পৃষ্ঠাসমূহ

২য় সংখ্যা লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
২য় সংখ্যা লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
লোকযাত্রা  
১ম বর্ষ, ২য় সংখ্যা, ডিসেম্বর ২০০৯ 
সূচি
.
.
লিও টলস্টয়
অনুবাদঃ দ্বিজেন্দ্রলাল নাথ
ওয়াহিদ সুজন  
.
মাসউদুর রহমান 
.
রাফসান গালিব 
মঈদ উদ্দিন তৌহিদ 
.
আসবাবীর রাফসান  
.

সম্পাদকীয় ১ম বর্ষ, ২য় সংখ্যা, ডিসেম্বর ২০০৯



মানব অস্তিত্বের ‘অনন্যতা’ কী? ‘মানুষ’ যদি পশুরই এক পদের নাম বলে কেউ মনে করেন, তবে তাকে ভিন্ন অন্যদের পুঁছি, মানুষের ‘অনন্যতা’ কী? মানুষ গান গাইতে পারে, পশু পারে না; মানুষ নাটকের সংলাপ মুখস্ত বলতে পারে, পশুর মুখস্ত বিদ্যা নেই; মানুষ ছবি আঁকে, পশু আঁকে না- এই কি মানুষের অনন্যতা? মানুষের অনন্যতা হলো- সে শিল্পী, সে তার দৈনন্দিন কাজের মধ্যে শিল্প ফুটিয়ে তুলতে পারে। আর গান, নাটক, কবিতা কিংবা চিত্রকলা নিছক সেই শিল্পকে প্রকাশের বাহন বৈ ভিন্ন কিছু নয়। কিন্তু সকলেই তো স্বীয় কাজে শিল্পের প্রকাশ ঘটাতে পারেন না, কিছু কিছু মানুষ পারেন। আবার সবাই সেই শিল্পকে দেখতেও পান না। তাই শিল্পী আর সাধারণ মানুষের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। তিনি সাধারণের মধ্যে থেকেও তার দৃষ্টিভঙ্গি, চিন্তাধারা ও মননের কারণে সবার থেকে অসাধারণ। মানুষের দৈনন্দিন কাজগুলোর মধ্যে হঠাৎ হঠাৎ শিল্পের জন্ম নেয়। শিল্পীর দৃষ্টিটা কেমন? 
.
অগুনতি মাথা দেখে আমি বলি কালো 
তুমি বলো দূরে দেখো চিল  
ডানা মেলা চিল, দেখো কালো ডানা চিল 
আকাশে ভাসে চিল। 
.
শিল্পীর দৃষ্টিটা মনে হয় এ রকম। তবে অবশ্যই তা অনর্থক ব্যাঙের মধ্যে সাপের অস্তিত্ব খুঁজে দেখার দৃষ্টি নয়। সৃজনশীল কোন কিছুই অহেতুক অনর্থক হতে পারে কি? প্রশ্নটা নিজেদের জন্য করে রাখলাম। আবার মানুষের সকল সৃজনশীল কর্মকাণ্ডকে কি শিল্প বলা যায়? সিগারেট কোম্পানীর স্পন্সরে যখন আমরা মুক্ত, আমরা স্বাধীন, আমরা স্মাটর্, আমরা ধূমপান করি না টাইপের সঙ্গীত রচিত হয়, সৃজনশীলতা এবং নন্দনের মাপকাঠিতে তা যতই উৎরে যাক, তাকে ঠিক কোন অর্থে শিল্প বলা যায়? আমরা তাকে শিল্প বলতে নারাজ। একে সর্বোচ্চ একটা উৎকৃষ্ট ঠাট্টা বলা যেতে পারে।  
.
শিল্প প্রসঙ্গে আমাদের ভাবনাগুলো এভাবেই পথ খুঁজে পাচ্ছে। এ সংখ্যায় প্রকাশিত লেখাগুলো শিল্প সম্পর্কে আমাদের সিদ্ধান্তকে প্রকাশ করছে না, বরং শিল্প নিয়ে আমাদের নিরন্তর জিজ্ঞাসার যাত্রা মাত্র। লোকযাত্রার পরবর্তী সংখ্যাগুলোতেও আমাদের অনুসন্ধান অব্যাহত রাখার ইচ্ছা পোষণ করি। 
.
বিনীত 
মাসউদুর রহমান 
সাইফ শাওন 
ডিসেম্বর ২০০৯

