সাইফ শাওন লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
সাইফ শাওন লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
সম্পাদকীয় ১ম বর্ষ, ২য় সংখ্যা, ডিসেম্বর ২০০৯
মানব অস্তিত্বের ‘অনন্যতা’ কী? ‘মানুষ’ যদি পশুরই এক পদের নাম বলে কেউ মনে করেন, তবে তাকে ভিন্ন অন্যদের পুঁছি, মানুষের ‘অনন্যতা’ কী? মানুষ গান গাইতে পারে, পশু পারে না; মানুষ নাটকের সংলাপ মুখস্ত বলতে পারে, পশুর মুখস্ত বিদ্যা নেই; মানুষ ছবি আঁকে, পশু আঁকে না- এই কি মানুষের অনন্যতা? মানুষের অনন্যতা হলো- সে শিল্পী, সে তার দৈনন্দিন কাজের মধ্যে শিল্প ফুটিয়ে তুলতে পারে। আর গান, নাটক, কবিতা কিংবা চিত্রকলা নিছক সেই শিল্পকে প্রকাশের বাহন বৈ ভিন্ন কিছু নয়। কিন্তু সকলেই তো স্বীয় কাজে শিল্পের প্রকাশ ঘটাতে পারেন না, কিছু কিছু মানুষ পারেন। আবার সবাই সেই শিল্পকে দেখতেও পান না। তাই শিল্পী আর সাধারণ মানুষের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। তিনি সাধারণের মধ্যে থেকেও তার দৃষ্টিভঙ্গি, চিন্তাধারা ও মননের কারণে সবার থেকে অসাধারণ। মানুষের দৈনন্দিন কাজগুলোর মধ্যে হঠাৎ হঠাৎ শিল্পের জন্ম নেয়। শিল্পীর দৃষ্টিটা কেমন?
.
অগুনতি মাথা দেখে আমি বলি কালো
তুমি বলো দূরে দেখো চিল
ডানা মেলা চিল, দেখো কালো ডানা চিল
আকাশে ভাসে চিল।
.
শিল্পীর দৃষ্টিটা মনে হয় এ রকম। তবে অবশ্যই তা অনর্থক ব্যাঙের মধ্যে সাপের অস্তিত্ব খুঁজে দেখার দৃষ্টি নয়। সৃজনশীল কোন কিছুই অহেতুক অনর্থক হতে পারে কি? প্রশ্নটা নিজেদের জন্য করে রাখলাম। আবার মানুষের সকল সৃজনশীল কর্মকাণ্ডকে কি শিল্প বলা যায়? সিগারেট কোম্পানীর স্পন্সরে যখন আমরা মুক্ত, আমরা স্বাধীন, আমরা স্মাটর্, আমরা ধূমপান করি না টাইপের সঙ্গীত রচিত হয়, সৃজনশীলতা এবং নন্দনের মাপকাঠিতে তা যতই উৎরে যাক, তাকে ঠিক কোন অর্থে শিল্প বলা যায়? আমরা তাকে শিল্প বলতে নারাজ। একে সর্বোচ্চ একটা উৎকৃষ্ট ঠাট্টা বলা যেতে পারে।
.
শিল্প প্রসঙ্গে আমাদের ভাবনাগুলো এভাবেই পথ খুঁজে পাচ্ছে। এ সংখ্যায় প্রকাশিত লেখাগুলো শিল্প সম্পর্কে আমাদের সিদ্ধান্তকে প্রকাশ করছে না, বরং শিল্প নিয়ে আমাদের নিরন্তর জিজ্ঞাসার যাত্রা মাত্র। লোকযাত্রার পরবর্তী সংখ্যাগুলোতেও আমাদের অনুসন্ধান অব্যাহত রাখার ইচ্ছা পোষণ করি।
.
বিনীত
মাসউদুর রহমান
সাইফ শাওন
ডিসেম্বর ২০০৯
শিল্পের ধ্বংসে সবাই দায়ী
শিল্পের ধ্বংসে সবাই দায়ী
সাইফ শাওন
.
