পৃষ্ঠাসমূহ

পুর্ন মুদ্রন লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
পুর্ন মুদ্রন লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

শিল্পের সংজ্ঞা ও সীমা

শিল্পের সংজ্ঞা ও সীমা 
লিও টলস্টয় 
অনুবাদঃ দ্বিজেন্দ্রলাল নাথ 
.
যে বিভ্রান্তিকর সৌন্দর্যের ধারণা সমস্ত ব্যাপারকে গুলিয়ে ফেলে, সে ধারণাবিষয়ক বিচার আপাতত স্থগিত রেখে শিল্প বলতে কি বোঝায় এখন তার বিচার করা যাক। সৌন্দর্যের ধারণা বাদ দিলে শিল্পের সা¤প্রতিকতম এবং সর্বাপো ব্যাপকসংজ্ঞা নিম্নরূপঃ ১. ক. শিল্প এমন একটি ক্রিয়া যার আত্মপ্রকাশ এমনকি পশুজগতেও দেখা যায়। যৌন আকাক্সা এবং খেলার প্রবণতা শিল্পের উৎস (শীলার, ডারউইন, স্পেনসার) এবং খ. স্নায়ুতন্ত্রীয় আনন্দময় উত্তেজনা শিল্পক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত (গ্রান্ট এলেন)। এটি শারীরতাত্ত্বিক বিবর্তনবাদী সংজ্ঞা। ২. মানুষের উপলব্ধ অনুভূতিগুলিকে রেখা, বর্ণ, গতি, ধ্বনি অথবা শব্দের সাহায্যে বহির্জগতে অভিব্যক্তি দেওয়াই শিল্প (ভেরোঁ, Veron)। এই হল শিল্পের সমীক্ষা নির্ভর সংজ্ঞা। খুব সা¤প্রতিক সংজ্ঞা মতে (Sully), শিল্প কোন স্থায়ী বস্তু অথবা চলমান ক্রিয়ার সৃষ্টি, যা স্রষ্টার মনে শুধুমাত্র সক্রিয় আনন্দদানে সমর্থ নয়, বরং বহুসংখ্যক দর্শক বা শ্রোতার আনন্দময় অনুভূতি সৃষ্টিতে সম, শিল্প-উদ্ভূত যে অনুভূতি কোন ব্যক্তিগত লাভালাভের প্রশ্ন থেকে স্বতন্ত্র। 
.
এ সমস্ত সংজ্ঞা সৌন্দর্যের ধারণানির্ভর অধিবিদ্যাগত সংজ্ঞার চাইতে উন্নতমানের হলেও যথার্থ শিল্পসংজ্ঞা থেকে দূরবর্তী। প্রথম, অর্থাৎ শারীরতাত্ত্বিক বিবর্তনবাদী সংজ্ঞা- ১. ক. অযথার্থঃ যেহেতু প্রকৃত আলোচ্য বস্তু শৈল্পিক ক্রিয়া বিষয়ে আলোচনা না করে সে সংজ্ঞা শিল্পের ব্যুৎপত্তি নির্ণয়ে ব্যাপৃত। এর উপরে সংশোধিত। খ. মানব দেহের উপর শারীরতাত্ত্বিক প্রভাবনির্ভর সংজ্ঞাও অযথার্থ, যেহেতু এ সংজ্ঞার সীমার মধ্যে অপরাপর আরও অনেক মানবিক ক্রিয়াকে অন্তর্ভূক্ত করা যায়। যেমন, নবনন্দনতাত্ত্বিক মতবাদে সুন্দর বস্ত্র তৈরি, প্রীতিদায়ক গন্ধদ্রব্য, এমনকি খাদ্য ও পানীয় প্রস্তুতকেও এ তত্ত্ববাদীরা শিল্প বলে বিবেচনা করেন। 
.