শিল্পের সংজ্ঞা ও সীমা

শিল্পের সংজ্ঞা ও সীমা 
লিও টলস্টয় 
অনুবাদঃ দ্বিজেন্দ্রলাল নাথ 
.
যে বিভ্রান্তিকর সৌন্দর্যের ধারণা সমস্ত ব্যাপারকে গুলিয়ে ফেলে, সে ধারণাবিষয়ক বিচার আপাতত স্থগিত রেখে শিল্প বলতে কি বোঝায় এখন তার বিচার করা যাক। সৌন্দর্যের ধারণা বাদ দিলে শিল্পের সা¤প্রতিকতম এবং সর্বাপো ব্যাপকসংজ্ঞা নিম্নরূপঃ ১. ক. শিল্প এমন একটি ক্রিয়া যার আত্মপ্রকাশ এমনকি পশুজগতেও দেখা যায়। যৌন আকাক্সা এবং খেলার প্রবণতা শিল্পের উৎস (শীলার, ডারউইন, স্পেনসার) এবং খ. স্নায়ুতন্ত্রীয় আনন্দময় উত্তেজনা শিল্পক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত (গ্রান্ট এলেন)। এটি শারীরতাত্ত্বিক বিবর্তনবাদী সংজ্ঞা। ২. মানুষের উপলব্ধ অনুভূতিগুলিকে রেখা, বর্ণ, গতি, ধ্বনি অথবা শব্দের সাহায্যে বহির্জগতে অভিব্যক্তি দেওয়াই শিল্প (ভেরোঁ, Veron)। এই হল শিল্পের সমীক্ষা নির্ভর সংজ্ঞা। খুব সা¤প্রতিক সংজ্ঞা মতে (Sully), শিল্প কোন স্থায়ী বস্তু অথবা চলমান ক্রিয়ার সৃষ্টি, যা স্রষ্টার মনে শুধুমাত্র সক্রিয় আনন্দদানে সমর্থ নয়, বরং বহুসংখ্যক দর্শক বা শ্রোতার আনন্দময় অনুভূতি সৃষ্টিতে সম, শিল্প-উদ্ভূত যে অনুভূতি কোন ব্যক্তিগত লাভালাভের প্রশ্ন থেকে স্বতন্ত্র। 
.
এ সমস্ত সংজ্ঞা সৌন্দর্যের ধারণানির্ভর অধিবিদ্যাগত সংজ্ঞার চাইতে উন্নতমানের হলেও যথার্থ শিল্পসংজ্ঞা থেকে দূরবর্তী। প্রথম, অর্থাৎ শারীরতাত্ত্বিক বিবর্তনবাদী সংজ্ঞা- ১. ক. অযথার্থঃ যেহেতু প্রকৃত আলোচ্য বস্তু শৈল্পিক ক্রিয়া বিষয়ে আলোচনা না করে সে সংজ্ঞা শিল্পের ব্যুৎপত্তি নির্ণয়ে ব্যাপৃত। এর উপরে সংশোধিত। খ. মানব দেহের উপর শারীরতাত্ত্বিক প্রভাবনির্ভর সংজ্ঞাও অযথার্থ, যেহেতু এ সংজ্ঞার সীমার মধ্যে অপরাপর আরও অনেক মানবিক ক্রিয়াকে অন্তর্ভূক্ত করা যায়। যেমন, নবনন্দনতাত্ত্বিক মতবাদে সুন্দর বস্ত্র তৈরি, প্রীতিদায়ক গন্ধদ্রব্য, এমনকি খাদ্য ও পানীয় প্রস্তুতকেও এ তত্ত্ববাদীরা শিল্প বলে বিবেচনা করেন। 
.
কর্মক্ষেত্রে প্রয়োগগত পরীক্ষামূলক সংজ্ঞাঃ ২. যা শুধুমাত্র আবেগের অভিব্যক্তিকেই শিল্প বিবেচনা করে তাও অযথার্থ। যেহেতু কোন ব্যক্তি রেখা, রং, ধ্বনি অথবা কাজের সাহায্যে আবেগ প্রকাশে সম হলেও এ ধরণের প্রকাশব্যঞ্জনা যদি অপর ব্যক্তির ওপর প্রভাব বিস্তারে অসমর্থ হয়, তবে তাঁর আবেগের অভিব্যক্তিও শিল্প বলে বিবেচ্য নয়।
তৃতীয় সংজ্ঞাও (Sully) অযথার্থ, যেহেতু স্রষ্টার মনে আনন্দ সৃষ্টি অথবা দর্শক বা শ্রোতার কোন ব্যক্তিগত সুবিধা বিধান ব্যতিরেকে আনন্দময় আবেগসৃষ্টিতে সম কোন বস্তু উৎপাদন বা ক্রিয়াকেও শিল্প বলা যায় না। কারণ, এরূপ ক্রিয়ার মধ্যে পড়ে ঐন্দ্রজালিক কৌশল কিংবা শারীরিক কসরত অথবা ওই ধরনের আরও কোন কোন ক্রিয়া যা শিল্পপদবাচ্য নয়। অধিকন্তু এমন অনেক বস্তু দেখা যায় যার অভিব্যক্তি স্রষ্টার মনে কোন আনন্দ সঞ্চার করে না। বরং সে সমস্ত বস্তু-উদ্ভূত চেতনা অতৃপ্তিদায়ক। উদাহরণস্বরূপ, কাব্য বা নাটকে বর্ণিত কোন বিষস্ন, হৃদয়বিদারক দৃশ্য মনকে বেদনাচ্ছন্ন করে। তথাপি এ সমস্ত দৃশ্য নিঃসন্দেহে শিল্পকর্ম হতে পারে। যে কারণে এ সমস্ত সংজ্ঞা যথাযথ হয়ে ওঠেনি তা হল এইঃ এ সমস্ত সংজ্ঞার সব ক-টির মধ্যে (এমনকি অধিবিদ্যাগত সংজ্ঞার ক্ষেত্রেও) শিল্প কি পরিমাণে আনন্দ বিধানে সম, এ প্রশ্নই শুধু বিবেচিত হয়েছে ব্যক্তি-মানুষ বা মানবজীবনে শিল্প কি উদ্দেশ্য সাধনের উপযোগী তা বিবেচিত হয়নি। 
.
শিল্পের অভ্রান্ত সংজ্ঞা নির্দেশের জন্য প্রথমেই প্রয়োজন শিল্পকে আনন্দদানের বাহন হিসেবে বিবেচনা না করে মানব জীবনেরই একটি অঙ্গ হিসেবে বিবেচনা করা। এই দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে শিল্প মানুষের পারস্পরিক সম্পর্কের উপায়গুলির মধ্যে অন্যতমএ সিদ্ধান্তে উপনীত হতে আমাদের ভূল হবে না। প্রত্যেক শিল্পকর্ম উপভোক্তাকে শিল্পস্রষ্টার সঙ্গে একটি বিশেষ সম্পর্কে আসতেই শুধু সাহায্য করে না, সমকালীন বা পরবর্তী কালে ওই শিল্প-প্রভাবিত ব্যক্তিদের সঙ্গেও আত্মীয়তার সূত্রে আবদ্ধ হতে সহায়তা করে। মানবিক চিন্তা এবং অভিজ্ঞতা সঞ্চারক ভাষাই মানুষের মধ্যে এই মিলনসূত্র রচনা করে। শিল্পও সেই একই উদ্দেশ্য সাধন করে। শেষোক্ত মানব সম্পর্ক বিধায়ক উপায়টির বৈশিষ্ট্য শাব্দিক যোগসূত্রের উপায় থেকে পৃথক। সে বৈশিষ্ট্যের স্বরূপ এইঃ ভাষার সাহায্যে মানুষ নিজের চিন্তাসম্পদকে অপরের নিকট পৌঁছিয়ে দেয়; অপর পক্ষে শিল্পের মাধ্যমে সে নিজ অনুভূতিকে অপরের মধ্যে সঞ্চারিত করে। শিল্পক্রিয়ার ভিত্তি এই সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত যে, শ্রবণ ও দর্শনের সাহায্যে যখন কেউ অপরের ভাবানুভূতি উপলব্ধি করে, ওই আবেগচালিত মানুষের আবেগটিও সে অন্তরে উপলব্ধি করতে সম। একটি অত্যন্ত সহজ দৃষ্টান্ত নেওয়া যেতে পারেঃ কোন ব্যক্তি হাসলে অপর ব্যক্তি সে হাসি শুনে আনন্দ অনুভব করে, অথবা কোন ব্যক্তি কাঁদলে অপর ব্যক্তি সে কান্না শুনে দুঃখবোধ করে। কোন ব্যক্তিকে উত্তেজিত বা বিরক্ত দেখলে অপর ব্যক্তির মনেও একই ভাব জাগ্রত হয়। অঙ্গসঞ্চালন বা কণ্ঠস্বরের সাহায্যে কোন ব্যক্তি যখন সাহস, দৃঢ়সংকল্প, বিষণœতা বা ধৈর্য্যরে অভিব্যক্তি প্রকাশ করে, তার এ মানসিক অবস্থা অপরের মধ্যেও সঞ্চারিত হয়। কোন ব্যক্তি যন্ত্রণাগ্রস্থ হলে গোঙানি এবং মাংসপেশীর আক্ষেপের সাহায্যে তা ব্যক্ত করে, এবং তার এই যন্ত্রণাই যেন অপরের মধ্যে সঞ্চারিত হয়। যখন কেউ কোন বস্তু, ব্যক্তি অথবা ইন্দ্রিয়গোচর কোন দৃশ্যের প্রতি স্বীয় বিস্ময়, অনুরাগ, ভয়, শ্রদ্ধা বা ভালোবাসার অনুভূতি প্রকাশ করে তখন অনুরূপভাবে অপরেও সে একই বস্তু, ব্যক্তি অথবা দৃশ্যের প্রতি একই ধরণের বিস্ময়, অনুরাগ, ভীতি, শ্রদ্ধা অথবা ভালোবাসার অনুভূতির দ্বারা সংক্রমিত হয়। বস্তুতপে অপর ব্যক্তির ভাবানুভূতির ব্যঞ্জনার মর্মগ্রহণ এবং সে অনুভূতি আপন হৃদয়ে অনুভব করার সামর্থ্যই শিল্পক্রিয়ার ভিত্তি। 
.
যদি কোন ব্যক্তি হৃদয়ে আবেগমথিত হয়ে আপন দেহলণ বা কণ্ঠনিসৃত কাজের সাহায্যে প্রত্য ও তাৎণিকভাবে অপর ব্যক্তি বা ব্যক্তিসমূহকে সংক্রমিত করেন, হাই তোলান, হাসতে বা কাঁদতে বাধ্য হয়ে অপরকেও হাসান-কাঁদান, অথবা নিজে যন্ত্রণা ভোগ করায় অপরের মনেও যন্ত্রণার অনুভূতি সৃষ্টি করেন- সেটা কিন্তু শিল্পপদবাচ্য নয়। শিল্পের আবির্ভাব তখনই ঘটে যখন কোন ব্যক্তি অপর একজন বা একাধিক ব্যক্তির সঙ্গে মিলনের অভিপ্রায়ে সমভাবাপন্ন অনুভূতি-প্রভাবে বাহ্যিক লণ বা ইঙ্গিতের সাহায্যে সে অনুভূতির অভিব্যক্তি দেন। সহজতম একটি উদাহরণ দেওয়া যাকঃ একটি নেকড়ে বাঘের সম্মুখীন হয়ে একটি বালক যে অনুভূতি অর্জন করল, ধরা যাক- সে অনুভূতি ভয়ের। এ সাাৎকারের অভিজ্ঞতা তার অন্তরে যে অনুভূতি সৃষ্টি করেছিল অপরের মধ্যে তা উদ্দীপিত করার উদ্দেশ্যে সে নিজের বিষয়ে বর্ণনা, নেকড়ের  সাক্ষাৎকারের অবস্থা, সেখানকার পরিবেশ এবং বনের বিবরণ, নিজ অন্তরের নিরুদ্বিগ্নতার বর্ণনার পর নেকড়ের আকৃতি, চলাফেরা, তার থেকে নেকড়ের দূরত্ব ইত্যাদির পরিচয় দিয়ে বাঘের সম্মুখীন হওয়ার অভিজ্ঞতা ইত্যাদি বর্ণনা করল। এ অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়ে বালকটির মনে যে অনুভূতির সৃষ্টি হয়েছিল, গল্প বলার সময় যদি তার অন্তরে সে অনুভূতির পুনরাবির্ভাব ঘটে এবং শ্রোতৃবৃন্দ যদি সে অনুভূতি-দ্বারা সংক্রমিত হয়, তবে অবশ্যই তা শিল্পপদবাচ্য। সে বালকটি নেকড়ে বাঘ না দেখেও বারংবার নেকড়ে বাঘের ভয়ে ভীত হয়ে অপরের অন্তরে নিজের ভীতির অনুভবকে জাগিয়ে তোলবার উদ্দেশ্যে যদি নেকড়ে বাঘের সঙ্গে সাাৎকারের একটি ঘটনা উদ্ভাবন করে এবং পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে তার বর্ণনা দেয় এবং তার মনে যে ভীতির অনুভূতির সৃষ্টি হয়েছিল তার শ্রোতাদের সে অনুভূতির অংশভাগী করতে সমর্থ হয়, তাও শিল্প বলে বিবেচিত হবে। যখন কেউ ভয় বা যন্ত্রণা, অথবা উপভোগের আকর্ষণ (বাস্তবে বা কল্পনায় যাতেই হোক না কেন)-এর অভিজ্ঞতা লাভ করে সে অনুভূতিকে ক্যানভাস বা মার্বেলের উপর ফুটিয়ে তোলেন এবং সে দৃশ্য দেখে অপর ব্যক্তিও যদি সংক্রমিত হন- একই ভাবে তাও শিল্পের স্বীকৃতি পাবে। এ ছাড়া কোন ব্যক্তির অন্তরে, এমনকি কল্পনায়ও উল্লাস, আনন্দ, দুঃখ, নৈরাশ্য, সাহস অথবা বিষণœতার অনুভূতি জাগ্রত হবার পর তিনি যদি এ অনুভূতিগুলির পারস্পরিক ক্রমসঞ্চারকে সুরের সাহায্যে এমনিভাবে অনুভূতি দেন যে- শ্রোতারা তার দ্বারা শুধু সংক্রমিত হন না, বরং সুরকর্তার অভিজ্ঞতাকে নিজের অন্তরে অনুভব করেন, তবে সেটাও শিল্প বলে স্বীকৃতি লাভ করবে। যে অনুভূতির সাহায্যে শিল্পী অপরকে সংক্রমিত করেন তা খুব তীব্র অথবা মৃদু, খুব গুরুত্বপূর্ণ অথবা অকিঞ্চিতকর, খুবই মন্দ অথবা খুবই উত্তম- নানা ধরনের হতে পারে। স্বদেশের জন্য ভালবাসার চেতনা, নাটকে অভিব্যক্ত আত্মনিবেদন, ঈশ্বর বা ভাগ্যের নিকট আত্মসমর্পণ, উপন্যাসে বর্ণিত প্রেমিকযুগলের আত্মহারা অবস্থা, কোন চিত্রে প্রকাশিত ইন্দ্রিয়পরায়ণতার অনুভূতি, বিজয়ী কুচকাওয়াজে অভিব্যক্ত সাহস, কোন নৃত্য দ্বারা উদ্রিক্ত কলহাস্যময় পুলকোচ্ছ্বাস, কৌতুকপূর্ণ গল্পসৃষ্ট হাস্যরস, সান্ধ্য প্রকৃতির দৃশ্য, অথবা ঘুম-পাড়ানির গান দ্বারা সঞ্চারিত প্রশান্তির অনুভূতি, সুন্দর ও অদ্ভূত কোন অলংকার দর্শনে মুগ্ধ প্রশংসা- এ সবই শিল্প। স্রষ্টার অন্তরে যে অনুভূতি জাগ্রত হয়েছিল, দর্শক এবং শ্রোতাও যদি তার দ্বারা সংক্রমিত হন, তবে নিঃসন্দেহে তা শিল্প। এককালে উপলব্ধ অনুভূতি নিজের মধ্যে জাগ্রত করা, সে জাগ্রত অনুভূতিকে গতি, রেখা, রং, ধ্বনি ও রূপের সাহায্যে কথায় প্রকাশ করা এবং অপর ব্যক্তির মধ্যে স্রষ্টার সেই অনুভূতির অভিজ্ঞতাকে সঞ্চারিত করাকেই বলা চলে শিল্পক্রিয়া। 
.
শিল্প একটি মানবিক ক্রিয়া। শিল্পসৃষ্টির প্রক্রিয়া এরূপ: কোন ব্যক্তি আপন হৃদয়ে উপলব্ধ অনুভূতিকে বাহ্য অভিজ্ঞানের সাহায্যে অপরের চিত্তে সঞ্চারিত করেন এবং অপরেও যখন অনুরূপ ভাবানুভূতির দ্বারা সংক্রমিত হন এবং আপন হৃদয়ে অনুরূপভাবে উপলব্ধি করেন, তখনি হয় শিল্পের জন্ম। অধিবিদ্যাবিদেরা শিল্পকে সৌন্দর্যের অথবা ঈশ্বরের কোন অতীন্দ্রিয় ভাবপদার্থের অভিব্যক্তি বলে যে বর্ণনা করেন, শিল্প তা নয়। নন্দনতাত্ত্বিক শারীরতত্ত্ববিদেরা মানুষের সঞ্চিত উদ্বৃত কর্মশক্তির মুক্তির উৎস-ক্রীড়াকে যে শিল্প বলে মত প্রকাশ করেন- শিল্প তাও নয়। বাহ্যিক কোন অভিজ্ঞানের সাহায্যে আবেগের অভিব্যক্তি দেওয়াও শিল্প নয়। প্রীতিদায়ক বস্তুর সৃষ্টিও শিল্প নয়। বরং শিল্প এমন একটি বস্তু, যা একই অনুভূতির মাধ্যমে মানুষকে একত্র সংযুক্ত করে। ব্যক্তি ও মানবতার জীবন ও মঙ্গলময় প্রগতির উপায় হিসেবে শিল্পের প্রয়োজন অপরিহার্য। 
.
ভাষার মাধ্যমে চিন্তা প্রকাশের মতা প্রকাশের অধিকারী বলে পূর্ববর্তী মানবসমাজের অবদান কী, পরবর্তী কালে প্রত্যেক মানুষ তা জানতে পারে। অপরের চিন্তাধারা উপলব্ধিতে সম বলে বর্তমান কালের মানুষ পূর্ববর্তীদের ক্রিয়াকলাপের অংশীদার হতে পারে। এ যুগের মানুষ অপর ব্যক্তির যে চিন্তাধারা আত্মসাৎ করেছে কিংবা তার মানব জগতে যে চিন্তাধারা জন্ম নিয়েছে, তা তার সমসাময়িকদের বা পরবর্তী বংশধরদের দিয়ে যেতে পারে। সুতরাং শিল্পমাধ্যমে অপর মানুষের অনুভূতি দ্বারা সংক্রমিত হতে পারে বলে সমসাময়িক মানুষের সর্বপ্রকারের অভিজ্ঞতা এ যুগের মানুষের আয়ত্তগম্য। শুধু তাই নয়, হাজার হাজার বছর আগে মানুষ যে অনুভূতির অভিজ্ঞতা লাভ করেছিল, তা সে যেমন অনুভব করতে পারে, তেমনি এ যুগের মানুষের পক্ষে অপরচিত্তে তার হৃদয় সংবেদনা সঞ্চারিত করে দেয়া সম্ভব। পূর্বগামী মানুষের চিন্তাধারা আপন চিত্তে গ্রহণ করবার মতা এবং অপরের চিত্তে আপন চিন্তাধারা সঞ্চারের মতা যদি তার না থাকত তবে মানুষের অবস্থা হতো বন্য পশুর কিংবা কাসপার হৌসের (Kasper Hauser)১ মতো। শিল্প সংক্রমিত হবার অপর মতা বঞ্চিত হলে মানুষের অবস্থা হতো আরও বেশি বর্বরের মতো। সর্বোপরি তারা পরষ্পর বিচ্ছিন্ন হয়ে একের প্রতি অপরের বৈরী ভাবাপন্ন হয়ে পড়তো। সুতরাং শিল্প-ক্রিয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। সে ক্রিয়া এমনকি বাক্শক্তির মতই সম-গুরুত্বপূর্ণ এবং বাক্শক্তির মতো সর্বব্যাপ্ত। 
.
কথা আমাদের ওপর উপদেশ, বক্তৃতা বা গ্রন্থমাধ্যমেই শুধু ক্রিয়াশীল নয়, আমাদের পারস্পরিক চিন্তা এবং অভিজ্ঞতা বিনিময়ের মধ্যেও ক্রিয়াশীল। ব্যাপক অর্থে শিল্পও তেমনি আমাদের সমগ্র জীবনে ব্যাপ্ত হয়ে আছে। তবে শিল্পের কয়েকটি মাত্র অভিব্যক্তির প্রতি আমরা খুব সীমাবদ্ধ অর্থেই শব্দটি প্রয়োগ করি। থিয়েটারে, ঐকতানবাদনে বা চিত্র প্রদর্শনীতে আমরা যা শুনি বা দেখি কেবল তাকেই আমরা শিল্প বলে ভাবতে অভ্যস্ত। এর সঙ্গে হর্ম্যরাজি, ভাস্কর্য, মূর্তি, কবিতা ও উপন্যাসকেও শিল্প মনে করা হয়।... কিন্তু যে শিল্পের সাহায্যে আমরা জীবনে পারস্পরিক আদান-প্রদান করি, এগুলি তার খুব সামান্য অংশ মাত্র। আমাদের সকলেরই জীবন শত প্রকারের শিল্পকর্ম দ্বারা পরিপূর্ণ, যেমন ঘুমপাড়ানি গান, হাসি-ঠাট্টা, ব্যাঙ্গানুকরণ, গৃহের অলংকরণ, পোশাক-পরিচ্ছদ এবং বাসন-কোশন থেকে শুরু করে গির্জার উপাসনা, দালান, স্মারকস্তম্ভ এবং বিজয় মিছিল ইত্যাদি। এ সবই শিল্পকর্ম। সুতরাং সীমাবদ্ধ অর্থে শিল্প বলতে আমরা অনুভূতি সঞ্চারক মানবিক ক্রিয়া মাত্রকেই বুঝি না, বরং আমরা যে অংশটিকে বিশেষ কারণে নির্বাচন করি অথবা যার ওপর বিশেষ গুরুত্ব অর্পণ করি, তাকেই শিল্প বলি। মানব শিল্প ক্রিয়ায় সে অংশের ওপরই সব চাইতে বেশি গুরুত্ব অর্পণ করেছে যা তাদের ধর্মীয় উপলব্ধি-উৎসারিত অনুভূতি সঞ্চার করে। এই ক্ষুদ্র অংশটির প্রতি শিল্পের সম্পূর্ণ অর্থ আরোপ করে সে অংশটিকেই তারা বিশেষভাবে শিল্প নামে অভিহিত করেছে। সক্রেটিস, প্লেটো, অ্যারিস্টটল প্রভৃতি পূর্বযুগের মানুষ শিল্পকে দেখেছিলেন এ দৃষ্টিভঙ্গির সাহায্যেই। হিব্র“ প্রবক্তাগণ এবং প্রাচীন যুগের খ্রীষ্টানেরাও অনুরূপ দৃষ্টিতে শিল্পের বিচার করতেন। শিল্প সম্পর্কে মুসলমানদের ধারণাও পূর্বাপর এরূপ। আমাদের ধর্মবোধ-সম্পন্ন কৃষক জনসাধারণও শিল্প বলতে এ যাবৎ ঠিক এই-ই বুঝে থাকেন। মানবজাতির কোন কোন শিক্ষক- যেমন প্লেটো তাঁর Republic-এ, আদি যুগের খ্রীষ্টানদের মতো কোন কোন ব্যক্তি, গোঁড়া মুসলমান এবং বৌদ্ধেরা শিল্প-ভাবনায় এত চরমপন্থী ছিলেন যে, তাঁরা সকল প্রকার শিল্পকেই অস্বীকার করেছেন। শিল্পবিরোধী এই মত অনুসারে, শিল্প মানুষকে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে সংক্রমিত করবার ভয়ঙ্কর শক্তি রাখে বলে নির্বিচারে শিল্পমাত্রাকেই স্বীকার করা অপো সমস্ত শিল্পকে বিসর্জন দেওয়াও মানবজাতির পে কম তিকর। বলাবাহুল্য, এই মতটি বর্তমানে প্রচলিত ‘প্রীতিপ্রদ শিল্পমাত্রই উত্তম’- এই মতের বিপরীত। এ পর্যায়ের মানুষ সকল প্রকরণের শিল্পকে নস্যাৎ করে দিয়ে ভুলই করেছিল- এটা খুবই স্পষ্ট। যেহেতু তারা এমন বস্তুকে অস্বীকার করেছে- যা অনস্বীকার্য। শিল্প মানবিক আদান-প্রদানের সেই অপরিহার্য উপকরণ, যার অভাবে মানবজাতির অস্তিত্ব রা সম্ভব হত না। কিন্তু যে শিল্প শুধুমাত্র সৌন্দর্য সেবায় নিয়োজিত অর্থাৎ মানুষকে আনন্দ দান করে, সে পর্যায়ের যে কোন শিল্পের আনুকূল্য করে আমাদের শ্রেণীভুক্ত এ যুগের য়ুরোপীয় সমাজের সুসভ্য মানুষও অবশ্য কম ভূল করেনি। পূর্বকালে মানুষের মনে একটা ভয় ছিল, শিল্পকর্মের মধ্যে এমন কিছু থাকা সম্ভব যার দ্বারা কোন কোন মানুষ কলুষিত হতে পারে। এ কারণে তারা শিল্পকে সম্পূর্ণভাবে বর্জন করেছিল। এখন তাদের একমাত্র ভয়, পাছে তারা শিল্প-উদ্ভূত কোন আনন্দ উপভোগ থেকে বঞ্চিত হয়। এ কারণেই তারা যে কোন প্রকরণের শিল্পের পৃষ্ঠপোষকতা করে। আমার মতে শেষোক্ত ভ্রান্তি প্রথমোক্ত ভ্রান্তির অপো অনেক বেশি কুৎসিত এবং পরিণামে অনেক বেশি তিকর। 
.
১.‘নিউরেমবার্গের কুড়িয়ে পাওয়া পরিত্যক্ত শিশু’ 
(the foundling of Nuremberg)। একে ২৩ মে, 
১৯২৮ সনে সে শহরের বাজারে পাওয়া গিয়েছিল। তাকে 
দেখতে ষোল বৎসরের মতো মনে হয়েছিল। সে খুব কম কথা বলত, 
এমনকি সাধারণ বস্তু সম্পর্কেও প্রায় সম্পূর্ণ অজ্ঞ ছিল। 
পরবর্তীকালে সে জানিয়েছিল, ভূনিম্নে আবদ্ধ অবস্থায় সে লালিত হয়েছিল।  
মাত্র একজন লোকে তাকে দেখতে আসত, তবে তাকেও সে কদাচিৎ দেখেছে।