শিল্প কি, কেন, কার জন্য ইত্যাদি নানান প্রশ্ন আমাদেরকে নানান ভাবে চিন্তিত করে। এমন কিছু চিন্তা থেকেই কিছু মতের সৃষ্টি। ঠিক তেমনি শিল্পের রূপ নিয়েও অনেকের অনেক মত থাকতে পারে। তবে এ নিয়ে ভাবতে গেলে সকলেই শিল্পস্রষ্টা ও শিল্পভোক্তা নিয়ে ভাবেন। শিল্পস্রষ্টা যে চিন্তা চেতনা দিয়ে তার শিল্প সৃষ্টি করেন, ভোক্তা সেটা ভিন্ন ভাবেও বুঝে নিতে পারেন। এখানেই শিল্পের স্বাধীনতা। আর এতেই শিল্পের সাথে পণ্যের পার্থক্য। পণ্যের কোন স্বাধীনতা বা নিজস্বতা বলে কিছু নেই। ভোক্তা শ্রেণী যেভাবে চাইবে ঠিক সেভাবেই তাকে সাজতে হবে। আবার পণ্যের স্বাদ গন্ধ সবার কাছে একই রকম। স্বাদে বা গন্ধে সামান্য পরিবর্তন আসলেই তা আর বাজার উপযোগী হয়না। শিল্প যার মাঝে প্রবেশ করে তার ভেতরেই নতুন রূপে প্রকাশিত, বিকশিত হয়। ভোক্তা পণ্যকে তার চাহিদা অনুযায়ী সাজায় আর শিল্প তার ভোক্তাকে বিভিন্ন রূপে সাজায়। মানুষের হৃদয়ে শিল্পের উপস্থিতি ঐশ্বরিক। এই উপস্থিতি শিল্প-স্রষ্টা, শিল্প-ভোক্তা এবং শিল্প-মাধ্যম (পারফর্মিং আর্টসের ক্ষেত্রে শিল্পী)-এর কাছে ভিন্নরকম। অর্থাৎ প্রত্যেকের কাছেই তা ভিন্ন রূপে ধরা দেয়। আর এজন্যই শিল্পস্রষ্টার হৃদয়ে শিল্পের উপস্থিতি ঘটলে তার প্রকাশ কখনো কবিতা, কখনো গান আবার কখনো চিত্রের মাধ্যমে হয়ে থাকে। শিল্প আর পণ্যের পার্থক্য যে স্রষ্টা বুঝতে পারেন না, তার শিল্প কোন কারণ ব্যতীতই পণ্যে পরিণত হয়।
শিল্প কি, কেন, কার জন্য ইত্যাদি নানান প্রশ্ন আমাদেরকে নানান ভাবে চিন্তিত করে। এমন কিছু চিন্তা থেকেই কিছু মতের সৃষ্টি। ঠিক তেমনি শিল্পের রূপ নিয়েও অনেকের অনেক মত থাকতে পারে। তবে এ নিয়ে ভাবতে গেলে সকলেই শিল্পস্রষ্টা ও শিল্পভোক্তা নিয়ে ভাবেন। শিল্পস্রষ্টা যে চিন্তা চেতনা দিয়ে তার শিল্প সৃষ্টি করেন, ভোক্তা সেটা ভিন্ন ভাবেও বুঝে নিতে পারেন। এখানেই শিল্পের স্বাধীনতা। আর এতেই শিল্পের সাথে পণ্যের পার্থক্য। পণ্যের কোন স্বাধীনতা বা নিজস্বতা বলে কিছু নেই। ভোক্তা শ্রেণী যেভাবে চাইবে ঠিক সেভাবেই তাকে সাজতে হবে। আবার পণ্যের স্বাদ গন্ধ সবার কাছে একই রকম। স্বাদে বা গন্ধে সামান্য পরিবর্তন আসলেই তা আর বাজার উপযোগী হয়না। শিল্প যার মাঝে প্রবেশ করে তার ভেতরেই নতুন রূপে প্রকাশিত, বিকশিত হয়। ভোক্তা পণ্যকে তার চাহিদা অনুযায়ী সাজায় আর শিল্প তার ভোক্তাকে বিভিন্ন রূপে সাজায়। মানুষের হৃদয়ে শিল্পের উপস্থিতি ঐশ্বরিক। এই উপস্থিতি শিল্প-স্রষ্টা, শিল্প-ভোক্তা এবং শিল্প-মাধ্যম (পারফর্মিং আর্টসের ক্ষেত্রে শিল্পী)-এর কাছে ভিন্নরকম। অর্থাৎ প্রত্যেকের কাছেই তা ভিন্ন রূপে ধরা দেয়। আর এজন্যই শিল্পস্রষ্টার হৃদয়ে শিল্পের উপস্থিতি ঘটলে তার প্রকাশ কখনো কবিতা, কখনো গান আবার কখনো চিত্রের মাধ্যমে হয়ে থাকে। শিল্প আর পণ্যের পার্থক্য যে স্রষ্টা বুঝতে পারেন না, তার শিল্প কোন কারণ ব্যতীতই পণ্যে পরিণত হয়।
.