কর্মক্ষেত্রে প্রয়োগগত পরীক্ষামূলক সংজ্ঞাঃ ২. যা শুধুমাত্র আবেগের অভিব্যক্তিকেই শিল্প বিবেচনা করে তাও অযথার্থ। যেহেতু কোন ব্যক্তি রেখা, রং, ধ্বনি অথবা কাজের সাহায্যে আবেগ প্রকাশে সম হলেও এ ধরণের প্রকাশব্যঞ্জনা যদি অপর ব্যক্তির ওপর প্রভাব বিস্তারে অসমর্থ হয়, তবে তাঁর আবেগের অভিব্যক্তিও শিল্প বলে বিবেচ্য নয়।
তৃতীয় সংজ্ঞাও (Sully) অযথার্থ, যেহেতু স্রষ্টার মনে আনন্দ সৃষ্টি অথবা দর্শক বা শ্রোতার কোন ব্যক্তিগত সুবিধা বিধান ব্যতিরেকে আনন্দময় আবেগসৃষ্টিতে সম কোন বস্তু উৎপাদন বা ক্রিয়াকেও শিল্প বলা যায় না। কারণ, এরূপ ক্রিয়ার মধ্যে পড়ে ঐন্দ্রজালিক কৌশল কিংবা শারীরিক কসরত অথবা ওই ধরনের আরও কোন কোন ক্রিয়া যা শিল্পপদবাচ্য নয়। অধিকন্তু এমন অনেক বস্তু দেখা যায় যার অভিব্যক্তি স্রষ্টার মনে কোন আনন্দ সঞ্চার করে না। বরং সে সমস্ত বস্তু-উদ্ভূত চেতনা অতৃপ্তিদায়ক। উদাহরণস্বরূপ, কাব্য বা নাটকে বর্ণিত কোন বিষস্ন, হৃদয়বিদারক দৃশ্য মনকে বেদনাচ্ছন্ন করে। তথাপি এ সমস্ত দৃশ্য নিঃসন্দেহে শিল্পকর্ম হতে পারে। যে কারণে এ সমস্ত সংজ্ঞা যথাযথ হয়ে ওঠেনি তা হল এইঃ এ সমস্ত সংজ্ঞার সব ক-টির মধ্যে (এমনকি অধিবিদ্যাগত সংজ্ঞার ক্ষেত্রেও) শিল্প কি পরিমাণে আনন্দ বিধানে সম, এ প্রশ্নই শুধু বিবেচিত হয়েছে ব্যক্তি-মানুষ বা মানবজীবনে শিল্প কি উদ্দেশ্য সাধনের উপযোগী তা বিবেচিত হয়নি। 
.
শিল্পের অভ্রান্ত সংজ্ঞা নির্দেশের জন্য প্রথমেই প্রয়োজন শিল্পকে আনন্দদানের বাহন হিসেবে বিবেচনা না করে মানব জীবনেরই একটি অঙ্গ হিসেবে বিবেচনা করা। এই দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে শিল্প মানুষের পারস্পরিক সম্পর্কের উপায়গুলির মধ্যে অন্যতমএ সিদ্ধান্তে উপনীত হতে আমাদের ভূল হবে না। প্রত্যেক শিল্পকর্ম উপভোক্তাকে শিল্পস্রষ্টার সঙ্গে একটি বিশেষ সম্পর্কে আসতেই শুধু সাহায্য করে না, সমকালীন বা পরবর্তী কালে ওই শিল্প-প্রভাবিত ব্যক্তিদের সঙ্গেও আত্মীয়তার সূত্রে আবদ্ধ হতে সহায়তা করে। মানবিক চিন্তা এবং অভিজ্ঞতা সঞ্চারক ভাষাই মানুষের মধ্যে এই মিলনসূত্র রচনা করে। শিল্পও সেই একই উদ্দেশ্য সাধন করে। শেষোক্ত মানব সম্পর্ক বিধায়ক উপায়টির বৈশিষ্ট্য শাব্দিক যোগসূত্রের উপায় থেকে পৃথক। সে বৈশিষ্ট্যের স্বরূপ এইঃ ভাষার সাহায্যে মানুষ নিজের চিন্তাসম্পদকে অপরের নিকট পৌঁছিয়ে দেয়; অপর পক্ষে শিল্পের মাধ্যমে সে নিজ অনুভূতিকে অপরের মধ্যে সঞ্চারিত করে। শিল্পক্রিয়ার ভিত্তি এই সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত যে, শ্রবণ ও দর্শনের সাহায্যে যখন কেউ অপরের ভাবানুভূতি উপলব্ধি করে, ওই আবেগচালিত মানুষের আবেগটিও সে অন্তরে উপলব্ধি করতে সম। একটি অত্যন্ত সহজ দৃষ্টান্ত নেওয়া যেতে পারেঃ কোন ব্যক্তি হাসলে অপর ব্যক্তি সে হাসি শুনে আনন্দ অনুভব করে, অথবা কোন ব্যক্তি কাঁদলে অপর ব্যক্তি সে কান্না শুনে দুঃখবোধ করে। কোন ব্যক্তিকে উত্তেজিত বা বিরক্ত দেখলে অপর ব্যক্তির মনেও একই ভাব জাগ্রত হয়। অঙ্গসঞ্চালন বা কণ্ঠস্বরের সাহায্যে কোন ব্যক্তি যখন সাহস, দৃঢ়সংকল্প, বিষণœতা বা ধৈর্য্যরে অভিব্যক্তি প্রকাশ করে, তার এ মানসিক অবস্থা অপরের মধ্যেও সঞ্চারিত হয়। কোন ব্যক্তি যন্ত্রণাগ্রস্থ হলে গোঙানি এবং মাংসপেশীর আক্ষেপের সাহায্যে তা ব্যক্ত করে, এবং তার এই যন্ত্রণাই যেন অপরের মধ্যে সঞ্চারিত হয়। যখন কেউ কোন বস্তু, ব্যক্তি অথবা ইন্দ্রিয়গোচর কোন দৃশ্যের প্রতি স্বীয় বিস্ময়, অনুরাগ, ভয়, শ্রদ্ধা বা ভালোবাসার অনুভূতি প্রকাশ করে তখন অনুরূপভাবে অপরেও সে একই বস্তু, ব্যক্তি অথবা দৃশ্যের প্রতি একই ধরণের বিস্ময়, অনুরাগ, ভীতি, শ্রদ্ধা অথবা ভালোবাসার অনুভূতির দ্বারা সংক্রমিত হয়। বস্তুতপে অপর ব্যক্তির ভাবানুভূতির ব্যঞ্জনার মর্মগ্রহণ এবং সে অনুভূতি আপন হৃদয়ে অনুভব করার সামর্থ্যই শিল্পক্রিয়ার ভিত্তি। 
.