জীবন যখন শিল্পময় হয়ে ওঠে

জীবন যখন শিল্পময় হয়ে ওঠে 
মাঈন উদ্দিন জাহেদ 
.
জীবন ও বোধের সাথে যারা প্রতারণা করেননি তারা তারা মহাকালকে ছুঁয়ে গেছে আপন সততায়। সেই সততার হৃদয় ভাষ্য কাসিক হয়ে টিকে আছে মহাকালের ধূলো উড়িয়ে। সততার এ নির্মম রূঢ়তা তাদের গড়ে তুলেছে নিখাদ শিল্পী, নৈপূণ্যের কারিগর, পেয়েছে তারা হৃদয়ের বন্ধুতা। জীবনের পলে পলে যারা বোধকে ঘষে মেজে নির্ভার করেছেন তাদের মূহুর্তমালার অনুণের কষ্ট কেউ কি আলতো ছুঁয়ে দেখেছেন? দেখেছে কি কেউ তলস্তয়ের এক একটি গল্প উপন্যাসের ঘটনার পেছনে অনুঘটনাগুলো কী? 
.
উপমা হিসেবে যখন তলস্তয় আসলোই তাহলে প্রসঙ্গটাও টানা যাক্। শিল্প কী এ নিয়ে নানান তর্ক ও ভাষ্য রয়েছে। এমন কী এ নিয়ে মহা মনীষী লেভ তলস্তয়ও ভেবেছেন বিস্তর। তার উপন্যাস ও গল্পের অরায়নের পেছনেও অনেক যুক্তি তর্কের রক্তরণ চলেছে হৃদয় ও মননে। কৈশোর থেকে প্রৌঢ়ত্বের কিংবা প্রান্ত বয়সে যখন তিনি জমিদারী ছেড়ে ছুড়ে চলে গেলেন অখ্যাত রেল স্টেশনে- তখনও তিনি বোধের তাড়নায় চৈতন্যের হাহাকারে ভেসেছেন। পীড়ণ তাকে পঁই পঁই করে বুঝিয়ে দিয়েছেন জীবন কী? শিল্প কী? যাপন কতটুকু আইন ও ঔচিত্যের সীমা টানবে? 
.
ইমাম শামিলের জীবন তাকে ককেসাসের মুক্তির সংগ্রাম লিখতে কীভাবে তাড়িত করেছিল তার উপন্যাসের চরিত্রগুলোর ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ না করলে বুঝা যায় না! যারা ‘মানুষ কেন গান গায়’ এ বোধের পেছনে শুধু রাজনীতি বুঝেন তারা আর যাই হোক জীবনের অতল গহ্বরে প্রবেশ করতে পারেন না! পারেন শুধু এক চোখা তাত্ত্বিক হয়ে ইতিহাসের দ্বান্দ্বিক বিশ্লেষণে। ‘হাজী মুরাদ’, ‘ককেসাসের বন্দী’, ‘কসাক’ পড়লেই বুঝা যায় জীবনের পরতে পরতে কত রণ ও মুক্তি আকাক্সা লুকিয়ে আছে।  
.
ফাদার সিয়ের্গি’ যারা পড়েছেন তারা তো জীবনের সাথে সামাজিক বোধ ও চৈতন্যের খেলো অবস্থান টের পেয়েছেন। দ্বন্দ্বের মাঝে পড়েই মানুষ জীবনের মাহুর্তিক জ্যোতিরময়তা ও উপলব্ধির বহুমুখিতা টের পান। আমাদের সামাজিক জীবনের কত বড় অভিনেতা হয়ে আমরা স্ববিরোধী অভিনয় করে যাচ্ছি! কিংবা আমাদের ভেতরগত মনন বাস্তবতায় কত হাজার খাদ আমরা পেতে রেখেছি- আধুনিক সাইকিয়াটিস্টদের গবেষণার সহায়ক হবে এর গল্পগুলো। 
.
যুদ্ধ ও শান্তি’র হাজার চরিত্র কিংবা ‘রিজারেকশন’র ঘটনাপুঞ্জ বিস্ময় সৃষ্টি করে একজন লেখকের মনোচৈতন্যের বিশালতা ও বৈচিত্র্যের, উপলব্ধির বর্ণিলতা ও সাগরিকতার, চৈতন্যের বিমুগ্ধতাকে কতটুকু মমতায় ছেঁনে তুলেছেন তার লিপি অরে। কিংবা যদি ধরি ‘আন্না কারেনিনা’র কথা। পাঠক ভাবতে পারে ইতিহাস, বোধ, জাতিত্ববোধ, মনোগঠনের বর্ণিল বিভা, প্রেম কতটুকু হলে আজও পাঠ্য হয়ে দাঁড়ায় এ জটিল-জলো-রাহস্যিক সময়ে! ‘শিল্প’ প্রসঙ্গ টানতে ‘তলস্তয়’ চলে এলো এ জন্য যে, শিল্প নিয়ে এই মহামুনি যেভাবে ভেবেছেন অন্যরা সেভাবে জীবনে ও যাপনে তা করেননি। এমন কি তা নিয়ে যে দু’টো মহামূল্য ভাষ্য লিখে গেছেন, অনন্য হয়ে আছে তা ভাবনার জন্য, বিশ্লেষণের জন্য, বিশ্লেষণ পদ্ধতির বিশিষ্টতা ও উপলব্ধির জায়গায় ভিন্নতার জন্য। 
.
শিল্প নিয়ে কথা আছে ‘কোন এক শতাব্দীতে দু’জন মনীষীকে পাওয়া যাবে না ঐক্যমত’ হয়েছেন। সে পুরোনো কথা। আসল কথা হচ্ছে তলস্তয়ের মত ভাবনা তেমন কেউ করেননি। শুধু ভাবনা নয় গল্প ও উপন্যাসের উপস্থাপনায় কিংবা কাহিনীর জাল বিন্যাসে তিনি এমনভাবে সাজিয়েছেন একজন পাঠকের মনেই হয় না তিনি গল্প কিংবা নভেল পড়ছেন। আশলে পড়ছেন নয় দেখছেন। দেখছেন নয় তার চোখের সামনে চিরপরিচিত চরিত্রগুলো যেন একে একে ঘটিয়ে যাচ্ছেন ঘটনাগুলো। কারণ তার গল্প শুধুই গল্প ছিল না, ছিল উপলব্দি জীবনের কথকতা। অনুভূতিপ্রবণতা তাকে এত আচ্ছন্ন রাখতো যে বাস্তব জীবনে নাগরিক দুঃখ দেখেই তিনি বিচলিত হয়ে উঠতেন। ‘তাই সব ছেড়ে ছুড়ে চলে গিয়েছিলেন আবার একান্ত নিবাসে।’ তাই তার গল্প পাঠ জীবন পাঠের মতই। তার জীবন পাঠ বিশেষ করে Childhood, Boyhood and Youth গল্পগুলো পড়লেই হয়ে যায় তার জীবনকে দেখা আর তার সাথে মিলিয়ে যদি গল্প উপন্যাসগুলো দেখা হয় তাহলে আমাদের কাছে এমন এক জীবন উঠে আসে যা অনুভবে অনুরণনে আপ্লুত, অনুভূতির স্নিগ্ধতায় উদ্বেলিত, চৈতন্যের সততায় অনুশোচনা য়, পাপ-পূণ্যের দ্বন্দ্বে চির আধুনিক এক মানুষের উপলব্ধি। যা মানুষকে ভাবায়, কাঁদায় আবার চৈতন্যে আলো জ্বালিয়ে দেয়। 
.
তার বর্ণাঢ্য সাহিত্যে উঠে এসেছে রাশিয়ার সামাজিক জীবন, তাদের মনোচৈতন্য ও উপলব্ধির এক হীরকময় বহুমাত্রিকতা- তা পুরো রাশিয়ার সমস্ত সাহিত্যচর্চায় আর হয়েছে কিনা সন্দেহ আছে। তাই ম্যাক্সিম গোর্কি বলেছিলেন, তার রচনা থেকে আমরা রাশিয়ান সমাজ জীবনের যে বিস্তৃত বিবরণ পাই, অবশিষ্ট সমগ্র রুশ সাহিত্য থেকে তার অর্ধেকও খুঁজে পাই না।’
.
প্রায় ৪ হাজার একর জমির মালিক হয়েও তিনি জারদের যাপনিক সংস্কৃতিতে বিশ্বাসী ছিলেন না। তাই রুশ বিপ্লবের নায়ক লেনিনকে স্বাগত জানাতে পেরেছিলেন, বিপ্লবকেও পুশেছিলেন হৃদয়ে। আর কর্ম ও তৎপরতায় তিনি তাদের মাঝে কাউন্ট নয় ঋষি হয়ে উঠেছিলেন। তার জীবনের উপান্তে এসে যখন সমস্ত জমিদারি, সমাজ সংসার ছেড়ে দিয়ে অখ্যাত রেল স্টেশনে ঢেড়া গেড়েছিলেন তখন তার গাউনের ভেতরে ছিলো উপমহাদেশের অনন্য শিল্পতাত্ত্বিক শাহেদ সরওয়ার্দী সংকলিত প্রফেটের হাদীস সংকলন। মহত্ব ছূঁয়েছিল মহৎ হৃদয়, মহত্তম শিল্পীর জীবন হয়ে ওঠে অনুভূতির তরঙ্গে ভাসমান ঊর্মীমুখর। 
.
লেভ তলস্তয় নিজেই বলেছিলেন, ‘শিল্প কী’ এ প্রশ্নটি তাকে ভাবিয়েছেআলোড়িত করেছে প্রায় পনেরটি বছর। তার সেই আলোড়নের অনুভূতিমালা তার শিল্প বিষয়ক প্রবন্ধগুলো। যা দু’টি পৃথক গ্রন্থাকারে রূপ পেয়েছিল। একটি তার বিখ্যাত On Art অন্যটি শিল্পতত্ত্বের আকড় গ্রন্থ What is Art। ১৮৯৮ সালে প্রকাশিত What is Art গ্রন্থটি লেভ তলস্তয়ের শিল্প চিন্তার পূর্ণ অবয়ব। বলা যায় এটি শিল্প বিষয়ক একটি অভিসন্দর্ভ। যার লেখক, তত্ত্বাবধায়ক, নির্দেশক একজনই। যিনি সর্বকালের জীবন ঘষে উপলব্ধি করা এক শিল্প তাত্ত্বিকÑ কাউন্ট লিও নিকলায়েভিচ্ তলস্তয় (১৮২৮-১৯১০), যিনি নোবেল পাননি, অথচ নোবেল পাওয়ার জন্য কি কি বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত হতে হয় একজন সাহিত্যিকের জীবন ও সাহিত্য তা দেখিয়ে গেছেন বিশ্ববিবেককে। 
.
প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য শিল্প চিন্তার এক সূক্ষ্ম পার্থক্য রয়েছে। প্রাচ্য জীবনের সমস্ত বিষয় প্রসঙ্গকে রসগত প্রেক্ষিত দেখে, বিশ্লেষণ করে। পাশ্চাত্য জীবনকে দেখে বস্তুতান্ত্রিক অবয়বে। আমরা রুহ দেখলে ওরা দেখে শরীর। তাই আমাদের ও তাদের সমস্ত চৈতন্যিক ভাবনায় এক ধরণের প্রান্তিকতা কাজ করে। জীবনকে যুথবদ্ধভাবে দেখার কোনো দৃষ্টিভঙ্গি তাই আমরা দাঁড় করাতে পারিনি। দৃষ্টির এ একরৈখিক চেতনা আমাদের কাছে সীমাবদ্ধ, খণ্ডিত এবং প্রান্তিক। শিল্প ও জীবন বিশ্লেষণে একমাত্র ‘লেভ তলস্তয়’কে পাওয়া যায় জীবনের সমগ্রতাকে ছুঁয়ে দেখার সাহস। শরীর ও চৈতন্যের সমস্ত অবয়ব কেঁটে খুঁড়ে বের করে শিল্পকে ছেঁকে নেয়া শুধু তলস্তয় করেছেন। তার ভাবনায় কাজ করেছে ঔচিত্যবোধ, জীবন বাস্তবতা ও স্বাভাবিকতা।  
.
পাশ্চাত্যের শিল্পতাত্ত্বিক অ্যারিস্টটল ও ক্রোচের ভাবনার সাথে যারা পরিচিত তারা আমার বিশ্লেষণের সাথে বিষয়টা মিলিয়ে নিতে পারেন। এবং শাহেদ সরওয়ার্দীর অল্প বিস্তর শিল্প ভাবনা ও অবনীন্দ্রনাথের শিল্পভাবনাকে যদি একটু চেখে নেন তাহলে পুরো মূল্যায়ন পষ্ট হয়ে উঠবে। 
.
লেভ তলস্তয় তার What is Art সন্দর্ভে যে দিকগুলোতে আলো ফেলেছেন তা হলো, শিল্প বিষয়ে শ্রম, সময়, নৈতিকতা, মতা, বিকৃতি, বোধগম্যতা, উপাদান, পরিকল্পনা, বিজ্ঞান ইত্যাদি বিষয়ের দিক থেকে ছেঁকে ছেঁকে বিশ্লেষণ। যাকে বলা হয় চারদিক থেকে আলো ফেলা। আলো ফেলে ফেলে চিন্তন রাজ্যে পষ্ট করেছিলেন আসলে শিল্প কী? সাথে এ পর্যন্ত শিল্প বিষয়ে যে রূপতাত্ত্বিক ও অবয়ব বা কাঠামোগত যে ধারণা কিংবা সৌন্দর্যগত ও প্রয়োজনগত যে মাত্রাকে অন্যান্য শিল্পতাত্ত্বিকরা ব্যাবচ্ছেদ করেছেন তা পুন: তুল্যমূল্যের মানদণ্ডে ব্যাবচ্ছেদ করেছেন তিনি। তলস্তয় চিন্তাকে উসকে দিয়ে উপলব্ধির দোর গোড়ায় ঠেলে দিয়েছেন পাঠককে। একক ভাবে সিদ্ধান্ত দেননি ‘শিল্প কী’। কিন্তু পাঠক পড়তে পড়তে বুঝে যায় লেভ তলস্তয় শিল্প বলতে বুঝিয়েছেন অনুভূতির সঞ্চালন, সম্মোহন বা স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় পাঠগত আচমন। লেখক-পাঠক-ঘটনা তখন এক বিন্দুতে দাঁড়িয়ে সর্বকালের অনুভূতি সঞ্চালনে হয়ে ওঠে এক জাতিস্মর প্রতিবিম্ব।

