন মন? সে কি খাওয়া পরার চিন্তা করে যে মন, তার চে’ আলাদা কিছু?
.
শিল্পের সংজ্ঞায়নে আমরা অপরাপর বিষয়ের মতো জটিলতায় আক্রান্ত হই। সংজ্ঞায়ন কোন কিছুকে চিহ্নিত করতে ঐ বিষয়ের অনন্য বৈশিষ্ট্য নিয়ে হাজির যেখানে ভেদজ্ঞান প্রবল কিন্তু সহসা সম্পর্কের সুত্রগুলো আবিষ্কার কঠিন হয়ে উঠে এবঙ শিল্পের ভেতরকার নানা বিপরীতমুখী চরিত্র তাও বুঝা কঠিন। যদি শিল্পকে বিষয়ীর অন্তর্দৃষ্টির দিকটি বিবেচনা করতে বলি, তবে তো ভাব বিনিময়ে যত অনুপত্তি আছে সকলেই এতে সামিল হয়, আবার শুধুমাত্র বিষয় বিবেচেনায় এতো বেশী যান্ত্রিক হয়ে উঠতে পারে এর গুঢ় রস বুঝা আপনার আমার দুঃসাধ্য। এখানে ভাব এবঙ বস্তু কোথায় সাধন সঙ্গী হয়ে উঠে, আমাকে হৃদয়ের সে ঘরে পৌঁছুতে হয়, যেখানে অহর্নিশ খেলা করে ভাব রসের পিরীতি। এখন টলস্টয় হতে বলি, “‍"শিল্প একটি মানবিক ক্রিয়া। শিল্প সৃষ্টির প্রক্রিয়া এরূপ কোন ব্যক্তি আপন হৃদয়ে উপলব্ধ অনুভূতিকে বাহ্য অভিজ্ঞানের সাহায্যে অপরের চিত্তে সঞ্চারিত করেন এবঙ অপরেও যখন অনুরূপ ভাবানুভূতি দ্বারা সংক্রমিত হন এবঙ আপন হৃদয়ে অনুরূপভাবে উপলব্ধি করেন, তখনি শিল্পের জন্ম"।” টলস্টয় তার শিল্প ভাবনা সহজভাবেই প্রকাশ করেছেন। কিন্তু সহজ আসলে জটিলতার নামান্তর। ব্যক্তিতে ব্যক্তিতে ভাবালাপে যে বিরোধ তা সহজে মুছে যাবার নয়। ভাব রসের যে পিরীতি তাতে নোঙর করা তত সহজ ঠেকে না। তাহলে কি করা যায়? আপাতত এই সমস্যাকে মোকাবেলা করতে নিজের ভেতর ডুব দিয়ে দেখি। 
.
শিল্পচেতনা স্বভাবগত। স্বতস্ফুর্ত, স্বজ্ঞাজাত এবঙ সৌন্দর্যময়। নন্দন, সৌন্দর্যের প্রতি ব্যক্তির প্রবণতা যান্ত্রিক নয়। সে তার কথা-বার্তা, হাঁটা-চলাসহ সকল কাজের ভেতর দিয়ে এই বোধের প্রকাশ করতে চায়। শুধু তাই নয় সে তার শিল্পবোধের অন্বেষণও করে। জগতের সাথে তার যে বোঝাপড়া সেখানেও সে যে কোন প্রাকৃতিক বিষয়ের শিল্পরূপ খুঁজতে ব্যাকুল। শিল্পের প্রতি এক ধরণের অনিবার্যতা আরোপিত হয়, কিন্তু একে বুঝার যে কাতরতা তা সবার মধ্যে সচেতন থাকে না। আমরা মানবিক বাসনার দিকে চোখ ফেরাতে পারি, মানুষ নিজেকে প্রকাশ করতে চায়। তা অবশ্যই নানা ধরণের প্রয়োজনকে চিহ্নিত করে। বার্ট্রান্ড রাসেল যখন মহাজাগতিক নিঃসঙ্গতার (কেন মানুষ চিন্তা করে?) কথা বলেন, অজান্তে মন সায় দেয়। মহাজাগতিক নিঃসঙ্গতাবোধ মানুষকে শুধু চক্ষু কর্ণের দেখা শোনায় স্বস্তি দেয় না। আমাদের দেখার জগত সাজাতে অদেখা উপলব্ধির নানা ভূমিকা আছে। সে কারণে আমরা আমাদের অন্যান্য বোধের সাথে শিল্পবোধকে এক করে দেখি না। অর্থাৎ, এই প্রয়োজনটা আকারে প্রকারে ভাবে আলাদা সত্ত্বা হয়ে উঠে। ঘটনা যাই হোক, নিজেকে প্রকাশের পেছনে অন্যকে নিজের অনুভূতির সাথে সমভাবাপন্ন করার ঘটনা কাজ করে। (কেউ কেউ বলেন, তারা যাই করেন নিজের আনন্দের জন্যই করেন, অবশ্যই নিজের জন্য। কিন্তু এই কথাকে চূড়ান্ত বলে প্রচার এক ধরণের হাস্যরসের সৃষ্টি করে।) সে কাজ সহজ বা দুরূহ হোক না কেন, আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ এর ব্যাঞ্জনার দিকটি। একজন ব্যক্তিকে আমি আমার দৈনন্দিন ক্রিয়ার বর্ণনা দিতে পারি। বিষয় বা প্রকরণে বা তথ্য আকারে সে তার কাছে নিতান্ত স্বাভাবিক বা নতুন কোন অর্থ বা অনুভূতি তৈরীতে ব্যর্থ হতে পারে, এমনকি আমার এমন কোন অভিপ্রায় নাও থাকতে পারে। কিন্তু আমার বর্ণনাদানের ভঙ্গিমায় এমন কিছু থাকতে পারে যা শিল্প পদবাচ্য হতে পারে। এমন কি তা দৈনন্দিন জীবনের কোন গুঢ় অনুভূতি বহন করতে পারে। এখানে বিষয়ের 'চে’ ভাব প্রধান। শিল্পের ব্যাপকতর পটভূমিকায় আমি সংক্রান্ত উদাহরণটি দেয়ার সাহস করা গেলো। তাছাড়া, আজকাল রন্ধনকে শিল্প বলা হয় এবঙ এবার চিন্তা করুন সেটা কোন পর্যায়ে। কিন্তু শিল্পের সাথে সাধারণ দৈনন্দিন ঘটনা বর্ণনার ব্যাপকতর পার্থক্য আছে। তাই টলস্টয়ের সংজ্ঞার মানেটা সহজ নয়।
.