যদি কোন ব্যক্তি হৃদয়ে আবেগমথিত হয়ে আপন দেহলণ বা কণ্ঠনিসৃত কাজের সাহায্যে প্রত্য ও তাৎণিকভাবে অপর ব্যক্তি বা ব্যক্তিসমূহকে সংক্রমিত করেন, হাই তোলান, হাসতে বা কাঁদতে বাধ্য হয়ে অপরকেও হাসান-কাঁদান, অথবা নিজে যন্ত্রণা ভোগ করায় অপরের মনেও যন্ত্রণার অনুভূতি সৃষ্টি করেন- সেটা কিন্তু শিল্পপদবাচ্য নয়। শিল্পের আবির্ভাব তখনই ঘটে যখন কোন ব্যক্তি অপর একজন বা একাধিক ব্যক্তির সঙ্গে মিলনের অভিপ্রায়ে সমভাবাপন্ন অনুভূতি-প্রভাবে বাহ্যিক লণ বা ইঙ্গিতের সাহায্যে সে অনুভূতির অভিব্যক্তি দেন। সহজতম একটি উদাহরণ দেওয়া যাকঃ একটি নেকড়ে বাঘের সম্মুখীন হয়ে একটি বালক যে অনুভূতি অর্জন করল, ধরা যাক- সে অনুভূতি ভয়ের। এ সাাৎকারের অভিজ্ঞতা তার অন্তরে যে অনুভূতি সৃষ্টি করেছিল অপরের মধ্যে তা উদ্দীপিত করার উদ্দেশ্যে সে নিজের বিষয়ে বর্ণনা, নেকড়ের  সাক্ষাৎকারের অবস্থা, সেখানকার পরিবেশ এবং বনের বিবরণ, নিজ অন্তরের নিরুদ্বিগ্নতার বর্ণনার পর নেকড়ের আকৃতি, চলাফেরা, তার থেকে নেকড়ের দূরত্ব ইত্যাদির পরিচয় দিয়ে বাঘের সম্মুখীন হওয়ার অভিজ্ঞতা ইত্যাদি বর্ণনা করল। এ অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়ে বালকটির মনে যে অনুভূতির সৃষ্টি হয়েছিল, গল্প বলার সময় যদি তার অন্তরে সে অনুভূতির পুনরাবির্ভাব ঘটে এবং শ্রোতৃবৃন্দ যদি সে অনুভূতি-দ্বারা সংক্রমিত হয়, তবে অবশ্যই তা শিল্পপদবাচ্য। সে বালকটি নেকড়ে বাঘ না দেখেও বারংবার নেকড়ে বাঘের ভয়ে ভীত হয়ে অপরের অন্তরে নিজের ভীতির অনুভবকে জাগিয়ে তোলবার উদ্দেশ্যে যদি নেকড়ে বাঘের সঙ্গে সাাৎকারের একটি ঘটনা উদ্ভাবন করে এবং পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে তার বর্ণনা দেয় এবং তার মনে যে ভীতির অনুভূতির সৃষ্টি হয়েছিল তার শ্রোতাদের সে অনুভূতির অংশভাগী করতে সমর্থ হয়, তাও শিল্প বলে বিবেচিত হবে। যখন কেউ ভয় বা যন্ত্রণা, অথবা উপভোগের আকর্ষণ (বাস্তবে বা কল্পনায় যাতেই হোক না কেন)-এর অভিজ্ঞতা লাভ করে সে অনুভূতিকে ক্যানভাস বা মার্বেলের উপর ফুটিয়ে তোলেন এবং সে দৃশ্য দেখে অপর ব্যক্তিও যদি সংক্রমিত হন- একই ভাবে তাও শিল্পের স্বীকৃতি পাবে। এ ছাড়া কোন ব্যক্তির অন্তরে, এমনকি কল্পনায়ও উল্লাস, আনন্দ, দুঃখ, নৈরাশ্য, সাহস অথবা বিষণœতার অনুভূতি জাগ্রত হবার পর তিনি যদি এ অনুভূতিগুলির পারস্পরিক ক্রমসঞ্চারকে সুরের সাহায্যে এমনিভাবে অনুভূতি দেন যে- শ্রোতারা তার দ্বারা শুধু সংক্রমিত হন না, বরং সুরকর্তার অভিজ্ঞতাকে নিজের অন্তরে অনুভব করেন, তবে সেটাও শিল্প বলে স্বীকৃতি লাভ করবে। যে অনুভূতির সাহায্যে শিল্পী অপরকে সংক্রমিত করেন তা খুব তীব্র অথবা মৃদু, খুব গুরুত্বপূর্ণ অথবা অকিঞ্চিতকর, খুবই মন্দ অথবা খুবই উত্তম- নানা ধরনের হতে পারে। স্বদেশের জন্য ভালবাসার চেতনা, নাটকে অভিব্যক্ত আত্মনিবেদন, ঈশ্বর বা ভাগ্যের নিকট আত্মসমর্পণ, উপন্যাসে বর্ণিত প্রেমিকযুগলের আত্মহারা অবস্থা, কোন চিত্রে প্রকাশিত ইন্দ্রিয়পরায়ণতার অনুভূতি, বিজয়ী কুচকাওয়াজে অভিব্যক্ত সাহস, কোন নৃত্য দ্বারা উদ্রিক্ত কলহাস্যময় পুলকোচ্ছ্বাস, কৌতুকপূর্ণ গল্পসৃষ্ট হাস্যরস, সান্ধ্য প্রকৃতির দৃশ্য, অথবা ঘুম-পাড়ানির গান দ্বারা সঞ্চারিত প্রশান্তির অনুভূতি, সুন্দর ও অদ্ভূত কোন অলংকার দর্শনে মুগ্ধ প্রশংসা- এ সবই শিল্প। স্রষ্টার অন্তরে যে অনুভূতি জাগ্রত হয়েছিল, দর্শক এবং শ্রোতাও যদি তার দ্বারা সংক্রমিত হন, তবে নিঃসন্দেহে তা শিল্প। এককালে উপলব্ধ অনুভূতি নিজের মধ্যে জাগ্রত করা, সে জাগ্রত অনুভূতিকে গতি, রেখা, রং, ধ্বনি ও রূপের সাহায্যে কথায় প্রকাশ করা এবং অপর ব্যক্তির মধ্যে স্রষ্টার সেই অনুভূতির অভিজ্ঞতাকে সঞ্চারিত করাকেই বলা চলে শিল্পক্রিয়া। 
.
শিল্প একটি মানবিক ক্রিয়া। শিল্পসৃষ্টির প্রক্রিয়া এরূপ: কোন ব্যক্তি আপন হৃদয়ে উপলব্ধ অনুভূতিকে বাহ্য অভিজ্ঞানের সাহায্যে অপরের চিত্তে সঞ্চারিত করেন এবং অপরেও যখন অনুরূপ ভাবানুভূতির দ্বারা সংক্রমিত হন এবং আপন হৃদয়ে অনুরূপভাবে উপলব্ধি করেন, তখনি হয় শিল্পের জন্ম। অধিবিদ্যাবিদেরা শিল্পকে সৌন্দর্যের অথবা ঈশ্বরের কোন অতীন্দ্রিয় ভাবপদার্থের অভিব্যক্তি বলে যে বর্ণনা করেন, শিল্প তা নয়। নন্দনতাত্ত্বিক শারীরতত্ত্ববিদেরা মানুষের সঞ্চিত উদ্বৃত কর্মশক্তির মুক্তির উৎস-ক্রীড়াকে যে শিল্প বলে মত প্রকাশ করেন- শিল্প তাও নয়। বাহ্যিক কোন অভিজ্ঞানের সাহায্যে আবেগের অভিব্যক্তি দেওয়াও শিল্প নয়। প্রীতিদায়ক বস্তুর সৃষ্টিও শিল্প নয়। বরং শিল্প এমন একটি বস্তু, যা একই অনুভূতির মাধ্যমে মানুষকে একত্র সংযুক্ত করে। ব্যক্তি ও মানবতার জীবন ও মঙ্গলময় প্রগতির উপায় হিসেবে শিল্পের প্রয়োজন অপরিহার্য। 
.