শিল্পের জগত: অমরত্বের সাথে পাতি খেলাঘর

শিল্পের জগত: অমরত্বের সাথে পাতি খেলাঘর 
ওয়াহিদ সুজন
.
শিল্প সম্পর্কে আমাদের বিবেচনা “কি”? অথবা “কি হওয়া উচিত?” প্রথমটি নিয়ে আপাতত সন্তুষ্ট হতে হবে, “'হয়'” (কি) না বুঝে “'“উচিত”'” এর প্রশ্নে কিভাবে যাওয়া যেতে পারে। শিল্পকে নিতান্ত জাগতিক বিষয় আকারে দেখা যেতে পারে, এই বিশ্বে দৈনন্দিন চাহিদার জায়গায় সে জ্ঞাতে হোক আর অজ্ঞাতে তার নিজের স্থান দখল করে নিয়েছে। কিন্তু কি আকারে? এইখানে কৌতুহল জাগায়। এর সাথে অপার্থিব ঘ্রাণ লেগে আছে বুঝি। দ্বিধা নিয়ে বলছি শিল্প বলতে এমন কিছু একটাকে বুঝছি, যা সচরাচর অন্যান্য বিদ্যমান সম্পর্কের ভেতর ভিন্ন ভিন্ন রূপে ধরা পড়ে কিন্তু তার মাঝে অন্যান্য ঘটনার সাথে জাহিরী বাতেনী দুই পার্থক্যই ঘটে। যা দেখার চোখে নয় অন্য চোখে ধরা পড়ে। অর্থাৎ আমরা দেখি, বুঝি তাদের অর্থে দ্ব্যর্থক ভাব প্রবল হয়ে উঠে। এই পার্থক্যগুলোকে আমরা সরলভাবেই, অনেকক্ষেত্রে না বুঝে অভ্যাসের কারণে ব্যবহার করি। শিল্প বিষয়টি এমন যে, সে দৈনন্দিন সাধারণ কিছু কিন্তু এর মানেটা অসাধারণ। তাই একে নির্ধারণ করতে গেলে এক ধরণের ভাষাগত এবঙ চিন্তাগত সংকট প্রকট হয়ে উঠে (একজন শিল্পী সচরাচর এই ধরণের ভাবনা মোকাবেলা করে কাজ শুরু করেন কি!)। অন্যভাবে, শিল্পকে তার ভাবের স্থান হতে বুঝতে হবে। শিল্পের বোঝাপড়া শিল্পের তুলনামূলক আলোচনায় কিছুটা সম্ভব। কিন্তু, এখানে ত্র“টি থাকে। যেহেতু এই দেখাটা ভেতরকার জিনিস তাই কোন বিবেচনাকে আমি সহী বলব তাও সমস্যা। তাই বলি, মন যা চায় তাই কর ... এই মনটা আসলে কোন মন? শিল্প তার ধরণ, চলন-বলন, অন্তর্গতভাবে কোন সত্যকে ব্যাখ্যা করে, উৎপাদন করে, তার বিকাশ এবঙ জগতে এর কি প্রতিরূপ দেখতে পায় তার সাথে গভীরভাবে শিল্পীর অন্তর্দৃষ্টিকে প্রতিফলিত করে, তা একজন শ্রোতা দর্শক বুঝতে পারুক আর নাই পারুক। তাই শিল্পীর অসীম স্বাধীনতার জায়গায় দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করি শিল্পীর মন কোন মন? সে কি খাওয়া পরার চিন্তা করে যে মন, তার চে’ আলাদা কিছু?
.
শিল্পের সংজ্ঞায়নে আমরা অপরাপর বিষয়ের মতো জটিলতায় আক্রান্ত হই। সংজ্ঞায়ন কোন কিছুকে চিহ্নিত করতে ঐ বিষয়ের অনন্য বৈশিষ্ট্য নিয়ে হাজির যেখানে ভেদজ্ঞান প্রবল কিন্তু সহসা সম্পর্কের সুত্রগুলো আবিষ্কার কঠিন হয়ে উঠে এবঙ শিল্পের ভেতরকার নানা বিপরীতমুখী চরিত্র তাও বুঝা কঠিন। যদি শিল্পকে বিষয়ীর অন্তর্দৃষ্টির দিকটি বিবেচনা করতে বলি, তবে তো ভাব বিনিময়ে যত অনুপত্তি আছে সকলেই এতে সামিল হয়, আবার শুধুমাত্র বিষয় বিবেচেনায় এতো বেশী যান্ত্রিক হয়ে উঠতে পারে এর গুঢ় রস বুঝা আপনার আমার দুঃসাধ্য। এখানে ভাব এবঙ বস্তু কোথায় সাধন সঙ্গী হয়ে উঠে, আমাকে হৃদয়ের সে ঘরে পৌঁছুতে হয়, যেখানে অহর্নিশ খেলা করে ভাব রসের পিরীতি। এখন টলস্টয় হতে বলি, “‍"শিল্প একটি মানবিক ক্রিয়া। শিল্প সৃষ্টির প্রক্রিয়া এরূপ কোন ব্যক্তি আপন হৃদয়ে উপলব্ধ অনুভূতিকে বাহ্য অভিজ্ঞানের সাহায্যে অপরের চিত্তে সঞ্চারিত করেন এবঙ অপরেও যখন অনুরূপ ভাবানুভূতি দ্বারা সংক্রমিত হন এবঙ আপন হৃদয়ে অনুরূপভাবে উপলব্ধি করেন, তখনি শিল্পের জন্ম"।” টলস্টয় তার শিল্প ভাবনা সহজভাবেই প্রকাশ করেছেন। কিন্তু সহজ আসলে জটিলতার নামান্তর। ব্যক্তিতে ব্যক্তিতে ভাবালাপে যে বিরোধ তা সহজে মুছে যাবার নয়। ভাব রসের যে পিরীতি তাতে নোঙর করা তত সহজ ঠেকে না। তাহলে কি করা যায়? আপাতত এই সমস্যাকে মোকাবেলা করতে নিজের ভেতর ডুব দিয়ে দেখি। 
.
শিল্পচেতনা স্বভাবগত। স্বতস্ফুর্ত, স্বজ্ঞাজাত এবঙ সৌন্দর্যময়। নন্দন, সৌন্দর্যের প্রতি ব্যক্তির প্রবণতা যান্ত্রিক নয়। সে তার কথা-বার্তা, হাঁটা-চলাসহ সকল কাজের ভেতর দিয়ে এই বোধের প্রকাশ করতে চায়। শুধু তাই নয় সে তার শিল্পবোধের অন্বেষণও করে। জগতের সাথে তার যে বোঝাপড়া সেখানেও সে যে কোন প্রাকৃতিক বিষয়ের শিল্পরূপ খুঁজতে ব্যাকুল। শিল্পের প্রতি এক ধরণের অনিবার্যতা আরোপিত হয়, কিন্তু একে বুঝার যে কাতরতা তা সবার মধ্যে সচেতন থাকে না। আমরা মানবিক বাসনার দিকে চোখ ফেরাতে পারি, মানুষ নিজেকে প্রকাশ করতে চায়। তা অবশ্যই নানা ধরণের প্রয়োজনকে চিহ্নিত করে। বার্ট্রান্ড রাসেল যখন মহাজাগতিক নিঃসঙ্গতার (কেন মানুষ চিন্তা করে?) কথা বলেন, অজান্তে মন সায় দেয়। মহাজাগতিক নিঃসঙ্গতাবোধ মানুষকে শুধু চক্ষু কর্ণের দেখা শোনায় স্বস্তি দেয় না। আমাদের দেখার জগত সাজাতে অদেখা উপলব্ধির নানা ভূমিকা আছে। সে কারণে আমরা আমাদের অন্যান্য বোধের সাথে শিল্পবোধকে এক করে দেখি না। অর্থাৎ, এই প্রয়োজনটা আকারে প্রকারে ভাবে আলাদা সত্ত্বা হয়ে উঠে। ঘটনা যাই হোক, নিজেকে প্রকাশের পেছনে অন্যকে নিজের অনুভূতির সাথে সমভাবাপন্ন করার ঘটনা কাজ করে। (কেউ কেউ বলেন, তারা যাই করেন নিজের আনন্দের জন্যই করেন, অবশ্যই নিজের জন্য। কিন্তু এই কথাকে চূড়ান্ত বলে প্রচার এক ধরণের হাস্যরসের সৃষ্টি করে।) সে কাজ সহজ বা দুরূহ হোক না কেন, আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ এর ব্যাঞ্জনার দিকটি। একজন ব্যক্তিকে আমি আমার দৈনন্দিন ক্রিয়ার বর্ণনা দিতে পারি। বিষয় বা প্রকরণে বা তথ্য আকারে সে তার কাছে নিতান্ত স্বাভাবিক বা নতুন কোন অর্থ বা অনুভূতি তৈরীতে ব্যর্থ হতে পারে, এমনকি আমার এমন কোন অভিপ্রায় নাও থাকতে পারে। কিন্তু আমার বর্ণনাদানের ভঙ্গিমায় এমন কিছু থাকতে পারে যা শিল্প পদবাচ্য হতে পারে। এমন কি তা দৈনন্দিন জীবনের কোন গুঢ় অনুভূতি বহন করতে পারে। এখানে বিষয়ের 'চে’ ভাব প্রধান। শিল্পের ব্যাপকতর পটভূমিকায় আমি সংক্রান্ত উদাহরণটি দেয়ার সাহস করা গেলো। তাছাড়া, আজকাল রন্ধনকে শিল্প বলা হয় এবঙ এবার চিন্তা করুন সেটা কোন পর্যায়ে। কিন্তু শিল্পের সাথে সাধারণ দৈনন্দিন ঘটনা বর্ণনার ব্যাপকতর পার্থক্য আছে। তাই টলস্টয়ের সংজ্ঞার মানেটা সহজ নয়।
.
একজনের দুঃখ কষ্ট আনন্দ বেদনা বাস্তবিকই অন্যের ভেতর একই ধরণের অনুভূতি জাগ্রত করতে পারে। এতে বিচ্ছিন্নতা সূত্রহীনতা থাকতে পারে এবঙ এর সাথে আপনি অন্যদের বোধগুলো একই সাথে অনুভব নাও করতে পারেন। কেনই বা করবেন। এটা হলো মর্মের জায়গা। শিল্প সেই স্থানকে জাগ্রত করে। একজন শিল্পী তার অনুভূতির মর্মে গিয়ে তার বিষয়কে দেখেন, এবঙ এমনভাবে দেখেন বিষয়ের সাথে একাত্ম হয়ে, উপস্থাপন করেন এবঙ উপস্থাপনের সাথে অন্যের সাড়া আশা করেন। এটা কাল্পনিক কোন বিষয় হতে পারে। কিন্তু শিল্পের বাস্তবতা হলো প্রকৃতির মতো অস্তিত্ব তৈরী, অর্থদান করা, তাই এর আলাদা বাস্তবতা এবঙ বাস্তববোধ আছে। যেমন- বিমূর্ত শিল্পকলা এই বাস্তব জগতের বিষয়, এর রঙ রূপ রেখার ভেতর দিয়ে একজন শিল্পী যে ভাষা তৈরী করুন না কেন, একজন দর্শক যখন তা দেখেন তখন তিনি মনে করেন তিনি শিল্পীর অনুভূতি, অনুভূতির বাস্তব অবস্থার কাছাকাছি পৌঁছেছেন। অথবা প্রতীকীকরণের মধ্য দিয়ে নিজের ভাবকে মূর্ত করা, প্রতীকের নিজস্ব ধরণ হলো, একের ভেতর ব্যাপকতর অর্থ ধারণ করা। জগত বাস্তবতার শর্তের ভেতর দিয়ে দেখা নয় বরঙ নতুন বাস্তব অস্তিত্ব তৈরীর ভেতরও এর সত্যতা প্রতিষ্ঠা করে। এখন একজন কোন বাস্তবতা তৈরী করতে চান বা দেখাতে চান তা হলো কথা। এই কারণে শিল্পকে সবসময় শুভ বিবেচনা চলে না, এর ভেতর মারাত্মক স্খলনের বীজ লুকিয়ে থাকতে পারে। সে যাই হোক, বিমূর্ততার সাথে সাথে কবিতা নাটক চিত্রকলায় আমরা আমাদের জীবনের চিত্রকে দেখার কৌতুহল পোষণ করি। তা কি হুবহু এই যাপিত জীবনটাই। না, এটা এই জীবনটাকে যাপনের স্থান হতে এক কদম এগিয়ে অংকন করে। শিল্পী তার শিল্পকর্মে সর্বদর্শীর(!) ভূমিকা পালন করতে চান। এতে কাজ করে পরিমার্জন মূল্যায়ন নির্মাণের ধারণা। এবঙ শিল্পের ইতিহাস মানবের ভাব আদান প্রদানের ইতিহাসের সাথে সমান তালে এগিয়েছে। গুহাচারী মানুষ বৈরী পরিবেশ মোকাবেলা করে দলগতভাবে পশু শিকারে বেরিয়েছে, আবার তার অতীত ও ভবিষ্যতকে সমান তালে গুহার দেয়ালে অংকন করে গেছে। অর্থাৎ মানুষ বৈরী দুনিয়ায় তার ইচ্ছে পূরণের নানা মতা লাভ করেছে। মানুষের আশা আকাঙ্খা যে সত্যকে জয় করতে চায়, শিল্পরূপেই সে জয়ের সূচনা ঘটে। 
.
এখানে স্পষ্টভাবে ধর্মের প্রসঙ্গ আসে। ধর্ম আর শিল্প, এমন কি স্পষ্টভাবে ধর্ম আর শিল্প-সংস্কৃতি একই জিনিস নয়। কিন্তু এদের মধ্যে এক ধরণের সম্পর্ক আছে। শিল্পচেতনা নেই এমন ধর্ম পাওয়া যায় না। ধর্মের যে সত্য দাবী তার সাথে শিল্প সত্যের মিল হলো সত্য চূড়ান্ত আকারে এক, তা স্বীকার করা হোক বা না হোক। আমরা দেখি গ্রীক নাট্যকলা অথবা ভারতীয় নৃত্য অথবা শাস্ত্রীয় সংগীত, বিভিন্ন ধর্মীয় আচরণের উৎস শিল্পজাত এবঙ এদের বিকাশ ধর্মীয় আর্তি ও নিবেদনের মধ্য দিয়ে ঘটেছে। অন্যভাবে বললে, জ্ঞাত বিশ্বের শিল্পের প্রধানতম উৎস হলো ধর্ম। অর্থাৎ “ধর্মের সাথে শিল্পের সখ্য তার আবির্ভাবকালে”। শিল্পের যে অস্পষ্টতা ও নিরেট রহস্য, ব্যক্তিতে ব্যক্তিতে তার বিকাশ ঘটে ধর্মের চেয়ে আলাদা, কিন্তু ধর্মীয় প্রণোদনাহীন নয়। ধর্ম সিদ্ধান্তমূলক এরপর বিচার বিবেচনার প্রশ্ন এখানে প্রায় নির্ধারিত, যদিও বিচার বিবেচনার প্রশ্নে সত্যকে খোঁজা ধর্মীয় দায়িত্ব বটে। আমরা ধর্মের প্রচলিত রূপের কথাই বলছি। শিল্পের যে বিকাশ তাতে ব্যক্তি সিদ্ধান্ত আকারে একে গ্রহণ করে না এবঙ শিল্প জগতে মূর্ত আকারের চেয়ে বিমূর্ততাই বেশী, শিল্প নির্ধারিত হয় ব্যক্তির স্বাধীনতা, স্বকীয়তা, সময়কাল এবঙ জ্ঞানগত উপলব্ধি হতে, ব্যক্তিকেই কুশলীর ভূমিকা নিতে হয় এবঙ শিল্পী তার শর্তযুক্ত ও ক্ষণস্থায়ী অস্তিত্ব নিয়ে সচেতন থাকে। এ সকল স্পেস ধর্মে আছে কিন্তু যে টেক্সট দ্বারা ধর্মীয় জীবন চালিত হয় তাতে ধর্ম দ্বারা শিল্পকে ব্যাখ্যা করতে হয়। ধর্মের জাহিরী অংশে এই ধরণের সুযোগ পাওয়া কঠিন (কিন্তু এটা এমন বিষয় যেখানে সীমিত স্বাধীনতার ভেতরে শিল্পী তার কুশলতার ধারণাতীত ব্যাপ্তি ঘটাতে পারে), তাকে আবশ্যকীয় সাধারণ নিয়মের মধ্য দিয়ে এগুতে হয়, তাই বাতিনী অংশে সৃজনশীলতা, শিল্পের নানা সুযোগ থাকে। “শিল্প আমাদের যা বলে এবঙ যেভাবে বলে তা ধর্মীয় বাণীর মতই অবিশ্বাস-অনিন্দ্য মনে হয়”। এবঙ “শিল্প মানেই সৌন্দর্য সৃষ্টি নয়... সত্য অনুসন্ধানের পথে এক বিপ্লব”। কিন্তু এতে নানা ধরণের ফাঁদ বিদ্যমান। একজন চাইলে তার সদ্ আকাঙ্খা এবঙ স্রষ্টার প্রতি বিশ্বাস হতে যে কোন কর্মকে প্রার্থনায় রূপান্তরিত করতে পারে। বিষয়কে শিল্পী কিভাবে নেবে এটা তার ব্যাপার। আগেই বলা হয়েছে, শিল্পের চরিত্রে নানা বিপরীতমুখী প্রবণতা বিদ্যমান, ফলতঃ এটা শিল্পীর একার দায়িত্ব। দায়িত্ব হিসেবে কঠোর এবঙ কঠিন। তাছাড়া কোন নির্দিষ্ট ধর্ম যেহেতু সার্বজনীন আকার লাভ করে না, তাই এই আলোচনা আলাদা বটে। মোটা দাগে শুভ-অশুভ, সত্য-মিথ্যা, নৈতিকতার স্থান হতে শিল্পে ধর্মের ছায়া অনস্বীকার্য। আর শিল্প সম্পর্কে আমাদের বিবেচনা এটা স্বভাবগত মানবিক ক্রিয়া । 