একজনের দুঃখ কষ্ট আনন্দ বেদনা বাস্তবিকই অন্যের ভেতর একই ধরণের অনুভূতি জাগ্রত করতে পারে। এতে বিচ্ছিন্নতা সূত্রহীনতা থাকতে পারে এবঙ এর সাথে আপনি অন্যদের বোধগুলো একই সাথে অনুভব নাও করতে পারেন। কেনই বা করবেন। এটা হলো মর্মের জায়গা। শিল্প সেই স্থানকে জাগ্রত করে। একজন শিল্পী তার অনুভূতির মর্মে গিয়ে তার বিষয়কে দেখেন, এবঙ এমনভাবে দেখেন বিষয়ের সাথে একাত্ম হয়ে, উপস্থাপন করেন এবঙ উপস্থাপনের সাথে অন্যের সাড়া আশা করেন। এটা কাল্পনিক কোন বিষয় হতে পারে। কিন্তু শিল্পের বাস্তবতা হলো প্রকৃতির মতো অস্তিত্ব তৈরী, অর্থদান করা, তাই এর আলাদা বাস্তবতা এবঙ বাস্তববোধ আছে। যেমন- বিমূর্ত শিল্পকলা এই বাস্তব জগতের বিষয়, এর রঙ রূপ রেখার ভেতর দিয়ে একজন শিল্পী যে ভাষা তৈরী করুন না কেন, একজন দর্শক যখন তা দেখেন তখন তিনি মনে করেন তিনি শিল্পীর অনুভূতি, অনুভূতির বাস্তব অবস্থার কাছাকাছি পৌঁছেছেন। অথবা প্রতীকীকরণের মধ্য দিয়ে নিজের ভাবকে মূর্ত করা, প্রতীকের নিজস্ব ধরণ হলো, একের ভেতর ব্যাপকতর অর্থ ধারণ করা। জগত বাস্তবতার শর্তের ভেতর দিয়ে দেখা নয় বরঙ নতুন বাস্তব অস্তিত্ব তৈরীর ভেতরও এর সত্যতা প্রতিষ্ঠা করে। এখন একজন কোন বাস্তবতা তৈরী করতে চান বা দেখাতে চান তা হলো কথা। এই কারণে শিল্পকে সবসময় শুভ বিবেচনা চলে না, এর ভেতর মারাত্মক স্খলনের বীজ লুকিয়ে থাকতে পারে। সে যাই হোক, বিমূর্ততার সাথে সাথে কবিতা নাটক চিত্রকলায় আমরা আমাদের জীবনের চিত্রকে দেখার কৌতুহল পোষণ করি। তা কি হুবহু এই যাপিত জীবনটাই। না, এটা এই জীবনটাকে যাপনের স্থান হতে এক কদম এগিয়ে অংকন করে। শিল্পী তার শিল্পকর্মে সর্বদর্শীর(!) ভূমিকা পালন করতে চান। এতে কাজ করে পরিমার্জন মূল্যায়ন নির্মাণের ধারণা। এবঙ শিল্পের ইতিহাস মানবের ভাব আদান প্রদানের ইতিহাসের সাথে সমান তালে এগিয়েছে। গুহাচারী মানুষ বৈরী পরিবেশ মোকাবেলা করে দলগতভাবে পশু শিকারে বেরিয়েছে, আবার তার অতীত ও ভবিষ্যতকে সমান তালে গুহার দেয়ালে অংকন করে গেছে। অর্থাৎ মানুষ বৈরী দুনিয়ায় তার ইচ্ছে পূরণের নানা মতা লাভ করেছে। মানুষের আশা আকাঙ্খা যে সত্যকে জয় করতে চায়, শিল্পরূপেই সে জয়ের সূচনা ঘটে। 
.
এখানে স্পষ্টভাবে ধর্মের প্রসঙ্গ আসে। ধর্ম আর শিল্প, এমন কি স্পষ্টভাবে ধর্ম আর শিল্প-সংস্কৃতি একই জিনিস নয়। কিন্তু এদের মধ্যে এক ধরণের সম্পর্ক আছে। শিল্পচেতনা নেই এমন ধর্ম পাওয়া যায় না। ধর্মের যে সত্য দাবী তার সাথে শিল্প সত্যের মিল হলো সত্য চূড়ান্ত আকারে এক, তা স্বীকার করা হোক বা না হোক। আমরা দেখি গ্রীক নাট্যকলা অথবা ভারতীয় নৃত্য অথবা শাস্ত্রীয় সংগীত, বিভিন্ন ধর্মীয় আচরণের উৎস শিল্পজাত এবঙ এদের বিকাশ ধর্মীয় আর্তি ও নিবেদনের মধ্য দিয়ে ঘটেছে। অন্যভাবে বললে, জ্ঞাত বিশ্বের শিল্পের প্রধানতম উৎস হলো ধর্ম। অর্থাৎ “ধর্মের সাথে শিল্পের সখ্য তার আবির্ভাবকালে”। শিল্পের যে অস্পষ্টতা ও নিরেট রহস্য, ব্যক্তিতে ব্যক্তিতে তার বিকাশ ঘটে ধর্মের চেয়ে আলাদা, কিন্তু ধর্মীয় প্রণোদনাহীন নয়। ধর্ম সিদ্ধান্তমূলক এরপর বিচার বিবেচনার প্রশ্ন এখানে প্রায় নির্ধারিত, যদিও বিচার বিবেচনার প্রশ্নে সত্যকে খোঁজা ধর্মীয় দায়িত্ব বটে। আমরা ধর্মের প্রচলিত রূপের কথাই বলছি। শিল্পের যে বিকাশ তাতে ব্যক্তি সিদ্ধান্ত আকারে একে গ্রহণ করে না এবঙ শিল্প জগতে মূর্ত আকারের চেয়ে বিমূর্ততাই বেশী, শিল্প নির্ধারিত হয় ব্যক্তির স্বাধীনতা, স্বকীয়তা, সময়কাল এবঙ জ্ঞানগত উপলব্ধি হতে, ব্যক্তিকেই কুশলীর ভূমিকা নিতে হয় এবঙ শিল্পী তার শর্তযুক্ত ও ক্ষণস্থায়ী অস্তিত্ব নিয়ে সচেতন থাকে। এ সকল স্পেস ধর্মে আছে কিন্তু যে টেক্সট দ্বারা ধর্মীয় জীবন চালিত হয় তাতে ধর্ম দ্বারা শিল্পকে ব্যাখ্যা করতে হয়। ধর্মের জাহিরী অংশে এই ধরণের সুযোগ পাওয়া কঠিন (কিন্তু এটা এমন বিষয় যেখানে সীমিত স্বাধীনতার ভেতরে শিল্পী তার কুশলতার ধারণাতীত ব্যাপ্তি ঘটাতে পারে), তাকে আবশ্যকীয় সাধারণ নিয়মের মধ্য দিয়ে এগুতে হয়, তাই বাতিনী অংশে সৃজনশীলতা, শিল্পের নানা সুযোগ থাকে। “শিল্প আমাদের যা বলে এবঙ যেভাবে বলে তা ধর্মীয় বাণীর মতই অবিশ্বাস-অনিন্দ্য মনে হয়”। এবঙ “শিল্প মানেই সৌন্দর্য সৃষ্টি নয়... সত্য অনুসন্ধানের পথে এক বিপ্লব”। কিন্তু এতে নানা ধরণের ফাঁদ বিদ্যমান। একজন চাইলে তার সদ্ আকাঙ্খা এবঙ স্রষ্টার প্রতি বিশ্বাস হতে যে কোন কর্মকে প্রার্থনায় রূপান্তরিত করতে পারে। বিষয়কে শিল্পী কিভাবে নেবে এটা তার ব্যাপার। আগেই বলা হয়েছে, শিল্পের চরিত্রে নানা বিপরীতমুখী প্রবণতা বিদ্যমান, ফলতঃ এটা শিল্পীর একার দায়িত্ব। দায়িত্ব হিসেবে কঠোর এবঙ কঠিন। তাছাড়া কোন নির্দিষ্ট ধর্ম যেহেতু সার্বজনীন আকার লাভ করে না, তাই এই আলোচনা আলাদা বটে। মোটা দাগে শুভ-অশুভ, সত্য-মিথ্যা, নৈতিকতার স্থান হতে শিল্পে ধর্মের ছায়া অনস্বীকার্য। আর শিল্প সম্পর্কে আমাদের বিবেচনা এটা স্বভাবগত মানবিক ক্রিয়া । 
.
শিল্পের অনুসন্ধানের বিবেচনায় নিজেকে সামনের দিকে এগিয়ে নেয়া। আমাদের যাপিত জীবন নানা মোড়কে ঢাকা। সে মোড়ক উন্মোচনে শিল্প এগিয়ে আসে। শিল্পে সে গন্তব্য বিন্দু অনুসন্ধান করে। এক বাস্তবতা হতে অপর বাস্তবতায় পাড়ি দেবার আকাঙ্খা পোষণ করে। সে বাস্তবতা আমারই। বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসবে নানা প্রতীকায়নের ভেতর দিয়ে তীব্রভাবে ধারণ করে অপর বাস্তবতায় মুখোমুখি হবার ঘটনা। সে সংগীতে নৃত্যে আরাধ্যের কাছাকাছি পৌঁছে নিজেকে বিলীন করে দেয় তার জন্য নির্ধারিত স্বর্গরাজ্যে। গুহাবাসী মানুষ শিকার যাত্রার পূর্বে অংকিত ছবিতে তার গোত্রীয় জীবন, অবাধ্য পশু এবঙ সফল শিকারকে বর্ণনা করে। সেখানে যে শক্তিমত্তা সবলতাকে উপাসনা করে, তা অপর বাস্তবতাকে সম্ভব করে তোলার শক্তিশালী হাতিয়ার। শুধুমাত্র নান্দনিকতা সৌন্দর্য দিয়ে শিল্পকে বিচার করলেও একই ধরণের ভাবের উদয় হয়। এটি নিয়তির এক নিরাবেগ বিচরণ যেন। পপাত বলছি না এ কারণে, আমাদের নিয়তির সত্যরূপ হলো নির্মোহ নিরাবেগ এবঙ নিরপে। ধারণাটি অধিবিদ্যক হলেও সত্য বলতে এর চেয়ে সহজ কিছু হয় না। তাই দ্ব্যর্থক শিল্প নানা জাতের নিমোর্হতাকে প্রশ্রয় দেয়। এবঙ সে সংশয়ী, প্রশ্নমূলক, পরীণের ভেতর দিয়ে অগ্রসর হয় এবঙ ফলতঃ পরিবর্তনশীল। এক অফুরন্ত পথ বেয়ে হাঁটে, শিল্পের সম্ভাবনা প্রায় অমরত্বের কাছাকাছি। তাকে একের পর এক পথ পাড়ি দিয়ে চলতে হয়। সন্তুষ্ট হতে না পারার মধ্য দিয়েই নির্মিত হয় মহৎ শিল্পকর্মগুলো। অনুভূতির সর্বোচ্চ প্রকাশেই সে অহর্নিশ আরোহণ করে কিন্তু প্রতিটি মুহুর্ত একদম আলাদা। পরমের কোন শ্রেণী বিন্যাস নাই, কিন্তু তাকে পাওয়ার পথ নানা ধাপে বিভক্ত। এই প্রসঙ্গে “সী মোরগ” (ফরিদ-উদ-দীন আত্তার: মানতিকুত্ তুয়ুর) গল্পটি উদাহরণ হিসেবে অনন্য। কথাগুলো পুনরাবৃত্তি হলেও বলতে হয়, শিল্পের সত্য অনুসন্ধান নিজেকে বুঝার, নিজেকে বুঝতে গিয়ে অপরকে বুঝতে পারারই ঘটনা। বাউলদের মতোই বলি, “যা নাই ভাণ্ডে, তা নাই ব্রক্ষ্মাণ্ডে”। এক মানবের যাত্রা হয়ে উঠে বিশ্বমানবের পথ চলা।  
.