শিল্প হলো লাগামহীন ঘোড়ার মতো। যেদিকে খুশি যাওয়ার স্বাধীনতা আছে। স্রষ্টার চোখে সে একরকম আর ভোক্তা বা দর্শকের চোখে অন্যরকম হলেও কোন আপত্তি নেই। তবে যদি কোন ভাবে দুটো চোখেই সমান হয় তাহলে আমরা তাকে সার্থক শিল্প বলি। কেননা শিল্প-স্রষ্টা আর শিল্প-ভোক্তার মিলনের মধ্য দিয়েই শিল্পের সার্থকতা ফুটে উঠে। এই দুই পরে চিন্তা ও ভাবের মিলন ঘটানো এতটা সহজ কাজ না। কারণ শিল্পের একটা নিজস্বতা আছে, আর ব্যক্তি বা ভাবনার দিক থেকে এটা প্রতিনিয়ত পরিবর্তনশীল। তাই শিল্প স্রষ্টার চিন্তা থেকে কোন মাধ্যম দিয়ে ভোক্তার কাছে যাওয়ার পথে এর রূপ বদলে যাওয়াটা খুবই স্বাভাবিক। আর এতে কারো কোন আপত্তি থাকে না। কেননা বহুমাত্রিক রূপ থাকলেই তাকে শিল্প বলা চলে। ত্রে, অবস্থান, পরিবেশ, মাধ্যম ইত্যাদির পরিবর্তন ঘটলে শিল্পের অর্থেরও ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে। তাই শিল্প সার্বজনীন এবং স্থায়ী।
শিল্প হলো লাগামহীন ঘোড়ার মতো। যেদিকে খুশি যাওয়ার স্বাধীনতা আছে। স্রষ্টার চোখে সে একরকম আর ভোক্তা বা দর্শকের চোখে অন্যরকম হলেও কোন আপত্তি নেই। তবে যদি কোন ভাবে দুটো চোখেই সমান হয় তাহলে আমরা তাকে সার্থক শিল্প বলি। কেননা শিল্প-স্রষ্টা আর শিল্প-ভোক্তার মিলনের মধ্য দিয়েই শিল্পের সার্থকতা ফুটে উঠে। এই দুই পরে চিন্তা ও ভাবের মিলন ঘটানো এতটা সহজ কাজ না। কারণ শিল্পের একটা নিজস্বতা আছে, আর ব্যক্তি বা ভাবনার দিক থেকে এটা প্রতিনিয়ত পরিবর্তনশীল। তাই শিল্প স্রষ্টার চিন্তা থেকে কোন মাধ্যম দিয়ে ভোক্তার কাছে যাওয়ার পথে এর রূপ বদলে যাওয়াটা খুবই স্বাভাবিক। আর এতে কারো কোন আপত্তি থাকে না। কেননা বহুমাত্রিক রূপ থাকলেই তাকে শিল্প বলা চলে। ত্রে, অবস্থান, পরিবেশ, মাধ্যম ইত্যাদির পরিবর্তন ঘটলে শিল্পের অর্থেরও ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে। তাই শিল্প সার্বজনীন এবং স্থায়ী।
.