.
শিল্পের অনুসন্ধানের বিবেচনায় নিজেকে সামনের দিকে এগিয়ে নেয়া। আমাদের যাপিত জীবন নানা মোড়কে ঢাকা। সে মোড়ক উন্মোচনে শিল্প এগিয়ে আসে। শিল্পে সে গন্তব্য বিন্দু অনুসন্ধান করে। এক বাস্তবতা হতে অপর বাস্তবতায় পাড়ি দেবার আকাঙ্খা পোষণ করে। সে বাস্তবতা আমারই। বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসবে নানা প্রতীকায়নের ভেতর দিয়ে তীব্রভাবে ধারণ করে অপর বাস্তবতায় মুখোমুখি হবার ঘটনা। সে সংগীতে নৃত্যে আরাধ্যের কাছাকাছি পৌঁছে নিজেকে বিলীন করে দেয় তার জন্য নির্ধারিত স্বর্গরাজ্যে। গুহাবাসী মানুষ শিকার যাত্রার পূর্বে অংকিত ছবিতে তার গোত্রীয় জীবন, অবাধ্য পশু এবঙ সফল শিকারকে বর্ণনা করে। সেখানে যে শক্তিমত্তা সবলতাকে উপাসনা করে, তা অপর বাস্তবতাকে সম্ভব করে তোলার শক্তিশালী হাতিয়ার। শুধুমাত্র নান্দনিকতা সৌন্দর্য দিয়ে শিল্পকে বিচার করলেও একই ধরণের ভাবের উদয় হয়। এটি নিয়তির এক নিরাবেগ বিচরণ যেন। পপাত বলছি না এ কারণে, আমাদের নিয়তির সত্যরূপ হলো নির্মোহ নিরাবেগ এবঙ নিরপে। ধারণাটি অধিবিদ্যক হলেও সত্য বলতে এর চেয়ে সহজ কিছু হয় না। তাই দ্ব্যর্থক শিল্প নানা জাতের নিমোর্হতাকে প্রশ্রয় দেয়। এবঙ সে সংশয়ী, প্রশ্নমূলক, পরীণের ভেতর দিয়ে অগ্রসর হয় এবঙ ফলতঃ পরিবর্তনশীল। এক অফুরন্ত পথ বেয়ে হাঁটে, শিল্পের সম্ভাবনা প্রায় অমরত্বের কাছাকাছি। তাকে একের পর এক পথ পাড়ি দিয়ে চলতে হয়। সন্তুষ্ট হতে না পারার মধ্য দিয়েই নির্মিত হয় মহৎ শিল্পকর্মগুলো। অনুভূতির সর্বোচ্চ প্রকাশেই সে অহর্নিশ আরোহণ করে কিন্তু প্রতিটি মুহুর্ত একদম আলাদা। পরমের কোন শ্রেণী বিন্যাস নাই, কিন্তু তাকে পাওয়ার পথ নানা ধাপে বিভক্ত। এই প্রসঙ্গে “সী মোরগ” (ফরিদ-উদ-দীন আত্তার: মানতিকুত্ তুয়ুর) গল্পটি উদাহরণ হিসেবে অনন্য। কথাগুলো পুনরাবৃত্তি হলেও বলতে হয়, শিল্পের সত্য অনুসন্ধান নিজেকে বুঝার, নিজেকে বুঝতে গিয়ে অপরকে বুঝতে পারারই ঘটনা। বাউলদের মতোই বলি, “যা নাই ভাণ্ডে, তা নাই ব্রক্ষ্মাণ্ডে”। এক মানবের যাত্রা হয়ে উঠে বিশ্বমানবের পথ চলা।  
.
শিল্পকলা অনুভূতির বাহক এবঙ তার বাহ্যিক সাফল্য হলো শিল্পী তার অনুভূতি অন্যের ভেতর সংক্রামিত করতে পারেন। এই অর্থে একটি শিল্পকর্ম একজন ব্যক্তি শিল্পীকেই হাজির করে, যে কিছু করে দেখায় তার মনন স্বাধীনতা স্বাজ্ঞিক উপলব্ধি কিভাবে বিশ্ব মননকে ধারণ করে। কেউ কেউ বলেন, শিল্পীর অনুভূতিটাই আসল। শিল্পকর্মটুকু উপজাত মাত্র। মানুষ ধর মানুষ ভজ শোন বলিরে পাগল মন। সে তার বিষয়কে কিভাবে তার আত্মার মধ্যে স্থাপন করে, কি খুঁজে পায়, কোন গন্তব্যে গেল কর্মটুকু তারই হদিস দেয় মাত্র, বাকীটুকু পড়ে থাকে তার আত্নায়। তাহলে শিল্প সমালোচনা শুধুমাত্র কর্মটুকু নিয়ে, বাকীটাতে তার বিশ্বাস নৈতিকতা ইত্যাদি ঘুরে ফিরে আসে। মহৎ শিল্প মাত্রই মহৎ শিল্পীর পশ্চাতাবলম্বন করে। নীৎসে যেমন বলেন, “শেষ খৃষ্টান শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন ক্রুশবিদ্ধ হয়ে”। শিল্পীর সাথে তার শিল্প সম্পর্ক এমনই। ধর্ম চলে গেলে ধর্মতত্ত্ব নিয়ে মারামারি কাটাকাটি ব্যাপকই হয়।  
.
মানুষের সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম বোধ, সরল অনুভূতিগুলো শিল্পে প্রাণ লাভ করে। তার যাত্রা সত্যমুখী হয়ে উঠলে যে ভেদগুলোর কারণে মানুষ সত্যবস্তু লাভ করে না, তার হদিস দেয়। এর ভেতর দিয়ে মানুষের ভেতরকার শুভ-অশুভের দ্বন্দ্ব জাগ্রত হয়। সবকিছুতে ব্যতিক্রম আর বৈপরীত্য আছে বৈকি। মানবজীবনে সত্য শিব মঙ্গলের ছায়া যেখানে আছে মানুষ তাকেই মনে রাখে- সেবা করে। শিল্প শুভশক্তির সাথে অশুভের ফেরি করে বেড়ায়। জাগতিক বেদনা, হতাশা, উত্তরণহীন মনন, পীড়নকারী অতীত, বাজারমুখীতা, নিজেকে জাহির করার প্রবণতা জীবনের চারিপাশে অশুভের বিস্তারকে প্রধান করে দেখায়। শিল্প খুঁজে চলে অমরত্বের নির্ঝরিণী, তখন সে বোধ লোপ পায়। “নষ্টদের দলে” যাওয়াই নিয়তি হয়ে উঠে। শিল্পকে কলুষিত করে বিবেককে কলুষিত করে। কেনই বা শেষ খৃষ্টান ক্রুশবিদ্ধ হয়? শিল্প ধর্ম নয় কিন্তু ধর্মের মতো নিজেকে কায়াহীন করে তোলার নামান্তর। আবার একই সাথে সে সামাজিক রাজনৈতিক ধার্মিক হয়ে উঠার বাহন। কিন্তু সে এইসবের দিব্যি দেয় না। কারণ কালের বেদনা ধারণ করতে সে তৎপর। সে যেমন সৌন্দর্যের দেখা/অদেখা রূপ অনুসন্ধান করে, তেমনি কষ্ট, লাঞ্ছনা, নিগ্রহণের ভেতর দিয়ে সে শান্তির পথ অন্বেষণ করে। আমরা ভয়াবহ যুদ্ধ দেখি দুর্ভি দেখি আবার দেখি শেষ পর্যন্ত কিভাবে মানুষ টিকে থাকে। হেমিংওয়ের ভাষায়, “মানুষ মরে কিন্তু পরাজিত হয় না”। এই জয়ী হবার বাসনা শিল্পীর নানা সৃষ্টিতে মূর্ত হয় প্রথমে। জয়নুলের দুর্ভি চিত্র, পাবলো পিকাসোর গোয়ার্নিকা, জহির রায়হানের জীবন থেকে নেয়া অথবা দ্য ওল্ড ম্যান এন্ড দ্য সী’র কেন্দ্রীয় চরিত্র বৃদ্ধ জেলে সান্তিয়াগো। সান্তিয়াগো ৮১ দিনের মাথায় বিশাল মার্লিন মাছ শিকার করে। কিন্তু হাঙ্গরের আক্রমণে শেষ পর্যন্ত মাছের কঙ্কাল নিয়ে তীরে ফেরে। তারপর... জীবন থেমে থাকে না, সান্তিয়াগো এর ভেতর দিয়ে সে বুঝে জাগতিক/অধিজাগতিক সম্পর্ক কি, কিভাবে হয়, কিভাবে প্রেরণা দেয় এবঙ কেনই বা সে হতাশ হবে না। শিল্প বুঝিয়ে দেয় এই দুঃখ কষ্ট হতাশার আড়ালে কিভাবে লুকিয়ে আছে জাগতিক অসারতার বীজ, কিভাবে পাল্টে দিতে হয় বাস্তবতার অসার ধারণা। 
.
শিল্পী হয়ে উঠা মানে সম্পর্কের ডালপালা তৈরী করা। এই সম্পর্ক ব্যক্তি জাতি গোষ্ঠি ব্রক্ষ্মাণ্ড সমগ্র প্রকৃতির অলিগলিতে নিজেকে খোঁজা। শিল্পে পরম খোঁজা মানে এই সব সম্পর্কের ভেতর আত্ম-অনুসন্ধান করা। জাগতিক নানা বাধা, ভেদ চিহ্নিত করে চলে সৃজনী বিবর্তন। সে শর্তহীনতার কাছাকাছি পৌঁছে কিন্তু প্রকাশ করে শর্তাধীন জগতে। শিল্পের বাস্তবতাবোধ যুক্তি দিয়ে নির্মিত কিনা তা যেমন রহস্যময় তেমনি শিল্পকর্ম দুর্বল হওয়া বা তাতে ব্যর্থতার চিহ্ন পড়া রহস্যময় বিষয়। যেহেতু অপরের খাঁটি অনুভূতিতে পৌঁছা দুর্লভ তাই শিল্পীর অমতার ধারণা কঠিন যুক্তিতে অংকিত বিষয়। যে শিল্পকর্মকে আমরা অশুভ চেতনায় ভরপুর বলি তা কিন্তু কোন একটা কালের প্রতিবিম্ব। অর্থাৎ শিল্পের ব্যর্থতার জায়গায় সামষ্টিক প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের দায় এড়াতে পারে না। পারস্পরিক সম্পর্ক নির্ধারণে কর্তৃত্বের ভূমিকাকে কখনো খাটো করে দেখা যাবে না। যেহেতু শিল্পী পয়গম্বর নন, তাই তার ভেতরকার বৈপ্লবিক আকাক্সা সামাজিক সাড়ার অভাবে ব্যর্থ হতে পারে। সে মানুষের চাওয়াকে তুলিতে কালিতে বুলিতে ফুটিয়ে তুলতে পারে কিন্তু জনমানসকে এক করে তোলার দায়িত্ব তার নয় অথবা তার দ্বারা সম্ভবপর নাও হতে পারে। এর ফলে নীৎসের মহামানবের রূপ অবয়ের কালে কেমন হবে, তা আগাম বলে দেয়া কঠিন। তাছাড়া প্রায়শঃ শুধুমাত্র ফর্ম নির্ভরতা, নন্দন নির্ভরতা শিল্পের অভিজ্ঞানকে নষ্ট করে দেয়। যে সমাজে শিল্পের বিকাশ ঘটে আভিজাত্যের আড়ম্বরে তার 'চে’ বর্বরতা কিছুই হয় না। তা মনুষ্যত্বের বিকাশকেই গলা টিপে মারে। তখন সমাজ বদল, আত্মিক পরিশুদ্ধির স্থানে চিত্ত কলুষতার সংক্রামক ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়। সে ব্যাধি ছড়িয়ে পড়ে তথাকথিত নিচুতলার মানুষের আধ্যাত্মিক শিল্পচেতনায়ও। তখন ছৈউরিয়া আর মথুরা একাকার হয়ে পড়ে বারে আর ডিসকোতে। শিল্প ভোগ নয় বেদনার প্রসব। এর মাঝে আছে মানুষের শুদ্ধতম অনুভূতি দুঃখ। আর তাকে বাদ দিলে শিল্পকলা হয়ে পড়ে কূলহারা কলংকিনী
.
যে “'হয়”' এবঙ “'ঔচিত্য”' এর হদিস করতে গিয়ে এই লেখার সূত্রপাত এবার সেখানে ফিরে আসি। প্রথমটি (শিল্প!) সম্পর্কে যথেষ্ট বলা হয়েছে। বাকী থাকে শিল্পের রূপ এবঙ প্রয়োগরীতি কেমন হওয়া উচিত। আমরা “হয়” আলোচনার ভেতর সেই পথে অনেকটা হেঁটেছি। “হয়” এর যাত্রা যেখানে শেষ সেখানে শুরুর সাথে ব্যাপক গুণগত পরিবর্তন ঘটে। তারপরও কিছু কথা থাকে। ঔচিত্য অনৌচিত্যের ধারণা গুরুত্বপূর্ণ এই কারণে যে, এই বোধ আমরা আমাদের বেঁচে থাকা স্বার্থক (?) করতে তুলতে এক ধরণের নিয়মতান্ত্রিক আশ্রয় দিয়ে থাকে। আমাদের সামাজিক জীবন ঔচিত্য নির্ভর ফর্মুলা দ্বারা চলার বাসনা পোষণ করে। সামাজিক স্থিতিশীলতায় এর কার্যকর ফলাফল আছে। সুতরাঙ, নানা ক্ষেত্রে ঔচিত্য অনৌচিত্যের সিদ্ধান্তমূলক ধারণায় উপনীত হওয়ার ফলদায়ক যৌক্তিকতা এবঙ এর অভিজ্ঞতা আমাদের আছে। কিন্তু জীবনের বৈশিষ্ট্যসূচক সৃজনশীল মৌল প্রকরণগুলো বিবেচনায় এই ঔচিত্যবোধ কখনো কখনো ফ্যান্টাসীতে পরিণত করে। আত্মার খোরাক না হয়ে উঠলে ধর্মগ্রন্থ চিরকাল জীর্ণ তক্তাতে পড়ে থাকে, সেখানে ঔচিত্যবোধ কোন ফলাফল বয়ে আনে না। শিল্প কেমন হবে এই বিবেচনাও এক ধরণের ফ্যান্টাসীতে পরিণত হয়। শিল্পকর্মে শিল্পী তার আত্ম-অনুশীলনের ভিতর দিয়ে প্রাপ্ত অভিজ্ঞানের বর্হিপ্রকাশ ঘটায়। তাই এর প্রয়োগরীতি কেমন হবে তাকে আগাম ধরে দেয়া কঠিন। যখন এই কাজ (যা সহসা স্বাস্থ্যবটিকার মতো কিছু বলে ভ্রম হতে পারে! ) করা হয়, তা হতে পারে ভুল পদপে। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন জনের স্বীকারোক্তি হতে এই ধারণা হয় যে, শিল্পী মাত্রই দায় অনুভব করেন। যদি এই বোধ সহী হয় আমাদের আপত্তির (আমরা বলি যে, সবসময়ই তাদের জন্য নানা ছাড় দিতে প্রস্তুত আছি! ) কিছু নাই। আর যারা শঠতাকে (!) সত্যজ্ঞান করেন তাদের জন্য বলার কি থাকতে পারে! সচেতন থাকা এবঙ অপরকে করা সকল ব্যক্তির নৈতিক ও সামাজিক দায়িত্ব বলে মনে করা হয়ে থাকে। এবঙ সময়ে সময়ে এই সমাজ ও নৈতিকতার অবশ্যম্ভাবী রূপান্তর ঘটেছে । যা আগে বলা হয়েছে তা আবার বলা যায়, মানুষের আশা আকাঙ্খা যে সত্যকে জয় করতে চায়, শিল্পরূপেই সে জয়ের সূচনা ঘটে।
.
সহায়ক সূত্র: 
১. লিও টলস্টয়, অনুবাদ: দ্বিজেন্দ্রলাল নাথ, শিল্পের স্বরূপ, পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য পুস্তক পর্ষৎ, কলকাতা, ২০০২। 
২. আলীয়া আলী ইজতবেগবিচ, অনুবাদ: ইফতেখার ইকবাল, প্রাচ্য পাশ্চাত্য ইসলাম, জলঘড়ি একটি জ্ঞানবৃত্তিক উদ্যোগ, চট্টগ্রাম, ২০০২। 
৩. সৈয়দ আহমদ শামীম, শিল্পের মনোভঙ্গি, সূত্রপাঠ ১ম বর্ষ, ২য় সংখ্যা, ৩১ আগস্ট ২০০৬, চট্টগ্রাম। 
৪. আহমদ রফিক, বুদ্ধিজীবীর সংস্কৃতি, মুক্তধারা, ঢাকা, ১৯৮৬। 
৫. ওয়াহিদ সুজন, সংগীত অথবা অকূল সমুদ্দুরে অবগাহন, লোকযাত্রা ১ম বর্ষ, ১ম সংখ্যা, জুন ২০০৯, চট্টগ্রাম। 
৬. কাজী দীশু, ব্যারচ দ্যা স্পিনোজা, জনান্তিক, ঢাকা, ২০০৭।