শিল্পকলা অনুভূতির বাহক এবঙ তার বাহ্যিক সাফল্য হলো শিল্পী তার অনুভূতি অন্যের ভেতর সংক্রামিত করতে পারেন। এই অর্থে একটি শিল্পকর্ম একজন ব্যক্তি শিল্পীকেই হাজির করে, যে কিছু করে দেখায় তার মনন স্বাধীনতা স্বাজ্ঞিক উপলব্ধি কিভাবে বিশ্ব মননকে ধারণ করে। কেউ কেউ বলেন, শিল্পীর অনুভূতিটাই আসল। শিল্পকর্মটুকু উপজাত মাত্র। মানুষ ধর মানুষ ভজ শোন বলিরে পাগল মন। সে তার বিষয়কে কিভাবে তার আত্মার মধ্যে স্থাপন করে, কি খুঁজে পায়, কোন গন্তব্যে গেল কর্মটুকু তারই হদিস দেয় মাত্র, বাকীটুকু পড়ে থাকে তার আত্নায়। তাহলে শিল্প সমালোচনা শুধুমাত্র কর্মটুকু নিয়ে, বাকীটাতে তার বিশ্বাস নৈতিকতা ইত্যাদি ঘুরে ফিরে আসে। মহৎ শিল্প মাত্রই মহৎ শিল্পীর পশ্চাতাবলম্বন করে। নীৎসে যেমন বলেন, “শেষ খৃষ্টান শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন ক্রুশবিদ্ধ হয়ে”। শিল্পীর সাথে তার শিল্প সম্পর্ক এমনই। ধর্ম চলে গেলে ধর্মতত্ত্ব নিয়ে মারামারি কাটাকাটি ব্যাপকই হয়।  
.
মানুষের সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম বোধ, সরল অনুভূতিগুলো শিল্পে প্রাণ লাভ করে। তার যাত্রা সত্যমুখী হয়ে উঠলে যে ভেদগুলোর কারণে মানুষ সত্যবস্তু লাভ করে না, তার হদিস দেয়। এর ভেতর দিয়ে মানুষের ভেতরকার শুভ-অশুভের দ্বন্দ্ব জাগ্রত হয়। সবকিছুতে ব্যতিক্রম আর বৈপরীত্য আছে বৈকি। মানবজীবনে সত্য শিব মঙ্গলের ছায়া যেখানে আছে মানুষ তাকেই মনে রাখে- সেবা করে। শিল্প শুভশক্তির সাথে অশুভের ফেরি করে বেড়ায়। জাগতিক বেদনা, হতাশা, উত্তরণহীন মনন, পীড়নকারী অতীত, বাজারমুখীতা, নিজেকে জাহির করার প্রবণতা জীবনের চারিপাশে অশুভের বিস্তারকে প্রধান করে দেখায়। শিল্প খুঁজে চলে অমরত্বের নির্ঝরিণী, তখন সে বোধ লোপ পায়। “নষ্টদের দলে” যাওয়াই নিয়তি হয়ে উঠে। শিল্পকে কলুষিত করে বিবেককে কলুষিত করে। কেনই বা শেষ খৃষ্টান ক্রুশবিদ্ধ হয়? শিল্প ধর্ম নয় কিন্তু ধর্মের মতো নিজেকে কায়াহীন করে তোলার নামান্তর। আবার একই সাথে সে সামাজিক রাজনৈতিক ধার্মিক হয়ে উঠার বাহন। কিন্তু সে এইসবের দিব্যি দেয় না। কারণ কালের বেদনা ধারণ করতে সে তৎপর। সে যেমন সৌন্দর্যের দেখা/অদেখা রূপ অনুসন্ধান করে, তেমনি কষ্ট, লাঞ্ছনা, নিগ্রহণের ভেতর দিয়ে সে শান্তির পথ অন্বেষণ করে। আমরা ভয়াবহ যুদ্ধ দেখি দুর্ভি দেখি আবার দেখি শেষ পর্যন্ত কিভাবে মানুষ টিকে থাকে। হেমিংওয়ের ভাষায়, “মানুষ মরে কিন্তু পরাজিত হয় না”। এই জয়ী হবার বাসনা শিল্পীর নানা সৃষ্টিতে মূর্ত হয় প্রথমে। জয়নুলের দুর্ভি চিত্র, পাবলো পিকাসোর গোয়ার্নিকা, জহির রায়হানের জীবন থেকে নেয়া অথবা দ্য ওল্ড ম্যান এন্ড দ্য সী’র কেন্দ্রীয় চরিত্র বৃদ্ধ জেলে সান্তিয়াগো। সান্তিয়াগো ৮১ দিনের মাথায় বিশাল মার্লিন মাছ শিকার করে। কিন্তু হাঙ্গরের আক্রমণে শেষ পর্যন্ত মাছের কঙ্কাল নিয়ে তীরে ফেরে। তারপর... জীবন থেমে থাকে না, সান্তিয়াগো এর ভেতর দিয়ে সে বুঝে জাগতিক/অধিজাগতিক সম্পর্ক কি, কিভাবে হয়, কিভাবে প্রেরণা দেয় এবঙ কেনই বা সে হতাশ হবে না। শিল্প বুঝিয়ে দেয় এই দুঃখ কষ্ট হতাশার আড়ালে কিভাবে লুকিয়ে আছে জাগতিক অসারতার বীজ, কিভাবে পাল্টে দিতে হয় বাস্তবতার অসার ধারণা। 
.