স্রষ্টা আর ভোক্তার মাঝে যে সংযোগ সড়কের প্রয়োজন তার ভূমিকায় থাকেন একজন শিল্পী (পারফর্মিং আর্টসের ক্ষেত্রে, আবার চিত্রশিল্পের ক্ষেত্রে ক্যানভাসটা মাধ্যম)। শিল্পীর মাধ্যমেই স্রষ্টা তার শিল্পকে ভোক্তার কাছে প্রকাশ করেন। আবার কখনো কখনো স্রষ্টা নিজেই শিল্পী হয়ে তার শিল্পের প্রকাশ ঘটান। একই শিল্প যদি ভিন্ন ভিন্ন শিল্পীর দ্বারা প্রকাশ করা হয় তাহলে এর বিভিন্ন রূপ ফুটে উঠবে। কারণ শিল্পের রূপ বহুবিচিত্র। তাই তাকে কারো উপর (শিল্পী, মঞ্চ, পরিবেশ, ভোক্তা ইত্যাদি) নির্ভর করতে হয় না। এমন কি স্রষ্টার উপরও না। স্রষ্টা চাইলেই শিল্পের বৈচিত্রময়তার সাগর থেকে যে কোন একটা রূপ নিয়ে তা ভোক্তার কাছে প্রকাশ করতে পারেন। আর স্রষ্টা কোন রূপটি বেছে নিবেন তা স্রষ্টার রুচি, জ্ঞান ও ব্যক্তিত্বের উপর নির্ভর করে। কোন নাটক বা সিনেমায় একটা ধর্ষণের দৃশ্য অনেক কিছুই নির্দেশ করে। নির্মাতার দিক থেকে চিন্তা করলে বলতে হবে, তার সাজানোর ধরণটা কেমন? যদি এতে সমাজের বিশৃংখলা প্রকাশ পায় তাহলে একরকম আর যদি নারীর উপর পুরুষের নির্যাতন বুঝায় তাহলে অন্যরকম। আবার যদি নির্মাতা শুধুমাত্র একটা নির্দিষ্ট শ্রেণীর দর্শকের কথা ভাবেন (যারা শুধু এ দৃশ্যটি উপভোগ করার জন্য সেই শিল্পকর্ম দেখতে আসবেন) তাহলে এর নির্মাণ ভিন্ন রকম হতে পারে। এখানেই স্রষ্টার রুচি, জ্ঞান আর ব্যক্তিত্বের প্রকাশ ঘটে। আর তাই বলা যায় শিল্পের প্রয়োজনীয় ও সুন্দর রূপের প্রকাশটা স্রষ্টার উপরেই নির্ভর করে। স্রষ্টা চাইলে ভোক্তাকে অনেক ক্ষেত্রে পরিপাটি করতে পারেন।
স্রষ্টা আর ভোক্তার মাঝে যে সংযোগ সড়কের প্রয়োজন তার ভূমিকায় থাকেন একজন শিল্পী (পারফর্মিং আর্টসের ক্ষেত্রে, আবার চিত্রশিল্পের ক্ষেত্রে ক্যানভাসটা মাধ্যম)। শিল্পীর মাধ্যমেই স্রষ্টা তার শিল্পকে ভোক্তার কাছে প্রকাশ করেন। আবার কখনো কখনো স্রষ্টা নিজেই শিল্পী হয়ে তার শিল্পের প্রকাশ ঘটান। একই শিল্প যদি ভিন্ন ভিন্ন শিল্পীর দ্বারা প্রকাশ করা হয় তাহলে এর বিভিন্ন রূপ ফুটে উঠবে। কারণ শিল্পের রূপ বহুবিচিত্র। তাই তাকে কারো উপর (শিল্পী, মঞ্চ, পরিবেশ, ভোক্তা ইত্যাদি) নির্ভর করতে হয় না। এমন কি স্রষ্টার উপরও না। স্রষ্টা চাইলেই শিল্পের বৈচিত্রময়তার সাগর থেকে যে কোন একটা রূপ নিয়ে তা ভোক্তার কাছে প্রকাশ করতে পারেন। আর স্রষ্টা কোন রূপটি বেছে নিবেন তা স্রষ্টার রুচি, জ্ঞান ও ব্যক্তিত্বের উপর নির্ভর করে। কোন নাটক বা সিনেমায় একটা ধর্ষণের দৃশ্য অনেক কিছুই নির্দেশ করে। নির্মাতার দিক থেকে চিন্তা করলে বলতে হবে, তার সাজানোর ধরণটা কেমন? যদি এতে সমাজের বিশৃংখলা প্রকাশ পায় তাহলে একরকম আর যদি নারীর উপর পুরুষের নির্যাতন বুঝায় তাহলে অন্যরকম। আবার যদি নির্মাতা শুধুমাত্র একটা নির্দিষ্ট শ্রেণীর দর্শকের কথা ভাবেন (যারা শুধু এ দৃশ্যটি উপভোগ করার জন্য সেই শিল্পকর্ম দেখতে আসবেন) তাহলে এর নির্মাণ ভিন্ন রকম হতে পারে। এখানেই স্রষ্টার রুচি, জ্ঞান আর ব্যক্তিত্বের প্রকাশ ঘটে। আর তাই বলা যায় শিল্পের প্রয়োজনীয় ও সুন্দর রূপের প্রকাশটা স্রষ্টার উপরেই নির্ভর করে। স্রষ্টা চাইলে ভোক্তাকে অনেক ক্ষেত্রে পরিপাটি করতে পারেন।
.