ভাষার মাধ্যমে চিন্তা প্রকাশের মতা প্রকাশের অধিকারী বলে পূর্ববর্তী মানবসমাজের অবদান কী, পরবর্তী কালে প্রত্যেক মানুষ তা জানতে পারে। অপরের চিন্তাধারা উপলব্ধিতে সম বলে বর্তমান কালের মানুষ পূর্ববর্তীদের ক্রিয়াকলাপের অংশীদার হতে পারে। এ যুগের মানুষ অপর ব্যক্তির যে চিন্তাধারা আত্মসাৎ করেছে কিংবা তার মানব জগতে যে চিন্তাধারা জন্ম নিয়েছে, তা তার সমসাময়িকদের বা পরবর্তী বংশধরদের দিয়ে যেতে পারে। সুতরাং শিল্পমাধ্যমে অপর মানুষের অনুভূতি দ্বারা সংক্রমিত হতে পারে বলে সমসাময়িক মানুষের সর্বপ্রকারের অভিজ্ঞতা এ যুগের মানুষের আয়ত্তগম্য। শুধু তাই নয়, হাজার হাজার বছর আগে মানুষ যে অনুভূতির অভিজ্ঞতা লাভ করেছিল, তা সে যেমন অনুভব করতে পারে, তেমনি এ যুগের মানুষের পক্ষে অপরচিত্তে তার হৃদয় সংবেদনা সঞ্চারিত করে দেয়া সম্ভব। পূর্বগামী মানুষের চিন্তাধারা আপন চিত্তে গ্রহণ করবার মতা এবং অপরের চিত্তে আপন চিন্তাধারা সঞ্চারের মতা যদি তার না থাকত তবে মানুষের অবস্থা হতো বন্য পশুর কিংবা কাসপার হৌসের (Kasper Hauser)১ মতো। শিল্প সংক্রমিত হবার অপর মতা বঞ্চিত হলে মানুষের অবস্থা হতো আরও বেশি বর্বরের মতো। সর্বোপরি তারা পরষ্পর বিচ্ছিন্ন হয়ে একের প্রতি অপরের বৈরী ভাবাপন্ন হয়ে পড়তো। সুতরাং শিল্প-ক্রিয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। সে ক্রিয়া এমনকি বাক্শক্তির মতই সম-গুরুত্বপূর্ণ এবং বাক্শক্তির মতো সর্বব্যাপ্ত। 
.
কথা আমাদের ওপর উপদেশ, বক্তৃতা বা গ্রন্থমাধ্যমেই শুধু ক্রিয়াশীল নয়, আমাদের পারস্পরিক চিন্তা এবং অভিজ্ঞতা বিনিময়ের মধ্যেও ক্রিয়াশীল। ব্যাপক অর্থে শিল্পও তেমনি আমাদের সমগ্র জীবনে ব্যাপ্ত হয়ে আছে। তবে শিল্পের কয়েকটি মাত্র অভিব্যক্তির প্রতি আমরা খুব সীমাবদ্ধ অর্থেই শব্দটি প্রয়োগ করি। থিয়েটারে, ঐকতানবাদনে বা চিত্র প্রদর্শনীতে আমরা যা শুনি বা দেখি কেবল তাকেই আমরা শিল্প বলে ভাবতে অভ্যস্ত। এর সঙ্গে হর্ম্যরাজি, ভাস্কর্য, মূর্তি, কবিতা ও উপন্যাসকেও শিল্প মনে করা হয়।... কিন্তু যে শিল্পের সাহায্যে আমরা জীবনে পারস্পরিক আদান-প্রদান করি, এগুলি তার খুব সামান্য অংশ মাত্র। আমাদের সকলেরই জীবন শত প্রকারের শিল্পকর্ম দ্বারা পরিপূর্ণ, যেমন ঘুমপাড়ানি গান, হাসি-ঠাট্টা, ব্যাঙ্গানুকরণ, গৃহের অলংকরণ, পোশাক-পরিচ্ছদ এবং বাসন-কোশন থেকে শুরু করে গির্জার উপাসনা, দালান, স্মারকস্তম্ভ এবং বিজয় মিছিল ইত্যাদি। এ সবই শিল্পকর্ম। সুতরাং সীমাবদ্ধ অর্থে শিল্প বলতে আমরা অনুভূতি সঞ্চারক মানবিক ক্রিয়া মাত্রকেই বুঝি না, বরং আমরা যে অংশটিকে বিশেষ কারণে নির্বাচন করি অথবা যার ওপর বিশেষ গুরুত্ব অর্পণ করি, তাকেই শিল্প বলি। মানব শিল্প ক্রিয়ায় সে অংশের ওপরই সব চাইতে বেশি গুরুত্ব অর্পণ করেছে