শিল্পী হয়ে উঠা মানে সম্পর্কের ডালপালা তৈরী করা। এই সম্পর্ক ব্যক্তি জাতি গোষ্ঠি ব্রক্ষ্মাণ্ড সমগ্র প্রকৃতির অলিগলিতে নিজেকে খোঁজা। শিল্পে পরম খোঁজা মানে এই সব সম্পর্কের ভেতর আত্ম-অনুসন্ধান করা। জাগতিক নানা বাধা, ভেদ চিহ্নিত করে চলে সৃজনী বিবর্তন। সে শর্তহীনতার কাছাকাছি পৌঁছে কিন্তু প্রকাশ করে শর্তাধীন জগতে। শিল্পের বাস্তবতাবোধ যুক্তি দিয়ে নির্মিত কিনা তা যেমন রহস্যময় তেমনি শিল্পকর্ম দুর্বল হওয়া বা তাতে ব্যর্থতার চিহ্ন পড়া রহস্যময় বিষয়। যেহেতু অপরের খাঁটি অনুভূতিতে পৌঁছা দুর্লভ তাই শিল্পীর অমতার ধারণা কঠিন যুক্তিতে অংকিত বিষয়। যে শিল্পকর্মকে আমরা অশুভ চেতনায় ভরপুর বলি তা কিন্তু কোন একটা কালের প্রতিবিম্ব। অর্থাৎ শিল্পের ব্যর্থতার জায়গায় সামষ্টিক প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের দায় এড়াতে পারে না। পারস্পরিক সম্পর্ক নির্ধারণে কর্তৃত্বের ভূমিকাকে কখনো খাটো করে দেখা যাবে না। যেহেতু শিল্পী পয়গম্বর নন, তাই তার ভেতরকার বৈপ্লবিক আকাক্সা সামাজিক সাড়ার অভাবে ব্যর্থ হতে পারে। সে মানুষের চাওয়াকে তুলিতে কালিতে বুলিতে ফুটিয়ে তুলতে পারে কিন্তু জনমানসকে এক করে তোলার দায়িত্ব তার নয় অথবা তার দ্বারা সম্ভবপর নাও হতে পারে। এর ফলে নীৎসের মহামানবের রূপ অবয়ের কালে কেমন হবে, তা আগাম বলে দেয়া কঠিন। তাছাড়া প্রায়শঃ শুধুমাত্র ফর্ম নির্ভরতা, নন্দন নির্ভরতা শিল্পের অভিজ্ঞানকে নষ্ট করে দেয়। যে সমাজে শিল্পের বিকাশ ঘটে আভিজাত্যের আড়ম্বরে তার 'চে’ বর্বরতা কিছুই হয় না। তা মনুষ্যত্বের বিকাশকেই গলা টিপে মারে। তখন সমাজ বদল, আত্মিক পরিশুদ্ধির স্থানে চিত্ত কলুষতার সংক্রামক ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়। সে ব্যাধি ছড়িয়ে পড়ে তথাকথিত নিচুতলার মানুষের আধ্যাত্মিক শিল্পচেতনায়ও। তখন ছৈউরিয়া আর মথুরা একাকার হয়ে পড়ে বারে আর ডিসকোতে। শিল্প ভোগ নয় বেদনার প্রসব। এর মাঝে আছে মানুষের শুদ্ধতম অনুভূতি দুঃখ। আর তাকে বাদ দিলে শিল্পকলা হয়ে পড়ে কূলহারা কলংকিনী
.
যে “'হয়”' এবঙ “'ঔচিত্য”' এর হদিস করতে গিয়ে এই লেখার সূত্রপাত এবার সেখানে ফিরে আসি। প্রথমটি (শিল্প!) সম্পর্কে যথেষ্ট বলা হয়েছে। বাকী থাকে শিল্পের রূপ এবঙ প্রয়োগরীতি কেমন হওয়া উচিত। আমরা “হয়” আলোচনার ভেতর সেই পথে অনেকটা হেঁটেছি। “হয়” এর যাত্রা যেখানে শেষ সেখানে শুরুর সাথে ব্যাপক গুণগত পরিবর্তন ঘটে। তারপরও কিছু কথা থাকে। ঔচিত্য অনৌচিত্যের ধারণা গুরুত্বপূর্ণ এই কারণে যে, এই বোধ আমরা আমাদের বেঁচে থাকা স্বার্থক (?) করতে তুলতে এক ধরণের নিয়মতান্ত্রিক আশ্রয় দিয়ে থাকে। আমাদের সামাজিক জীবন ঔচিত্য নির্ভর ফর্মুলা দ্বারা চলার বাসনা পোষণ করে। সামাজিক স্থিতিশীলতায় এর কার্যকর ফলাফল আছে। সুতরাঙ, নানা ক্ষেত্রে ঔচিত্য অনৌচিত্যের সিদ্ধান্তমূলক ধারণায় উপনীত হওয়ার ফলদায়ক যৌক্তিকতা এবঙ এর অভিজ্ঞতা আমাদের আছে। কিন্তু জীবনের বৈশিষ্ট্যসূচক সৃজনশীল মৌল প্রকরণগুলো বিবেচনায় এই ঔচিত্যবোধ কখনো কখনো ফ্যান্টাসীতে পরিণত করে। আত্মার খোরাক না হয়ে উঠলে ধর্মগ্রন্থ চিরকাল জীর্ণ তক্তাতে পড়ে থাকে, সেখানে ঔচিত্যবোধ কোন ফলাফল বয়ে আনে না। শিল্প কেমন হবে এই বিবেচনাও এক ধরণের ফ্যান্টাসীতে পরিণত হয়। শিল্পকর্মে শিল্পী তার আত্ম-অনুশীলনের ভিতর দিয়ে প্রাপ্ত অভিজ্ঞানের বর্হিপ্রকাশ ঘটায়। তাই এর প্রয়োগরীতি কেমন হবে তাকে আগাম ধরে দেয়া কঠিন। যখন এই কাজ (যা সহসা স্বাস্থ্যবটিকার মতো কিছু বলে ভ্রম হতে পারে! ) করা হয়, তা হতে পারে ভুল পদপে। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন জনের স্বীকারোক্তি হতে এই ধারণা হয় যে, শিল্পী মাত্রই দায় অনুভব করেন। যদি এই বোধ সহী হয় আমাদের আপত্তির (আমরা বলি যে, সবসময়ই তাদের জন্য নানা ছাড় দিতে প্রস্তুত আছি! ) কিছু নাই। আর যারা শঠতাকে (!) সত্যজ্ঞান করেন তাদের জন্য বলার কি থাকতে পারে! সচেতন থাকা এবঙ অপরকে করা সকল ব্যক্তির নৈতিক ও সামাজিক দায়িত্ব বলে মনে করা হয়ে থাকে। এবঙ সময়ে সময়ে এই সমাজ ও নৈতিকতার অবশ্যম্ভাবী রূপান্তর ঘটেছে । যা আগে বলা হয়েছে তা আবার বলা যায়, মানুষের আশা আকাঙ্খা যে সত্যকে জয় করতে চায়, শিল্পরূপেই সে জয়ের সূচনা ঘটে।
.