স্রষ্টা যে শিল্প সৃষ্টি করেন, তা দর্শকের কাছে পৌঁছানো বর্তমানে খুব বেশি কঠিন কাজ নয়। দর্শক শ্রেণী কতটা পরিপাটি তা গুরুত্বপূর্ণ নয়। সঠিক শিল্পের সৃষ্টিতে পরিপাটি দর্শক শ্রেণী তৈরী হয় একথা যেমন সত্য তেমনি সত্য হল পরিপাটি দর্শক থাকলে সঠিক শিল্প তৈরী হবেই। তবে পরিপাটি শিল্পের সৃষ্টিতে আজও মানুষ আনন্দ পায়। সংখ্যায় কম হলেও এদের আগ্রহ ও উপস্থিতি অনেক শক্তিশালী ভূমিকা রাখে বলেই আজও আমরা সুস্থ শিল্পের ছোঁয়া পাই। এখন প্রশ্ন হচ্ছে কয়জন স্রষ্টা তার তৈরী শিল্পের নান্দনিকতার দিকে চোখ রাখেন? আর কয়জন শুধুমাত্র একটি নির্দিষ্ট শ্রেণীর দর্শককে সন্তুষ্ট করা ও সাময়িক আনন্দ দিয়ে ব্যবসা সফল শিল্প তৈরীতে ব্যস্ত থাকেন। আমরা সবাই জানি, আদমশুমারী করলে হয়তো ব্যবসায়ী মনের স্রষ্টার সংখ্যাই বেশি পাওয়া যাবে। তারা স্রষ্টার কস্টিউম পরে মঞ্চে প্রবেশ করে আর মৃত্যুদূতের অভিনয় করে শিল্পের ধ্বংসস্তুপ তৈরী করে বেড়ায় প্রতিটি শহরে। এজন্য শুধু তারাই দায়ী নয়। এক্ষেত্রে ভোক্তা, পৃষ্ঠপোষক, শিল্পী সকলেই সমান ধারার আসামী। মাঝে মধ্যে সমালোচনাকারী বুদ্ধিজীবী শ্রেণীকেও ভিন্ন ধারার কেউ মনে হয় না। একটি শিল্প যদি পণ্যে পরিণত হয় তাহলে এর দায় ভার যেমন শিল্পস্রষ্টার উপর বর্তায় ঠিক তেমনি শিল্পের সঙ্গে জড়িত অন্যান্য সকলেও চাইলেই এর দায় এড়িয়ে যেতে পারে না। কেননা সকলে মিলেই শিল্পের লালন পালন করতে হয়। অন্যথায় শিল্পের ধ্বংস নেমে আসে।
স্রষ্টা যে শিল্প সৃষ্টি করেন, তা দর্শকের কাছে পৌঁছানো বর্তমানে খুব বেশি কঠিন কাজ নয়। দর্শক শ্রেণী কতটা পরিপাটি তা গুরুত্বপূর্ণ নয়। সঠিক শিল্পের সৃষ্টিতে পরিপাটি দর্শক শ্রেণী তৈরী হয় একথা যেমন সত্য তেমনি সত্য হল পরিপাটি দর্শক থাকলে সঠিক শিল্প তৈরী হবেই। তবে পরিপাটি শিল্পের সৃষ্টিতে আজও মানুষ আনন্দ পায়। সংখ্যায় কম হলেও এদের আগ্রহ ও উপস্থিতি অনেক শক্তিশালী ভূমিকা রাখে বলেই আজও আমরা সুস্থ শিল্পের ছোঁয়া পাই। এখন প্রশ্ন হচ্ছে কয়জন স্রষ্টা তার তৈরী শিল্পের নান্দনিকতার দিকে চোখ রাখেন? আর কয়জন শুধুমাত্র একটি নির্দিষ্ট শ্রেণীর দর্শককে সন্তুষ্ট করা ও সাময়িক