শিল্পের চৈতন্যে ‘আমি’ কৈ

শিল্পের চৈতন্যে ‘আমি’ কৈ
মাসউদুর রহমান 
.
আদমী সে চেনে আদম  
পশু কি তার জানে মরম 
লালন কয় আদ্য ধরম 
আদম চিনলে হয়।  
আপন ছুরাতে আদম গঠলেন দয়াময়...  
-ফকীর লালন সাঁই 
.
ব্যক্তির জন্য কোনটি গুরুত্বপূর্ণ, শিল্পচর্চা না শিল্পচেতনা? স্থান-কালের নিরিখে বাস্তবতা এই শিল্পচর্চা সবার দ্বারা হয়ে উঠে না। কিন্তু মানুষ চাইলেই তার ভেতরে শিল্পের চেতনাকে লালন করতে পারে, যা তাকে সবার মাঝে অনন্যরূপে পরিচালিত করতে পারে। এই শিল্পচেতনা তাহলে কিভাবে সম্ভব?
.
চারপাশের প্রকৃতিকে দেখার, অন্যভাবে, তার দিকে তাকাবার একটা সার্বজনীন দৃষ্টিভঙ্গি সৃষ্টিকর্তা দেখিয়ে দিয়েছেন। তিনি বলেন, হও, হয়ে যায়। আসলে কি তিনি বলেন? তাঁর তো বলার প্রয়োজন হয় না। তাহলে বোধহয় তিনি ভাবেন। কিন্তু তাঁর তো ভাবারও প্রয়োজন হয় না। বলা, ভাবা এসব তো মানবিক কাজ। তাহলে তিনি কী করেন? মন বলে, তিনি শিল্প করেন। তাঁর শিল্প করাটাই আমাদের বলা-ভাবা-দেখার মতো। তবে এই বলা-ভাবা-দেখা যেন তেন নয়, বিশেষভাবে বলা-ভাবা-দেখা। এরই মধ্যে রয়েছে প্রকৃতিকে দেখবার সার্বজনীন দৃষ্টিভঙ্গী। কিন্তু বিশেষ কোন কিছুকে কেন সার্বজনীন বলি?  
.
সার্বজনীনতার বাইরে প্রকৃতিকে দেখবার আরেকটি দৃষ্টিভঙ্গি আছে- ব্যক্তিক দৃষ্টিতে দেখা। এই দৃষ্টিভঙ্গি স্থান-কাল-ঘটনা-প্রেক্ষিতের প্রভাবদুষ্ট হয়। তখন যা দেখে, ‘আমি’ তার নিজের জন্য, নিজের প্রয়োজনে দেখে। প্রকৃতিকে উপযোগ মনে হয়, মনে হয় উৎপাদনের আধার। প্রকৃতি তখন শুধু ব্যক্তির প্রয়োজন পূরণ করার জন্য। ব্যক্তির যেভাবে প্রয়োজন প্রকৃতি সেভাবেই তার চোখে ধরা দেয় অথবা তাকে ধরা দিতে হয়। এই দৃষ্টিভঙ্গি প্রকৃতিকে বিকৃতি এবং ধ্বংসের ঢালু রাস্তায় নামিয়ে দেয়। প্রকৃতি আর প্রকৃতি থাকে না ব্যক্তির ইচ্ছার কাছে বিলীন হয়। .
সাধারণত সবাই প্রকৃতিকে এভাবেই দেখে বা দেখতে চায়। যেহেতু ব্যক্তিসত্ত্বা পরষ্পর স্বতন্ত্র সেহেতু এই দৃষ্টিভঙ্গিতেও কোন সার্বজনীনতা নেই - যে যার মতো প্রকৃতিকে ছিঁড়ে-কুঁড়ে খায়। তাই এই দেখার ধরণ আপাত এক মনে হলেও ল্য এবং ফলাফলে সম্পূর্ণ ভিন্ন। 
.
প্রকৃতিকে দেখার যে ভিন্ন আরেকটি দৃষ্টি সেটা হলো নৈর্র্ব্যক্তিক দৃষ্টিতে দেখা। সৃষ্টিকর্তার দৃষ্টিতে দেখা। একটা শূন্য স্থান আসলে কেমন থাকা উচিৎ এরকম দৃষ্টিভঙ্গির বেলায়, যিনি দেখবেন, তার দেখায় তার কোন ব্যক্তিগত প্রয়োজন কাজ করবে না। ব্যাপারটাকে একটা উদাহরণ দিয়ে দেখানো যায়- এক পৃষ্ঠা সাদা কাগজ, একজন ছাত্র তাতে গরু নিয়ে একখানি রচনা লিখবে আর একজন কবি সেখানে স্বদেশ নিয়ে একটা কবিতা লিখবেন। ঐ সাদা কাগজটা হলো প্রকৃতি। সৃষ্টিকর্তার প্রকৃতির কাছে কোন প্রয়োজন নেই, তাই তিনি তাকে (প্রকৃতিকে) যেভাবে খুশি দৃষ্টি দিয়ে সাজাবেন। এটাই হলো নৈর্ব্যক্তিক দৃষ্টি অর্থাৎ প্রকৃতিকে প্রকৃতির দৃষ্টিতে দেখা। কিসে প্রকৃতির ভাল তাতে ব্যক্তির নজর থাকবে। অন্যভাবে, এটাই শিল্পের দৃষ্টি বা শিল্পচেতনা। যেহেতু তা নৈর্ব্যক্তিক তাই তার প্রভাবিত বা মেরুকৃত হওয়ার সুযোগ থাকে না। প্রকৃতি এখানে উপযোগ হিসেবে উপস্থিত না, বরং কৃষিকাজের উপযুক্ত উর্বর একটি শূন্য ক্ষেত্রে, সৃজনশীলতার বিচিত্র আধার। ব্যক্তির দৃষ্টি তখন কেবল প্রকৃতির প্রয়োজন পূরণ করে, প্রকৃতির সৌন্দর্য্য খুঁজে বেড়ায়, নূতন নূতন সৌন্দর্য্য আবিষ্কার করে। সে যেখানেই দৃষ্টিপাত করে সেখানে শুধুই সৃষ্টি হয়, যেমন- সৃষ্টিকর্তা বলেন, হও, হয়ে যায়। এই দৃষ্টি শুধু প্রকৃতিকেই না, সাথে ব্যক্তিকেও সুকৃতি এবং সৃষ্টির বৈচিত্রময়তার চূড়ায় তুলে নেয়। ব্যক্তি-প্রকৃতি পরস্পরে বিলীন হয়ে নূতন এক রাস্তা ধরে। এ জন্যই এ দৃষ্টি ‘বিশেষ’ হয়। এই বিশেষ দৃষ্টি সার্বজনীন কেননা ব্যক্তি চাইলেই তার ভেতরে এই দৃষ্টিচেতনার বিকাশ ঘটাতে পারে। দৃষ্টির এই চেতনার বিকাশকেই শিল্পচেতনার বিকাশ বলতে পারি। শিল্প যদি সার্বজনীন হয়, ব্যক্তি বিশেষে জাত সকল চেতনা পূঞ্জীভূত হয়ে নির্বিশেষ শিল্প জন্ম দিতে সম (এখানে নির্বিশেষ মানে যা বিশেষ নয়, সার্বজনীন)। কারণ শিল্পের প্রভাবিতকরণ এবং সংক্রমণ মতা আছে। তাছাড়া চেতনা বিশেষ হলেও তাদের ল্য এবং ফলাফল অভিন্ন হতে পারে।  
.
শিল্প এমন একটি বস্তু যা একই অনুভূতির মাধ্যমে মানুষকে একত্রে সংযুক্ত করে... শিল্প-সংক্রমিত হবার মতা বঞ্চিত হলে মানুষের অবস্থা হতো আরো বেশি বর্বরের মতো। সর্বোপরি তারা পরষ্পরবিচ্ছিন্ন হয়ে একের প্রতি অপরে বৈরী ভাবাপন্ন হয়ে পড়তো। (লিও টলস্টয়, What is Art
.
কিন্তু প্রকৃতি কি? ‘আমি’ ব্যতীত সমস্তই প্রকৃতি। কারণ ‘আমি’র কাজ হলো প্রকৃতিকে সাজানো। ‘আমি’ যদি প্রকৃতি হয় বা প্রকৃতির অংশ হয় তাহলে ‘আমি’ অন্যকে বাদ দিয়ে তার আপনিকে সাজাতে ব্যস্ত হয়ে যাবে। ‘আমি’ ভাববে তার নিজেকে সাজানো তো প্রকৃতিকে সাজানোরই নামান্তর। কিন্তু প্রকৃতিকে সাজাতে গেলে তবে ‘আমি’কে সাজানোর ফুরসৎ কই। হয় এটা নয় ওটা। নবী-সুফী-সাধক-মহাপুরুষগণের মধ্যে তাই বোধ হয় নিজের প্রতি এক বিশেষ অবহেলা দেখা যেত। তা বুঝি এ কারণেই। আর সূফী-সাধুপুরুষদের কাছ থেকে তাই শিল্প সৃজন হয়ে আসতো কখনো কাব্য, চর্যাগীতিকা, দোঁহা কিংবা রুবাই হয়ে আবার কখনো সেমা’ কিংবা বাঁশির সুরে রুমীর নৃত্য হয়ে। এসব শিল্প’র উদ্ভব তো আসলে শিল্পস্রষ্টার প্রকৃতির দিকে বিশেষ দৃষ্টিতে তাকানোর ফসল। 
.
এই যদি হয় তবে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে, ‘আমি’ কার? ‘আমি’কে ধারণ করার পাত্র তো একটা লাগবে, তাই না? ‘আমি’ও আসলে প্রকৃতির অংশ তবে যার অস্তিত্ব অন্য অন্য ‘আমি’সমূহের চিন্তা রাজ্যে। এটা প্রকাশ পায় অপরের মঙ্গল চিন্তায়, অর্থাৎ প্রত্যেক ‘আমি’ ই নিজেকে ভুলে অপর ‘আমি’র চিন্তায়, কল্যাণ কামনায় অপরাপর অন্য সকল ‘আমি’কে অর্থাৎ প্রকৃতিকে অস্তিত্বশীল করে তোলে। অর্থাৎ ‘আমি’ নিজে ছাড়া অন্য সবার মাঝে অস্তিত্বশীল। ‘আমি’ যখন নিজেকে নিয়ে 
.
তাহলে শিল্প কি শেখায়? অপরের কল্যাণ কামনা করতে। শিল্পচেতনা তবে কি? অপরের কল্যাণ কামনা করার চেতনা। এর থেকে বিমূখ যে শিল্প, তা আসলে চেতনাবিহীন শিল্প। চেতনাবিহীন অঙ্গকে যেমন পাঘাতগ্রস্থ বলি তেমনি চেতনাবিহীন শিল্পকে পাঘাতগ্রস্থ শিল্প বলতে হয়।