সহায়ক সূত্র: 
১. লিও টলস্টয়, অনুবাদ: দ্বিজেন্দ্রলাল নাথ, শিল্পের স্বরূপ, পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য পুস্তক পর্ষৎ, কলকাতা, ২০০২। 
২. আলীয়া আলী ইজতবেগবিচ, অনুবাদ: ইফতেখার ইকবাল, প্রাচ্য পাশ্চাত্য ইসলাম, জলঘড়ি একটি জ্ঞানবৃত্তিক উদ্যোগ, চট্টগ্রাম, ২০০২। 
৩. সৈয়দ আহমদ শামীম, শিল্পের মনোভঙ্গি, সূত্রপাঠ ১ম বর্ষ, ২য় সংখ্যা, ৩১ আগস্ট ২০০৬, চট্টগ্রাম। 
৪. আহমদ রফিক, বুদ্ধিজীবীর সংস্কৃতি, মুক্তধারা, ঢাকা, ১৯৮৬। 
৫. ওয়াহিদ সুজন, সংগীত অথবা অকূল সমুদ্দুরে অবগাহন, লোকযাত্রা ১ম বর্ষ, ১ম সংখ্যা, জুন ২০০৯, চট্টগ্রাম। 
৬. কাজী দীশু, ব্যারচ দ্যা স্পিনোজা, জনান্তিক, ঢাকা, ২০০৭।

সংগীত অথবা অকূল সমুদ্দুরে অবগাহন




সংগীত অথবা অকূল সমুদ্দুরে অবগাহ

ওয়াহিদ সুজন 

.

আমরা যখন কোনকিছু বলি-অর্থবোধকই বলি। যাতে অপরকে নিজের ভাব বুঝাতে পারি। শুধু তাই নয়, নিজের ভেতর সে অর্থের প্রতি এক ধরণের তাড়না থাকে। অর্থ মূলতঃ নির্দেশনামূলক। এই নির্দেশনা কোন ঘটনাকারে উপস্থিত হয়, যা একাধারে বস্তুকেন্দ্রিক আবার অনুভূতির সাথেও জড়িত। যখন আপনি কিছু বললেন, তা ধ্বনি আকারে অপরের কানে পৌঁছায়। তা বিশিষ্ট দ্যোতনা তৈরী করে। যেমন- আনন্দ। এর যে অর্থবোধকতা, রহস্যময় মনে হতে পারে, কেননা বস্তু আকারে এর নির্দেশনাটি কি? এই শব্দটি উচ্চারণের সাথে সাথে আপনার মনে উৎফুল তার যে ভাব আসে তা ভাষায় বা বস্তু দিয়ে দেখানোর নয়। এই হলো শব্দ ও অনুভূতির নিজস্ব সম্পর্ক। কোন নাম শুধু নিছক নামই নয়, অনুভূতির বাহকও, যার ব্যাপকতা অনির্ণীয়। এর চেয়ে আরো গুঢ় উদাহরণ হলো সংগীত। যদি বলেন সংগীত, মনে হবে অদৃশ্য কোন সুতোয় টান পড়ল বুঝি। হৃদয়তন্ত্রীতে সে টান কম্পন তৈরী করে- যার অনুরণন ঘটে সমগ্র সত্ত্বায়। 

.

মানুষকে দার্শনিক বা যুক্তিগ্রাহ্যরূপে বুঝাতে গেলে তার বুদ্ধিমত্তা বা কুশলতার কথা বলা হয়। একে স্বীকার করে নিতে হয়। কিস্তু মানুষের নান্দনিকতার কথায় আসলে সংগীতের কোন বিকল্প নাই। শিল্পের মধ্যে সংগীতের স্থান সবার উপরে। এতে যুক্তি বুদ্ধি মতা আছে বটে, তা আবার নতুন যুক্তিবোধ ও প্রকরণের স্থানে চলে আসে। যা নিয়মের ভেতর থেকে নিয়মের লঙ্ঘনও বটে। বুঝতে হবে এটাই সৃজনশীলতার ধরণ। আবার ব্যক্তির সংগীত রুচি থেকেও ব্যক্তি সম্পর্কে ধারণা করা যায়। ব্যক্তির বুদ্ধিবৃত্তির সাথে তার সংগীত রুচির সবিশেষ সম্পর্ক আছে। অথবা এই সম্পর্কে তার বলার কিছু আছে। একমাত্র সংগীতই সার্বজনীন শিল্প। বোধ করি সংগীত মানুষের বাইরের সাথে সাথে ভেতরকার কথা বলে দেয়। প্রতিটি মানুষই নিজেকে প্রকাশে ভাষা সংকটে ভুগে, পরম ভাষার অনুসন্ধান করে। জগতকে জানার বুঝার যে আকুলতা তাও এই ভেতর বাইরের সম্পর্ককে বুঝার বিষয়। এ অর্থে, সংগীত ভেতরকার সঙ্গতিও বটে। মানুষে মানুষে যোগাযোগে আমরা যদি নির্দেশনামূলক কোন কিছুর কথা না বলতে চাই - একমাত্র সংগীতই সার্বজনীন হয়ে উঠে। সে হিসেবে তার অবদান দেশ-কাল উর্ধ্বে। আমরা যখন কোন মহৎ কম্পোজিশন বা গান শুনি, তা আপনার মাঝে যে অনুভূতি এনে দেয়, দেখা যাবে শত মাইল দূরের একজনের ভেতরও কাছকাছি অনুভূতি তৈরী করে। কেন? 

.
সংগীতের অন্তর্নিহিত শক্তি যা অকৃত্রিম প্রাকৃতিক এবঙ মহাজাগতিক। মিথলজিতে, এমনকী ধর্মের ক্ষেত্রে সংগীতকে মানবকূল এবঙ প্রকৃতি জগতের সম্পর্কের যোগসূত্রের জায়গায় দেখানো হয়। প্রাকৃতিক জগতে ছড়িয়ে আছে সুরের বৈচিত্র্য লীলা। পাখির কলতান, ঝর্ণার কলকল ধ্বনি অথবা বাতাসে বৃক্ষের দুলুনীতে সকল কিছুতে পাওয়া যাবে সংগীতের সাতসুর। তার মানে এই নয় যে, সংগীতকে এত সহজে ব্যাখ্যা করা চলে, তারপরও ক্ষুদ্রজ্ঞান এবঙ মুগ্ধতার স্থান হতে কিছু কথা বলার চেষ্টা মাত্র। কেনই বা এই অপচেষ্টা করতে হয়!
.
সার্বিকভাবে, মানুষের যে কোন সৃজনীই মহৎ সৃজনী। সকল সৃজনীতে সুক্ষ্মতার ছাপ থাকে। তার অপরাপর কর্মের চেয়ে গুনগতভাবে একেবারে পৃথক। এবং অনুভূতির গভীরতম স্থানে এর অধিষ্ঠান। যদি মানুষের সকল ক্রিয়াশীলতাকে মোটা দাগে বিবেচনা করা হয়, তাহলে সৃজনীশক্তির প্রকাশ এবঙ বিকাশ সম্ভব নয়। আমরা প্রকৃতির ভেতর হতে যে সুর সম্ভার অনুভব করি না কেন, তাকে ধারণ করা বা লালন করা সহজ বিষয় নয়। 
.