যা তাদের ধর্মীয় উপলব্ধি-উৎসারিত অনুভূতি সঞ্চার করে। এই ক্ষুদ্র অংশটির প্রতি শিল্পের সম্পূর্ণ অর্থ আরোপ করে সে অংশটিকেই তারা বিশেষভাবে শিল্প নামে অভিহিত করেছে। সক্রেটিস, প্লেটো, অ্যারিস্টটল প্রভৃতি পূর্বযুগের মানুষ শিল্পকে দেখেছিলেন এ দৃষ্টিভঙ্গির সাহায্যেই। হিব্র“ প্রবক্তাগণ এবং প্রাচীন যুগের খ্রীষ্টানেরাও অনুরূপ দৃষ্টিতে শিল্পের বিচার করতেন। শিল্প সম্পর্কে মুসলমানদের ধারণাও পূর্বাপর এরূপ। আমাদের ধর্মবোধ-সম্পন্ন কৃষক জনসাধারণও শিল্প বলতে এ যাবৎ ঠিক এই-ই বুঝে থাকেন। মানবজাতির কোন কোন শিক্ষক- যেমন প্লেটো তাঁর Republic-এ, আদি যুগের খ্রীষ্টানদের মতো কোন কোন ব্যক্তি, গোঁড়া মুসলমান এবং বৌদ্ধেরা শিল্প-ভাবনায় এত চরমপন্থী ছিলেন যে, তাঁরা সকল প্রকার শিল্পকেই অস্বীকার করেছেন। শিল্পবিরোধী এই মত অনুসারে, শিল্প মানুষকে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে সংক্রমিত করবার ভয়ঙ্কর শক্তি রাখে বলে নির্বিচারে শিল্পমাত্রাকেই স্বীকার করা অপো সমস্ত শিল্পকে বিসর্জন দেওয়াও মানবজাতির পে কম তিকর। বলাবাহুল্য, এই মতটি বর্তমানে প্রচলিত ‘প্রীতিপ্রদ শিল্পমাত্রই উত্তম’- এই মতের বিপরীত। এ পর্যায়ের মানুষ সকল প্রকরণের শিল্পকে নস্যাৎ করে দিয়ে ভুলই করেছিল- এটা খুবই স্পষ্ট। যেহেতু তারা এমন বস্তুকে অস্বীকার করেছে- যা অনস্বীকার্য। শিল্প মানবিক আদান-প্রদানের সেই অপরিহার্য উপকরণ, যার অভাবে মানবজাতির অস্তিত্ব রা সম্ভব হত না। কিন্তু যে শিল্প শুধুমাত্র সৌন্দর্য সেবায় নিয়োজিত অর্থাৎ মানুষকে আনন্দ দান করে, সে পর্যায়ের যে কোন শিল্পের আনুকূল্য করে আমাদের শ্রেণীভুক্ত এ যুগের য়ুরোপীয় সমাজের সুসভ্য মানুষও অবশ্য কম ভূল করেনি। পূর্বকালে মানুষের মনে একটা ভয় ছিল, শিল্পকর্মের মধ্যে এমন কিছু থাকা সম্ভব যার দ্বারা কোন কোন মানুষ কলুষিত হতে পারে। এ কারণে তারা শিল্পকে সম্পূর্ণভাবে বর্জন করেছিল। এখন তাদের একমাত্র ভয়, পাছে তারা শিল্প-উদ্ভূত কোন আনন্দ উপভোগ থেকে বঞ্চিত হয়। এ কারণেই তারা যে কোন প্রকরণের শিল্পের পৃষ্ঠপোষকতা করে। আমার মতে শেষোক্ত ভ্রান্তি প্রথমোক্ত ভ্রান্তির অপো অনেক বেশি কুৎসিত এবং পরিণামে অনেক বেশি তিকর। 
.
১.‘নিউরেমবার্গের কুড়িয়ে পাওয়া পরিত্যক্ত শিশু’ 
(the foundling of Nuremberg)। একে ২৩ মে, 
১৯২৮ সনে সে শহরের বাজারে পাওয়া গিয়েছিল। তাকে 
দেখতে ষোল বৎসরের মতো মনে হয়েছিল। সে খুব কম কথা বলত, 
এমনকি সাধারণ বস্তু সম্পর্কেও প্রায় সম্পূর্ণ অজ্ঞ ছিল। 
পরবর্তীকালে সে জানিয়েছিল, ভূনিম্নে আবদ্ধ অবস্থায় সে লালিত হয়েছিল।  
মাত্র একজন লোকে তাকে দেখতে আসত, তবে তাকেও সে কদাচিৎ দেখেছে।

সাম্প্রতিক নাটকের একটি সমস্যা

সাম্প্রতিক নাটকের একটি সমস্যা  
ঋত্বিককুমার ঘটক  
.