প্রসঙ্গঃ শিল্পের উৎস

প্রসঙ্গঃ শিল্পের উৎস 
রাফসান গালিব 
.
অলৌকিক এর সাথে লৌকিকের সম্পর্কচর্চা থেকে শিল্পের যাত্রা শুরু। পৃথিবীর আদিম মানুষগুলোর ব্যক্তিগত ও সামাজিক আচরণ থেকেই যে শিল্পের উৎপত্তি- তা নিয়ে কোন দ্বিমত নেই। পরবর্তীতে সভ্যতার কালক্রমে চর্চা হতে থাকে শিল্পের ভাবাদর্শ, উদ্দেশ্য ও গন্তব্য। উন্মোচিত হতে থাকে এর স্বরূপ। শিল্প শুধু ব্যক্তি আবেগের অভিব্যক্তি নয় মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক নির্ণয় বা নির্মাণের অনুঘটকও। যে সম্পর্ক এমনই বাংলাদেশের একজন অন্নচাষা আর আফ্রিকার একজন অন্নচাষা কেউ কাউকে না দেখে একে অপরকে অনুভব করে। তারা উভয়েই তো প্রকৃতির মহৎ শিল্পকর্মে নিয়োজিত।  
.
শিল্পকর্ম শিল্পস্রষ্টার ব্যক্তিগত হতে পারে না। তার ভোক্তা হবে সমাজের সকল স্তরের মানুষ। তা না হলে শিল্প তার মাহাত্ম হারিয়ে ফেলবে। সৌন্দর্যহীন হয়ে পড়বে শিল্প। আর শিল্প নিছক বিনোদন কিংবা ব্যক্তিগত অনুভূতি নয় বলে শিল্পের মতাদর্শ, ভাবাদর্শ নিয়ে শিল্পস্রষ্টা ভাবতে বাধ্য হয়। শিল্পী তো শুধু শিল্পী নয়, সে একজন স্রষ্টাও বটে। কারণ শিল্পীর প্রধান দতা হচ্ছে সৃষ্টিশীলতা। যার সাথে আনন্দানুভূতি থাকবে, থাকবে শিল্পস্রষ্টার পারিপার্শ্বিক পরিমণ্ডলের সমূহ দাবী কিংবা আকাক্সা পূরণের সুন্দরতম প্রচেষ্টা। একটি শিল্পকর্ম সমাজের যাবতীয় ভাল, সুন্দর আর সত্যগুলোই প্রকাশ করবে, চিহ্নিত করবে যাবতীয় মন্দগুলো। তখনই শিল্পকর্মটি হবে উৎকৃষ্ট আর উঁচুমানের।  
.
শিল্পচর্চায় শিল্পীরা বিশেষ এক জগতের আশ্রয় নেয়। তাকে যদি বিমূর্ত বলা হয়, তাহলে বিমূর্তের মূর্ত প্রচেষ্টাই শিল্প। সরাসরি মূর্ত একটি শিল্পকর্ম দ্বারা ভোক্তার যে চিন্তার প্রতিফলন কিংবা সামূহিক সমাধান ঘটে তা আরো ব্যাপকতা লাভ করে বিমূর্ততায়। কারণ বিমূর্ত’র নির্দিষ্ট কোন ভাষা নেই। পৃথিবীর তাবৎ জনগোষ্ঠী যে কোন ভাষায় বিমূর্ত শিল্পের অর্থ উদ্ধার করতে পারে। সেই সাথে যোগাযোগ ঘটে সকল শিল্প ভোক্তার। 
.
বিমূর্ততা এমন এক জগৎ, যা দ্বারা শিল্পী অযাচিতভাবে তার শিল্প সৃষ্টিতে আচ্ছন্ন থাকে। এ জগতের সাথে শিল্পীর দৈহিক যোগাযোগ না ঘটলেও আত্মিক যোগাযোগ তো আছে। যোগাযোগ আছে বলেই সমূহ বিমূর্ত মূর্ত হয়ে উঠে বিমূর্ততায়। শিল্পী তার শিল্পকর্ম সৃষ্টিতে সুখানুভূতি পায় ভিন্ন এই জগতের অস্তিত্বকে লালন করে বলে। .
এই অলৌকিক জগতের সন্ধান করতে গিয়ে তো এক পর্যায়ে শিল্পচর্চার শুরু। ধর্মের ক্ষেত্রেও একই ব্যাপার ঘটেছে। যার কারণে শিল্পী ও স্রষ্টা আর শিল্প ও সৃষ্টির মধ্যকার সম্পর্ক নির্ণয় করতে কোন সমস্যায় পড়তে হয় না। স্রষ্টার সৃষ্টি-ভাবনা যেমন মৌলিক, ঠিক একইভাবে শিল্পীর শিল্পভাবনাও। যে ভাবনা কারো খেয়াল-খুশিতে তৈরী হয় না, হয় বিশেষ একটা উদ্দেশ্যে। 
.
আদিম মানুষের সমবেত প্রার্থনা, শিকার উৎসব, নৃত্য, সঙ্গীত, কীর্তণ সবই ছিল আরাধনার অংশ। দেব-দেবীর প্রতি আরাধনা। যাদেরকে স্রষ্টা হিসেবে তারা নিজেদের মধ্যে ধারণ করতো। তাদের সাথে যোগাযোগ করার বিচিত্র সব কর্মকাণ্ডে লিপ্ত থাকতো তখনকার ঐ মানুষেরা। তাদের এই আচরণ ও সংস্কৃতি থেকে উন্নতি ঘটে নাটক, গান, নাচ, চিত্রকর্ম, বাদ্যযন্ত্র ইত্যাদির। যেগুলো এক পর্যায়ে শিল্পচর্চার আধার হয়ে উঠে। স্বভাবতই একটা জায়গায় গিয়ে ধর্ম ও শিল্পের একই অবস্থান ল্য করা যায়। সংস্কৃত “ধৃ” ধাতু থেকে ধর্ম কথাটির উৎপত্তি। “ধৃ” অর্থ ধারণ করা। একই সাথে ইংরেজি রিলিজিয়ন শব্দটি উৎপন্ন হয় “রিলিজিও” ধাতু থেকে। যার অর্থ সংযুক্ত করা। এ হিসেবে ধর্ম সংজ্ঞায়িত করলে হয়, ধর্ম এমন একটি ব্যবস্থা যা মানবজাতিকে ব্যক্তি আর সামাজিকভাবে যাবতীয় সুন্দর, সত্য, ভাল, কল্যাণ আর ন্যায়ের মধ্যে ধারণ করবে। পরস্পরকে সংযুক্ত করবে এই মহৎ বৈশিষ্ট্য দ্বারা। শিল্পের ক্ষেত্রেও তাই। যারা ধর্মকে পরিপূর্ণতার সাথে লালন করে তারা ধার্মিক রূপে পরিগণিত হয়। তাহলে শিল্পী কি সেই, যে প্রকৃত ধার্মিক? এ জন্যই কি সঙ্গীতের আদিরূপ কীর্তন (স্রষ্টা বা দেব-দেবীর প্রতি নিবেদিত গান) আর প্রতিটি শিল্পযজ্ঞের শুরুতেই ভিন্ন এক অস্তিত্বের কথা স্মরণ করা হতো? প্রাচীনকাল থেকেই তো পৃথিবীর সকল ধর্মীয় বিশ্বাসের ধর্মীয় স্থাপনাগুলো গড়ে উঠেছে শৈল্পিকরূপে। কালের শিল্পীরা তাদের শিল্পচর্চার শুদ্ধতম প্রয়াস ঘটিয়েছে এসব শিল্পকর্মে। পৃথিবীর অসম্ভব সুন্দরের দৃষ্টান্ত মিশরের পিরামিডের সৃষ্টি তো ভিন্ন এক জগতকে ঘিরেই। যার ল্য শুধু সৌন্দর্য নয়, নান্দনিকতাও নয়। যার কারণে এর রহস্য খুঁজতে গিয়ে দিশেহারা হয়ে যায় সবাই।

শিল্পের ধ্বংসে সবাই দায়ী

শিল্পের ধ্বংসে সবাই দায়ী 
সাইফ শাওন
.
শিল্প কি, কেন, কার জন্য ইত্যাদি নানান প্রশ্ন আমাদেরকে নানান ভাবে চিন্তিত করে। এমন কিছু চিন্তা থেকেই কিছু মতের সৃষ্টি। ঠিক তেমনি শিল্পের রূপ নিয়েও অনেকের অনেক মত থাকতে পারে। তবে এ নিয়ে ভাবতে গেলে সকলেই শিল্পস্রষ্টা ও শিল্পভোক্তা নিয়ে ভাবেন। শিল্পস্রষ্টা যে চিন্তা চেতনা দিয়ে তার শিল্প সৃষ্টি করেন, ভোক্তা সেটা ভিন্ন ভাবেও বুঝে নিতে পারেন। এখানেই শিল্পের স্বাধীনতা। আর এতেই শিল্পের সাথে পণ্যের পার্থক্য। পণ্যের কোন স্বাধীনতা বা নিজস্বতা বলে কিছু নেই। ভোক্তা শ্রেণী যেভাবে চাইবে ঠিক সেভাবেই তাকে সাজতে হবে। আবার পণ্যের স্বাদ গন্ধ সবার কাছে একই রকম। স্বাদে বা গন্ধে সামান্য পরিবর্তন আসলেই তা আর বাজার উপযোগী হয়না। শিল্প যার মাঝে প্রবেশ করে তার ভেতরেই নতুন রূপে প্রকাশিত, বিকশিত হয়। ভোক্তা পণ্যকে তার চাহিদা অনুযায়ী সাজায় আর শিল্প তার ভোক্তাকে বিভিন্ন রূপে সাজায়। মানুষের হৃদয়ে শিল্পের উপস্থিতি ঐশ্বরিক। এই উপস্থিতি শিল্প-স্রষ্টা, শিল্প-ভোক্তা এবং শিল্প-মাধ্যম (পারফর্মিং আর্টসের ক্ষেত্রে শিল্পী)-এর কাছে ভিন্নরকম। অর্থাৎ প্রত্যেকের কাছেই তা ভিন্ন রূপে ধরা দেয়। আর এজন্যই শিল্পস্রষ্টার হৃদয়ে শিল্পের উপস্থিতি ঘটলে তার প্রকাশ কখনো কবিতা, কখনো গান আবার কখনো চিত্রের মাধ্যমে হয়ে থাকে। শিল্প আর পণ্যের পার্থক্য যে স্রষ্টা বুঝতে পারেন না, তার শিল্প কোন কারণ ব্যতীতই পণ্যে পরিণত হয়।
.
শিল্প হলো লাগামহীন ঘোড়ার মতো। যেদিকে খুশি যাওয়ার স্বাধীনতা আছে। স্রষ্টার চোখে সে একরকম আর ভোক্তা বা দর্শকের চোখে অন্যরকম হলেও কোন আপত্তি নেই। তবে যদি কোন ভাবে দুটো চোখেই সমান হয় তাহলে আমরা তাকে সার্থক শিল্প বলি। কেননা শিল্প-স্রষ্টা আর শিল্প-ভোক্তার মিলনের মধ্য দিয়েই শিল্পের সার্থকতা ফুটে উঠে। এই দুই পরে চিন্তা ও ভাবের মিলন ঘটানো এতটা সহজ কাজ না। কারণ শিল্পের একটা নিজস্বতা আছে, আর ব্যক্তি বা ভাবনার দিক থেকে এটা প্রতিনিয়ত পরিবর্তনশীল। তাই শিল্প স্রষ্টার চিন্তা থেকে কোন মাধ্যম দিয়ে ভোক্তার কাছে যাওয়ার পথে এর রূপ বদলে যাওয়াটা খুবই স্বাভাবিক। আর এতে কারো কোন আপত্তি থাকে না। কেননা বহুমাত্রিক রূপ থাকলেই তাকে শিল্প বলা চলে। ত্রে, অবস্থান, পরিবেশ, মাধ্যম ইত্যাদির পরিবর্তন ঘটলে শিল্পের অর্থেরও ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে। তাই শিল্প সার্বজনীন এবং স্থায়ী। 
.
স্রষ্টা আর ভোক্তার মাঝে যে সংযোগ সড়কের প্রয়োজন তার ভূমিকায় থাকেন একজন শিল্পী (পারফর্মিং আর্টসের ক্ষেত্রে, আবার চিত্রশিল্পের ক্ষেত্রে ক্যানভাসটা মাধ্যম)। শিল্পীর মাধ্যমেই স্রষ্টা তার শিল্পকে ভোক্তার কাছে প্রকাশ করেন। আবার কখনো কখনো স্রষ্টা নিজেই শিল্পী হয়ে তার শিল্পের প্রকাশ ঘটান। একই শিল্প যদি ভিন্ন ভিন্ন শিল্পীর দ্বারা প্রকাশ করা হয় তাহলে এর বিভিন্ন রূপ ফুটে উঠবে। কারণ শিল্পের রূপ বহুবিচিত্র। তাই তাকে কারো উপর (শিল্পী, মঞ্চ, পরিবেশ, ভোক্তা ইত্যাদি) নির্ভর করতে হয় না। এমন কি স্রষ্টার উপরও না। স্রষ্টা চাইলেই শিল্পের বৈচিত্রময়তার সাগর থেকে যে কোন একটা রূপ নিয়ে তা ভোক্তার কাছে প্রকাশ করতে পারেন। আর স্রষ্টা কোন রূপটি বেছে নিবেন তা স্রষ্টার রুচি, জ্ঞান ও ব্যক্তিত্বের উপর নির্ভর করে। কোন নাটক বা সিনেমায় একটা ধর্ষণের দৃশ্য অনেক কিছুই নির্দেশ করে। নির্মাতার দিক থেকে চিন্তা করলে বলতে হবে, তার সাজানোর ধরণটা কেমন? যদি এতে সমাজের বিশৃংখলা প্রকাশ পায় তাহলে একরকম আর যদি নারীর উপর পুরুষের নির্যাতন বুঝায় তাহলে অন্যরকম। আবার যদি নির্মাতা শুধুমাত্র একটা নির্দিষ্ট শ্রেণীর দর্শকের কথা ভাবেন (যারা শুধু এ দৃশ্যটি উপভোগ করার জন্য সেই শিল্পকর্ম দেখতে আসবেন) তাহলে এর নির্মাণ ভিন্ন রকম হতে পারে। এখানেই স্রষ্টার রুচি, জ্ঞান আর ব্যক্তিত্বের প্রকাশ ঘটে। আর তাই বলা যায় শিল্পের প্রয়োজনীয় ও সুন্দর রূপের প্রকাশটা স্রষ্টার উপরেই নির্ভর করে। স্রষ্টা চাইলে ভোক্তাকে অনেক ক্ষেত্রে পরিপাটি করতে পারেন।
.
স্রষ্টা যে শিল্প সৃষ্টি করেন, তা দর্শকের কাছে পৌঁছানো বর্তমানে খুব বেশি কঠিন কাজ নয়। দর্শক শ্রেণী কতটা পরিপাটি তা গুরুত্বপূর্ণ নয়। সঠিক শিল্পের সৃষ্টিতে পরিপাটি দর্শক শ্রেণী তৈরী হয় একথা যেমন সত্য তেমনি সত্য হল পরিপাটি দর্শক থাকলে সঠিক শিল্প তৈরী হবেই। তবে পরিপাটি শিল্পের সৃষ্টিতে আজও মানুষ আনন্দ পায়। সংখ্যায় কম হলেও এদের আগ্রহ ও উপস্থিতি অনেক শক্তিশালী ভূমিকা রাখে বলেই আজও আমরা সুস্থ শিল্পের ছোঁয়া পাই। এখন প্রশ্ন হচ্ছে কয়জন স্রষ্টা তার তৈরী শিল্পের নান্দনিকতার দিকে চোখ রাখেন? আর কয়জন শুধুমাত্র একটি নির্দিষ্ট শ্রেণীর দর্শককে সন্তুষ্ট করা ও সাময়িক আনন্দ দিয়ে ব্যবসা সফল শিল্প তৈরীতে ব্যস্ত থাকেন। আমরা সবাই জানি, আদমশুমারী করলে হয়তো ব্যবসায়ী মনের স্রষ্টার সংখ্যাই বেশি পাওয়া যাবে। তারা স্রষ্টার কস্টিউম পরে মঞ্চে প্রবেশ করে আর মৃত্যুদূতের অভিনয় করে শিল্পের ধ্বংসস্তুপ তৈরী করে বেড়ায় প্রতিটি শহরে। এজন্য শুধু তারাই দায়ী নয়। এক্ষেত্রে ভোক্তা, পৃষ্ঠপোষক, শিল্পী সকলেই সমান ধারার আসামী। মাঝে মধ্যে সমালোচনাকারী বুদ্ধিজীবী শ্রেণীকেও ভিন্ন ধারার কেউ মনে হয় না। একটি শিল্প যদি পণ্যে পরিণত হয় তাহলে এর দায় ভার যেমন শিল্পস্রষ্টার উপর বর্তায় ঠিক তেমনি শিল্পের সঙ্গে জড়িত অন্যান্য সকলেও চাইলেই এর দায় এড়িয়ে যেতে পারে না। কেননা সকলে মিলেই শিল্পের লালন পালন করতে হয়। অন্যথায় শিল্পের ধ্বংস নেমে আসে।