একে শুধুমাত্র বিদ্যমান অপরাপর ঘটনা বা কার্যকারণ পরম্পরারূপে দেখলে চলে না। মানুষের মতো শিল্প নিজেও নানামাত্রায় বিকাশমান, যা মানুষের হাতে হওয়া না হওয়ার উপর নির্ভর করে না। মানুষ হলো অফুরন্ত সম্ভাবনার স্বার। সে সম্ভাবনাকে অনুধাবন করে বেড়ে উঠে অথবা যথার্থ হয়ে উঠে যথার্থ মানুষ। আরো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নিদেন পক্ষে তার সৃজনী শক্তির ক্ষেত্রে - যা তার অন্তর্নিহিত নয়, সে হয়তো তার সম্পর্কে চিন্তা করতে পারে, বুঝতে পারে কিন্তু ধারণ করতে পারে না। সংগীত যদি তার ভেতরকার বিষয় না হয়- সে হয়তো চর্চা করতে পারবে কিন্তু একে লালন বা এর সৃজনী বুঝতে অক্ষম। মানব অনুভূতির মধ্যে প্রধানতম হলো দুঃখবোধ, বিরহ। সংগীতের চেয়ে আর কে আছে যে এতো নিখুঁতভাবে এই বোধগুলোকে ফুটিয়ে তুলতে পারে। শুধু দুঃখবোধই নয় মানুষের অপরাপর অনুভূতিগুলোকেও সে সুক্ষ্মভাবে ধারণ করে। আরো, মনে রাখা দরকার সংগীত শুধুমাত্র বিশেষ অনুভূতিকে প্রকাশ করে তা-ই নয়, সে আমাদের অনুভূতিকে জাগিয়ে তোলে, শাণিত করে, নিরাময় গুণধারী এবঙ বাস্তব জগতের বিষয়। আকাশের অসীমতা, সাগরের বিশালতা, পাখির উড়ে যাওয়া, ঋতু পরিবর্তন, বিশেষ কোন লগ্ন সকল কিছুই এর মাধ্যমে প্রকাশ করা যায়।
.
একেবারে জাগতিক ঘটনাকারে সংগীত আমাদের সামনে বিপুল শক্তি সামর্থ্য নিয়ে হাজির হয়। আমাদের শ্রমের সাথে ঘামের সাথে। মাটি যেমন সোনা ফলায়, তেমনি মাটি থেকেই উঠে আসে মাটির গন্ধ মাখা সংগীত। এটাকে নিছক জাগতিক বললে ভুল বিবেচনার সুযোগ থাকে। কেননা আধ্যাত্মিক দ্যোতনা ছাড়া সংগীত সম্ভব না। জাগতিক অর্থে এ জন্য যে, এটা সরাসরি আমাদের কায়িক জীবনকে প্রভাবিত করে, সহজ করে তোলে। ফর্মের দিক হতে এদের উচ্চাঙ্গিকতাকে আলাদা করা যায় না। শুধুমাত্র অলৌকিক খোলস পড়ালেই সে মহৎ হয়ে উঠে না অথবা শ্রেণীগত চেতনায় ব্যাখ্যা করলে সংগীতকে তার নিখাদ স্থান হতে বিচ্যুত করা হয়। কারণ, ইতিহাসের উত্থান-পতন, মানব সভ্যতার ক্রমিক পরিবর্তনের ভেতর দিয়েও সংগীতকে উঠে আসতে হয়েছে। তাই এটি শুধুমাত্র অবসরের আনন্দ বিনোদনই নয়, সেই মানুষের এই মানুষ হয়ে উঠার স্বাক্ষী ও বটে। 
.
ভাব প্রকাশে সংগীতের অবদান সার্বজনীন। এই সার্বজনীনতা মানুষে মানুষে, মানুষের সাথে প্রকৃতি, মানূষের সাথে অধিসত্ত্বার যোগাযোগ। মানুষ যখন নিজের স্বরূপ অন্বেষণ করে, তখন সে যাকে দেখে, সে আসলে অপর। মানুষের গূঢ়তম, প্রাজ্ঞ এবঙ জটিল অনুভুতি। আমরা দেখি সংগীত কত সহজে এই অনুভূতি প্রেমে বিরহে মূর্ত করে তোলে। এইসব সম্পর্কের স্বরূপ নির্ণয়ে জগতের প্রায় সকল ধর্মে, দর্শনে সংগীতের দেখা মেলে। 
.
মানবসত্ত্বার সাথে অধিসত্ত্বার যে সম্পর্ক- মানুষের জগতে তার সব' চে’ মূর্তরূপগুলো আমরা পাই কাব্য এবঙ সংগীতে। কেউ কেউ বলে থাকেন, সেটাই সব' চে’ ভালো কবিতা যা গান হয়ে উঠতে পারে। সূফী সাধনায়, বাউল গানে, গীর্জার প্রার্থনা সংগীত সহজ উদাহরণ। মানুষ সত্ত্বা হিসেবে একই সাথে ইতিহাসে এবঙ অনৈতিহাসে, একই সাথে বস্তুরূপে আবার চিন্তারূপে। মানূষের এই দ্বৈতরূপ তার নিজের ভেতর পরম মানব আবার পরম সত্ত্বাকেও অনুসন্ধান করে। এই যে অনুসন্ধান তা কালে কালে সংগীতে প্রকাশিত হয়েছে। ভেদের মাঝে অভেদ, রূপের মাঝে অরূপ। 
.