একটি নাটকের কাগজ পরিচালনা করতে গিয়ে আমি নানারকম নাটকের সম্মুখীন হয়েছি। এগুলো দেখে আমার মোটামুটি ধারণা জন্মেছে নবীনরা যা করছেন, তার অধিকাংশই গজভুক্ত কপিত্থবৎ। দেশজ ঘটনাগুলোকে এঁরা সম্পূর্ণভাবে গ্রহণ এবং অনুশীলন করতে পারেন বলে আমার মনে হয়নি।  
.
এঁদের কেউ কেউ একটা ফরাসী ব্যাপার অনুসরণ করছেন, যাকে এঁরা নাম দিয়েছেন অ্যাবসার্ড ড্রামা। ব্যাপারটা ঠিক আমি বুঝে উঠতে পারি না। ফরাসীদের একটা স্বভাব আছে, বদভ্যাসই বলতে পারেন। শিল্পীরা কাজ আরম্ভ করেই একটা ম্যানিফেস্টো বের করেন। জাঁ আনউই এই অ্যাবসার্ড ড্রামা কথাটির জন্ম দিয়েছেন। এ ব্যাপারটাই আসলে অ্যাবসার্ড। স্ট্রীন্ডবের্গের এক্সপ্রেশনিস্ট ড্রামা যাঁরা পড়েছেন, তাঁরা জানেন আনউই নতুন কিছু করেননি। বেকেট সম্পর্কেও একথা প্রযোজ্য। আজকালকার ছেলেরা স্ট্রীন্ডবের্গ বা ইবসেনের শেষদিকের কাজগুলো পড়েননি বলেই মনে হয়। এখনকার আনউই আর বেকেট এঁদেরকে নিয়ে এত নাচানাচি তা হলে হত না।  
.
আসলে ঘটনাটা হচ্ছে, আমাদের অধিকাংশ সা¤প্রতিক নাটকে মানব জীবন থেকে দূরে সরে যাওয়ার একটা ব্যাপার ঘটছে। প্রতিটি শিল্পীর কাছে মানুষের সঙ্গে ওতপ্রোত হয়ে যাবার একটা প্রশ্ন আছে। সেই জায়গা থেকে বিচ্যুত হলে পরে নানা কিসিমের উদ্ভট জিনিসের ব্যবস্থা করতে হয়, যাতে করে সস্তায় কিস্তিমাত করা যায়। আমাদের তরুণদের অনেকে তাই করছেন। বাংলাদেশে এখন দুটো দিকের ব্যাপার ঘটছে। একদিকে আমাদের গ্রামীন জীবনযাত্রা প্রচণ্ডভাবে বদলানের জন্য সি. আই. এ.-এর টাকা; আর-এক দিকে কিছু সৎ মানুষ সৎ উদ্দেশ্য নিয়ে কিছু চেষ্টাচরিত্তির করছেন কিন্তু তাঁদের ক্ষমতা নেই। সত্যিই ঘটনাটা গুলিয়ে গেছে। নজরুলের ভাষায় বলতে হয়, “দে গরুর গা ধুইয়ে।” ব্যাপারটা হয়েছে তাই। কিন্তু কথা হচ্ছে, দেশ এগোচ্ছে। নতুন শিশুদের জন্ম হচ্ছে এবং তারা নতুন জগৎ দেখছে। তাদের সম্বন্ধে তাদের বোধগম্য ভাষায় কথা বলতে হবে। আজকের বাংলাদেশের যে দুঃখ-দুর্দশা আমরা মাঠে ঘাটে দেখি, সেটি কলকাতা শহরে বসে অনুভব করা সম্ভব নয়। তাকে ভাষা দেওয়ার একটা প্রশ্ন আছে। সেই ভাষা ফুটিয়ে তোলার পক্ষে মঞ্চ হচ্ছে সবচেয়ে সহজ রাস্তা। সেখানে নিছক অনুবাদ আর অনুকরণ আর অনুসরণ দিয়ে নিছক মানুষের মন ভোলানো চোখ ধাঁধাঁনো পাপ বিশেষ। আজকের তরুণ নাট্যকাররা এই কথাটি যেন দয়া করে মনে রাখেন। আমার দেশ প্রচণ্ড দেশ। এদেশের মানুষের তুলনা নেই। এদের দেখলে প্রাণের মধ্য থেকে আমার ভালোবাসা উথলে ওঠে। সাধারণ গ্রামীণ মানুষ, তাদেরকে যখন আমি খাটতে দেখি আমার মন তখন ভালোবাসায় উদবেল হয়ে ওঠে।  
.