শিল্পঃ ক্ষুদ্রের জিজ্ঞাসা - ১

শিল্পঃ ক্ষুদ্রের জিজ্ঞাসা - ১ 
মঈদ উদ্দিন তৌহিদ 
১. 
শিল্প এবং সংস্কৃতি হাত ধরাধরি করে চলে। তবে তা সামনের দিকে না পেছনের দিকে এই প্রশ্ন অবান্তর। কারণ সভ্যতার সাথে এদের চলার কোন প্রশ্ন নেই। আমরা কেন এই বিশ্ব সংসারে জীবন যাপন করছি- এ প্রশ্ন সংস্কৃতির আর কিভাবে করছি- এ প্রশ্ন সভ্যতার। একটি জীবনের অর্থ সম্পর্কিত, অন্যটি জীবনের যাপন প্রণালী সম্পর্কিত। যদিও দেশ-কালের ঘটনাগুলি শিল্পকর্মের উপর প্রভাব ফেলে তারপরও যে সংকটগুলি থেকে শিল্প জন্ম নেয় তা আজো বিদ্যমান। অর্থাৎ আজ থেকে দুই হাজার বছর আগেও মানুষের মনে (মানবিক) যে সংকটগুলি ছিল বিভিন্নরূপে সেগুলোই এখনো বিরাজ করছে। বলা হয়ে থাকে, যে পরিবর্তনটা হলো তা হলো সভ্যতার অগ্রগতি। তাহলে উন্নত সভ্যতা ও অনুন্নত সভ্যতার অস্তিত্ব আছে। কিন্তু শিল্পের উন্নত অনুন্নত বলে কিছু নাই। তা হলে বিভেদ রচিত হয়। প্রমথ চৌধুরী বলেছেন যে, সাহিত্য করার অধিকার সকলেরই আছে। এটা শুধু শিতি শ্রেণীর একক অধিকার নয়। যুক্তি, তর্ক, অভিজ্ঞতা, জ্ঞান শিল্প সৃষ্টির জন্য অপরিহার্য নয়। কারণ শিল্পের উৎপত্তি হলো উপলব্ধি থেকে। জ্ঞান দিয়ে তাকে বিচার করা যায় না। তা না হলে (শিল্পের উৎপত্তি উপলব্ধি থেকে না হলে) শিল্পটি অনুকরণে পর্যবসিত হয়। তখন তাকে প্রকৃত শিল্প বলা যায় না। আর যেটা প্রকৃত শিল্প, তা হলো মৌলিক। আর একটা মৌলিক শিল্প হলো অনন্য। এটাকে বিচার করতে হলে এটাকে দিয়েই করতে হবে। এর জন্য অন্য কোন সাপে নেই। ফলে উন্নত বা অনুন্নতার প্রশ্ন এখানে খাটছে না। 
২. 
চেতনাবিহীন শিল্প কখনো পূর্ণতা পায় না। এটা তখন নিছক শিল্পচর্চা হয়। যাকে কলাকৈবল্যবাদ বলে। এ ধরণের শিল্পচর্চার প্রাণ আছে বলে মনে হয় না। একজন শিল্পী সৃজনশীল মানুষ। তিনি সৃষ্টি করতে ভালোবাসেন। তবে তার এ ভালোবাসা শুধু নিজের জন্য না হয়ে যদি অপরের জন্য বা সমাজের জন্য হয় তবেই মঙ্গল। সৃষ্টিকর্তা কোন কিছুই তাঁর নিজের জন্য সৃষ্টি করেননি। তিনি তাঁর সৃষ্টিকে পরম ভালোবাসায় সৃষ্টি করেছেন। কিন্তু শিল্পী যদি নিজের জন্য বা নিছক প্রয়োজনের তাগিদে বা শিল্পচর্চার জন্য সৃষ্টি করেন তখন তার শিল্প পণ্যে পরিণত হয়। মানুষ তার এ শিল্পকে নিজের প্রয়োজনেই ব্যবহার করে। রবীন্দ্রনাথের অনেক গান বা কবিতাই এখন রমণীদের মন ভোলানোর জন্য ব্যবহৃত হয়। শিল্পীর উদ্দেশ্য (নিয়্যত) তার শিল্পে প্রতিফলিত হয়। নাম যশ খ্যাতি যদি তার শিল্পচর্চার উদ্দেশ্য হয় তাহলে এর শেষ পরিণাম খুব একটা ইতিবাচক হয় বলে মনে হয় না। আর এখানেই শিল্পীর আমিত্বের প্রশ্ন। 
.
শিল্পীর আমিত্ব যদি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠে তাহলে শিল্প তিগ্রস্থ হয়। অর্থাৎ শিল্প তার প্রকৃত পথ থেকে সরে দাঁড়ায়। তাহলে চেতনা সমৃদ্ধ শিল্পই হওয়া উচিৎ একজন শিল্পীর ব্রত। যেখানে তিনি নিজেকে অন্যের মাঝে বিলিয়ে দিয়ে শিল্প রচনা করবেন। 
৩. 
কারা কারা শিল্প করতে পারেন? শিল্পে অধিকার কাদের? আজ এই প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। মাধ্যমটি সৃজনশীল এবং সৃজনশীলদের এ অধিকার আছে বলা যায়। দখলদারিত্বের প্রশ্ন এখানে অবান্তর। কিন্তু দখলদারিত্ব চলছে, প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমে, অর্থনৈতিক ও সামাজিক শক্তির নামে, উন্নত শিল্পের নামে, কাঠামোর নামে, স্কুলের নামে।  
.
একজন শিল্পী শিল্প রচনা করেন তার পরম মমতা দিয়ে, প্রবল আবেগ-অনুভূতি দিয়ে, প্রগাঢ় উপলব্ধি দিয়ে। প্রশ্নটা হচ্ছে, শিল্পরচনা করতে হলে তাকে কাঠামোর শরণাপন্ন হতে হবে কি না। কোন স্কুলের শরণাপন্ন হতে হবে কি না। মোদ্দা কথা সার্থক শিল্পীর স্বীকৃতি পেতে তাঁকে তাঁর মৌলিকতা বিসর্জন দিতে হবে কি না। প্রমথ চৌধুরীর মতে, সাহিত্য (শিল্প) রচনা সমালোচনার ভার যখন শিকদের হাতে এসে পড়তে শুরু করলো তখন সাহিত্যের (শিল্পের) গভীরতা কমতে শুরু করেছে এবং অলঙ্কারশাস্ত্র উৎকর্ষতা পেতে শুরু করেছে। ঠিক যেমন, ইংরেজি, মার্কস, হেগেল, রুশো না জানলে যেমন আমরা শিতি বলে বিবেচিত হই না, তাই স্বীকৃতি পেতে একজন শিল্পীকেও তেমন শিক্ষিত হতে হবে। কিন্তু শিল্প কখনোই এই শিক্ষার উপর নির্ভরশীল নয়। ‘প্রকৃত শিক্ষা (জ্ঞান) কি’? এ প্রশ্ন আমাদের আর বিচলিত করে না। কারণ অর্থনৈতিক (বাজারের) মানদণ্ডে সমাজ তার মানস রচনা করেছে। তাই শিক্ষা (জ্ঞান) যদি এই মানদণ্ডে উৎরে না ওঠে তবে সেই শিক্ষা (জ্ঞান) বিচারের দাবী রাখে না। প্রকৃত আর অপ্রকৃত- সে বিবেচনা তো অনেক দূরের প্রশ্ন। শিল্পের ক্ষেত্রে ও একই কথা প্রযোজ্য।
.
শিল্পের ক্ষেত্রে ও একই কথা প্রযোজ্য। চিন্তা করুন তো একজন অক্ষর বিহীন তীব্র অনুভূতি (যার উপলব্ধিও আছে) সম্পন্ন এক শিল্পীর কথা! তাঁর শিল্পকর্মের মূল্যায়ন কিভাবে ঘটছে বর্তমানে?

শিল্পঃ ক্ষুদ্রের জিজ্ঞাসা - ২

শিল্পঃ ক্ষুদ্রের জিজ্ঞাসা - ২ 
আসবাবীর রাফসান 
.
শিল্পাঙ্গনের এক ক্ষুদ্র কর্মী আমি। চর্চা করতে এসে নিজের ভেতর নানা প্রশ্নের সম্মূখীন হয়েছি। কি করছি? কেন করছি? এই প্রশ্ন স্বভাবতই এসে যায়। 
এ লেখায় তেমন কিছু প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করা হয়েছে। আবার কিছু প্রশ্নই রয়ে গেছে। কি করছি, এই প্রশ্নের একটা উত্তর হতে পারে শিল্পচর্চা করছি। এখানেই প্রশ্নগুলোর অবতারণা। শিল্প কি বা কাকে বলে?  
.
যিনি শিল্প সৃষ্টি করেন তিনি শিল্পী। ব্যক্তি যখন কোন বিষয়ে ভাবিত হন এবং তার ভেতরে কিছু করার তাড়না অনুভব করেন, তখন ভাবনা-ক্রিয়ায় চেতনার জন্ম। চেতনা থেকে যা সৃষ্টি হয় তাই শিল্প। চেতনার বহিঃপ্রকাশ ঘটে শিল্পে। তাই শিল্প মাত্রই উদ্দীপক। কিন্তু সকল উদ্দীপকই শিল্প কি? ব্যক্তি যখন কোন বিষয়ে ভাবিত হন এবং কিছু করার তাড়না অনুভব করেন তখন তার মাঝে শিল্পী-সত্ত্বার জন্ম নেয়। এই সত্ত্বা তাকে সৃষ্টির তাগাদা দেয়। ব্যক্তি-সত্ত্বা হতে এই শিল্পী-সত্ত্বা আলাদা। শিল্পী-সত্ত্বার প্রকাশে ব্যক্তিগত ভাল লাগা খারাপ লাগা আসলেও আসতে পারে, কিন্তু সেখানে ব্যক্তিগত লাভালাভ বা মোহ কাজ করলে শিল্প সৃষ্টি হতে পারে না। শিল্প সব সময় সামগ্রিক কল্যাণ ও সামষ্টিক বিষয় নিয়ে প্রবাহিত, তাই ব্যক্তিগত উদ্দীপকীয় বিষয়গুলো শিল্প হতে পারে না। ব্যক্তি অসৎ হলেও হতে পারেন। কিন্তু তার শিল্প-সত্ত্বা কখনোই অসৎ-অসত্য কথা বলতে পারে না। শিল্প অকল্যাণ ও বিশৃঙ্খলাকে রোধ করে। যা অকল্যাণ বয়ে আনে এবং বিশৃঙ্খলা তৈরী করে তা কি শিল্প হতে পারে? নিশ্চয় নয়। শিল্প সৃষ্টি তাই পূর্ণ মনোযোগ এবং আলোচ্য বিষয় সম্পর্কে আদ্যোপান্ত, পক্ষে বিপক্ষে সকল বিষয়াবলী বিচার-বিশ্লেষণ করেই হওয়া উচিৎ। এরপরও শিল্পীর ভুল হয়েও যেতে পারে। তার সেই ভুল শুধরে দেওয়ার দায়িত্ব অপরাপর শিল্পীদের। অপর শিল্পী তার সমালোচনা করবেন। ভুল ধরিয়ে দেবেন অবশ্যই শৈল্পিক কায়দায়। পারস্পরিক সমালোচনা, ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ ও শিল্পীদের হৃদ্যতার মাধ্যমেই শিল্প এগিয়ে যেতে পারে।
.
এবার আসা যাক শিল্পের উৎসে। শিল্পের উৎস কি? একটা কথা শোনা যায়, “ভেতর থেকে কর, ভেতর থেকে না করলে হবে না” বা “উনি/অমুক একেবারে ভেতর থেকে কাজটা করেছেন”। কেন ‘ভেতর’ এর কথা বলা হয়? কি আছে ওখানে?  
.
আমরা মানুষ, প্রতিনিয়ত শুনছি, দেখছি। গাছ, নদী, পাখি, আকাশ, পাহাড়, সাগর, চাঁদ, সুর্য এগুলো মানুষের ভেতর আলোড়ন সৃষ্টি করে। শিল্পী এখান থেকে অনুপ্রেরণা খুঁজে পান। তাহলে প্রকৃতিই কি শিল্পের উৎস? আবার একটা গাছ, পাহাড় তাতেও তো যেন কোন শিল্পীর ছোঁয়া। তাহলে প্রকৃতি নিজেই কি একটা শিল্প? হলে, এ শিল্পের স্রষ্টাও আছেন। নিশ্চয়। আবার একই বিষয়ে, অন্য প্রসঙ্গে, ‘পণ্যের বিজ্ঞাপণ’, এতেও তো বহু সৃজনশীলতা দেখা যায়, পণ্যের প্রতি আকৃষ্ট হওয়ার অনুভূতি কাজ করে, হোক না তা বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যেই। বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যকে সফল করার এই চর্চাকে কি আমরা শিল্প বলবো? নাকি শিল্পের স্তরভাগ-প্রকারভেদ করে এই চর্চার নাম দেব ‘বাণিজ্যিক শিল্প’? শিল্পের কি বাণিজ্যিকীকরণ হতে পারে বা বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে কৃত কর্মকে কি শিল্প বলা যায়?  
.
কেন শিল্পচর্চা? শিল্পের প্রচারের জন্যে শিল্পচর্চা? নাকি চেতনা প্রচারের জন্যে শিল্পচর্চা? এমন কিছু যা নান্দনিক কিন্তু বোধগম্য নয় তা কি শিল্প? একজন শিল্পী নিশ্চয় অন্য দশ জন মানুষ হতে ভিন্ন, তাই তার শিল্পের চর্চা-প্রয়োগ এমন হওয়াই উচিৎ নয় কি যা সকলের উপকারার্থে আসে?
.
পরিশেষে নিবেদন, দীর্ঘ কথায় অনেকগুলো কি, কেন'’তে আপনাদের কর্মকান্ত করার জন্য দুঃখিত। কিন্তু কাস্তে হাতে খড় কাটতে গেলে কোনরূপ কেন’র সম্মুখীন হতে না হলেও শিল্প নিয়ে খেলতে এসে এই সকল কি, কেন’র উত্তর বের করা আমার অবশ্য কর্তব্য বলে মনে হয়েছে। এ জন্যই এই যাত্রা এবং তা অব্যাহত থাকবে।