সংগীতের সাথে নিখুঁত পরিমান জ্ঞান জড়িত। তাল লয় মাত্রার যে ধারণা- তা পুরোপুরি গাণিতিক। প্রাকৃতিক বিজ্ঞানে নিখুঁত জ্ঞানের জায়গাটা গণিতের দখলে। গণিতই বার বার একই ফলোৎপাদন করতে পারে। তাছাড়া সকল বিজ্ঞানের ব্যবহারিক বিন্যাস ঘটে গণিতের সাহায্যে। যখন কোন স্বরলিপি তৈরী করা হয়, তা প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের মতোই গণিতের সাথে সঙ্গতি রা করে। যার মধ্যে একচুল এদিক ওদিক হলে পুরো প্রক্রিয়াটা মূল লাইন থেকে বিচ্যুত হয়। উদ্দেশ্যবাদীতা বা অন্য কোন নির্দেশনার দিক হতে অথবা প্রাকৃতিক বিজ্ঞানে জগতকে দেখি আভ্যন্তরীণ সঙ্গতির নিপুণ বিন্যাসে। তেমনি সংগীত বরাবরই এমন কিছুর কথা বলে যায়। আবার তাল লয়ের যে ফর্ম তাকে ভেঙ্গে চুরে অসাধারণ সব কম্পোজিশন তৈরী হয়, যা আসলে নতুন নতুন গাণিতিক বিন্যাস। 
.
মানুষের যে কোন সৃজনীশক্তি তার প্রকৃতিগত। এখানে আরোপিত কিছু থাকে না। যদি কিছু আরোপ করা হয় মূল মতারই বিকৃতি ঘটে। শৈশবে সংগীত প্রতিভার স্ফুরণ ঘটে। সে আমাদের বাউল গানই হোক আর পাশ্চাত্যের মোজার্টের কথা আসুক। কিন্তু শুধু ব্যক্তির একার ঘটনা নয়, বরঙ সামষ্টিক দ্যোতনা বহমান। মানুষের নিজের যে কোন ক্ষমতার অনুধাবন, জানা, বুঝা, মূল্যায়ন, বিকাশ এবঙ অপরের সাথে ভাগ করে নেয়া পবিত্র দায়িত্ব। সংগীতের সুধা যদি মর্ত্যে ইন্দ্রজাল তৈরীর মতা রাখে তবে সে অপরকে এর থেকে বঞ্চিত রাখবে কেন? 
.
সংগীতকে জানা বুঝা অনুশীলন এবঙ এর সমঝদার হওয়া সদগুণের বিষয় বটে। সংগীত একাগ্র সাধনার বিষয়। সাধনার ভেতর দিয়েই স্থান করে নিতে হয়। চর্চা এবঙ সাধনার ভেতর দিয়ে এক একটি সিঁড়ি অতিক্রম করা আর এক একটি দরোজা খুলে যাওয়া। সাধনার মাধ্যমে কোন কলাকে সুক্ষ্মাতিসুক্ষ্ম অনুধাবন করা যায়। অর্থাৎ নির্দিষ্ট কিছুর মর্মে পৌঁছা। এর নিজের ভেতরের শক্তি হিসেবে অনুভব করা এবঙ এর সাথে একজন মানুষের বেঁচে থাকার স্বার্থকতা, প্রকৃতির মতাকে উপলব্ধির বিশাল যজ্ঞ ভর করে। একজন প্রকৃত কৃষক যে মাঠে ফসল ফলায়, সে আসলে অন্য সকলের মতো নয়। তার জীবনবোধ ঐ ফসলের জীবনচক্রের সাথে জড়িয়ে যায়, তার কাছে ঐ ফসলের মাঠ, ফসল হয়ে উঠে জীবন্ত সত্ত্বা, যার সাথে নিজের-সকলের সুখ দুঃখ ভাগ করে নেয়া যায়। একজন সংগীত সাধকের সংগীত এভাবেই জীবন্তরূপে হাজির। যা নানা কাল চক্রে নানা রূপে আবির্ভূত হয়। তাই সংগীত নিছকই শিল্পের জন্য শিল্প নয়, দুনিয়াবী ভেদ-অভেদ, ঘাত-প্রতিঘাত, পরিবর্তনের দৃষ্টান্ত। আমাদের বুঝতে হবে কেন মানুষ সংগীতের টানে ঘর ছাড়ে। পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে, অনেক ধর্ম সাধক সংগীতের মধ্য দিয়ে তাঁর সাধনা করে গেছেন। 
.
সংগীতের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত আছে বিনয় ভাব। সাধককে বিনয়ী হতে হয়, তাহলে সংগীত স্বমহিমায় তার কাছে ধরা পড়ে। (এখানে ভুল বুঝার কোন সুযোগ নাই, সংগীত আল্লাহ প্রদত্ত) বিনয় ছাড়া কোন শাস্ত্রেই প্রকৃত জ্ঞান অর্জন সম্ভব নয়। যদি আপনি কোন কিছুর মর্মে পৌঁছাতে চান, তবে আপনাকে বিনয়ী হতে হবে। বিনয়ই কোন কিছুকে বোধগম্য করে, এটা সাধনার অংশ। এমনকি আপনার অযোগ্যতা কখনো কখনো বিনয় ভাবের কারণে যোগ্যতার স্তরে উন্নীত হয়। সকল কিছুর মতো ভেদজ্ঞান সংগীতের মধ্যেও ক্রিয়াশীল। যদি বিনয়ে অনর্থ ঘটে, তখন ফারাকগুলো আপনি বুঝতে পারবেন না অর্থাৎ অর্থের চেয়ে অনর্থই বেশী। 
.
সাধনা, বিনয় এ শব্দ দু’টি আমাদের সহজ উপসংহারে পৌঁছে দেয়, গুরু ছাড়া কোন বিদ্যা অর্জনই হয় না। পথ চলার জন্য পথপ্রদর্শকের প্রয়োজন। জ্ঞানের সোপান গুরুই চিনিয়ে দেবেন। গুরু ছাড়া সংগীতের সাগরে অবগাহন সম্ভব নয়। যে কোন দেশ যে কোন কালে গুরুই আপনাকে পথ দেখাবে। আমরা সবাই কথা বলতে পারি, তার ভেতর স্বরবর্ণ ব্যঞ্জনবর্ণ সকলই আছে, তারপরও কি বর্ণমালা নিজে নিজে আয়ত্ব করার বিষয়? গুরু শিষ্যের পরম্পরায় সংগীতের মহান কীর্তিগুলো আমরা দেখি। এতক্ষণ যা হলো, এগুলো বাইরের কথা, ভেতরকার কথা ধ্যানে গিয়ে বুঝতে হবে। নতুবা আপনি এমন কিছুর কল্পনা করুন যার মধ্যে কোন সঙ্গতি খুঁজে পাবেন না। যেখানে প্রত্যেকে বিচ্ছিন্ন বিচ্ছিন্ন দ্বীপে বসবাস করেন, কেউ কারো ভাষা বুঝেন না