এঁদের জীবনযাত্রাকে প্রকট করার কি কোনো রাস্তাই পাওয়া যাবে না? তাহলে আমরা কীসের শিল্পী? শিল্পী বলে গৌরব করার আমাদের কী আছে? আমরা কী করেছি? কিছু করতে পারিনি। নাটক একটা অত্যন্ত শক্তিশালী মাধ্যম। তার মধ্য দিয়ে আমরা অনেক কথা বলতে পারতাম। পারিনি।  
.
আমি নিজে স্বীকার করছি যে আমার যেটুকু করণীয় ছিল তা আমি করে উঠিনি। অনেক হারিয়েছে। কিন্তু তরুণরা, যাঁরা দাবী করেন নাটকের ব্যাপারে খুব কিছু একটা করছেন তাঁরা কি একবারও গোটা ব্যাপারটাকে ভেবে দেখবেন না? দেশের মানুষকে ছেড়ে তাঁরা কেন এইসব আজেবাজে টেকনিকের মধ্যে ঢুকলেন (টেকনিক সম্পর্কে অবশ্য এঁদের অনেকেই কিছু বোঝেন না)। কেন এঁদের অনেকেই শুধু মন ভোলানো চোখ ধাঁধাঁনো নাটক করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন? এই তরুনদের মধ্যে সত্যিই কি মেরুদণ্ডশালী কেউ নেই যিনি সত্যিকারের কাজের কাজ করতে পারেন? দেখুন, সব শিল্পই শেষে গিয়ে পৌঁছয় কবিতাতে। এবং সে কবিতা হয় মেহনতি মানুষের দুঃখ-দুর্দশার ঘামে ভেজা কবিতা। এ ছাড়া কোনো শিল্পের শেষ অবধি টেঁকার কোনো ব্যাপার থাকে না, কোনোদিন থাকেনি। বলতে দুঃখ হচ্ছে যে এই পোড়া বাংলা দেশে এইসব বহু পুরাতন কথা আজ আমাকেই আবার বলতে হচ্ছে। কিন্তু কথাটা হচ্ছে, এই কথাগুলো আজ আবার বেশ চেঁচিয়ে বলা দরকার।  
.
রবীন্দ্রনাথের ভাষায়, “মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারানো পাপ।” আমিও মানুষকে অবিশ্বাস করার মতো অবস্থায় পৌঁছইনি। আমি জানি এই শিশু, এই ছেলেপুলে, এই তরুণদের মধ্য থেকেই আবার মানুষ উঠবে এবং বাংলা দেশকে তারাই আবার তুলে ধরবে। এদের ওপরই ভরসা। এরাই নাটককে কোন নতুন দিকে মোড় ফেরাবে। এরাই সেই ব্যাপারটা করে ফেলবে, যেটা আমরা এখনো ধরতেও পারছি না। এদের ভরসাতেই আশা করা যায়। ১৯৫১ সালে সাংবাদিক হিসেবে কলকাতা শহরে এক মাসে মোট ৩৬টি আত্মহত্যার ঘটনা আমাকে রিপোর্ট করতে হয়েছিল। কিন্তু ব্যাপারটা নিয়ে নাটক না লেখা পর্যন্ত আমার নিজের জ্বালা মিটল না। ব্যাপারটা কি? মৃত্যুর পর ৬টি চরিত্র একটা কাল্পনিক জায়গায় মিলিত হয়েছে। তারা কথাবার্তা বলে বুঝল সংসারে ছেলেপিলেরা তো আছে। ও আত্মহত্যা-ফত্যা কোনো কাজের কথা নয়, কোনো পথ নয়। তখন পৃথিবীতে তারা খবর পাঠাল যে, ‘সবাই বাঁয়ে হঠো।’  
.
ঋত্বিক কুমার ঘটক, চলচ্চিত্রকার হিসেবে যাঁর পরিচিতি, অবস্থান অতি উচ্চে। কিন্তু ভারতীয় গণ-নাট্য আন্দোলনের তিনি ছিলেন প্রধান ব্যক্তিত্ব। এই আন্দোলনের মূলনীতির খসড়াও তিনি তৈরী করেন। সমকালীন তরুণ প্রজন্মের নাট্যচেতনা নিয়ে লেখা তাঁর এই প্রবন্ধটি আজও সমকালীনতা হারায়নি। তাই তা পুনর্মুদ্রণ করা হলো।