আনন্দ দিয়ে ব্যবসা সফল শিল্প তৈরীতে ব্যস্ত থাকেন। আমরা সবাই জানি, আদমশুমারী করলে হয়তো ব্যবসায়ী মনের স্রষ্টার সংখ্যাই বেশি পাওয়া যাবে। তারা স্রষ্টার কস্টিউম পরে মঞ্চে প্রবেশ করে আর মৃত্যুদূতের অভিনয় করে শিল্পের ধ্বংসস্তুপ তৈরী করে বেড়ায় প্রতিটি শহরে। এজন্য শুধু তারাই দায়ী নয়। এক্ষেত্রে ভোক্তা, পৃষ্ঠপোষক, শিল্পী সকলেই সমান ধারার আসামী। মাঝে মধ্যে সমালোচনাকারী বুদ্ধিজীবী শ্রেণীকেও ভিন্ন ধারার কেউ মনে হয় না। একটি শিল্প যদি পণ্যে পরিণত হয় তাহলে এর দায় ভার যেমন শিল্পস্রষ্টার উপর বর্তায় ঠিক তেমনি শিল্পের সঙ্গে জড়িত অন্যান্য সকলেও চাইলেই এর দায় এড়িয়ে যেতে পারে না। কেননা সকলে মিলেই শিল্পের লালন পালন করতে হয়। অন্যথায় শিল্পের ধ্বংস নেমে আসে।
সম্পাদকীয় ১ম বর্ষ, ১ম সংখ্যা, জুন ২০০৯
আমরা জানি যে, আমরা জানি না...
প্রদর্শ কলা, শিল্পের দায়, আমাদের ব্রত
.
আমাদের প্রচেষ্টা যখন আমরা শুরু করেছি, ততক্ষণে বাংলাদেশের নাটকের ‘স্তর বিবর্তন’ ঘটেছে বেশ। সঙ্গীতের ধারা বিবর্তন হয়েছে। একই কথা চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রেও সত্য। এই বিবর্তন যতটা আঙ্গিক, ততটাই ভাবগত। পাশ্চাত্যের নন্দনে ও অলংকারে সজ্জিত হয়েছে আমাদের শিল্প নানাভাবে কিন্তু প্রাচ্যের প্রজ্ঞা থেকে দিনে দিনে ঠিক ততটাই যেন দূরে সরে দাঁড়িয়েছে। শিল্পের আবার প্রজ্ঞা কি? শিল্প মাত্রেরই প্রজ্ঞার সম্পর্ক থাকে। প্রদর্শ-কলা, যা শিল্পের বাহ্যিক প্রকাশ, শিল্পের প্রজ্ঞা সেই প্রকাশে যতটা সম্ভব মূর্ত হয়ে ধরা দেয়। প্রজ্ঞাহীন যে শিল্প, তার প্রকাশে, শিল্প হয় বিকৃত এবং বিক্রিত। তাহলে শিল্পের দায় কোথায় গেলো? সার্বজনীনতার নামে নির্দায় কিংবা নির্মেরু শিল্প সাময়িক ভোগের প্রয়োজন পূরণ করতে পারে কিন্তু তার সত্যিকার সার্বজনীন উপভোগ্যতা কই? আমাদের বিবেচনায় প্রদর্শ-শিল্প নির্দায় হতে পারে না। বহুদিনের বিনা ব্যবহারে ঐতিহাসিক তাত্ত্বিক যে ফাঁক এখানে সৃষ্টি হয়েছে, আমরা তা অনুভব করতে পারছি। তার অনুসন্ধানই আমাদের ব্রত। আমরা দেখেছি, সমাজের মননশীল মানুষের এক বৃহৎ অংশ অনেকতর রূপে শিল্পের ‘প্রদর্শকলা’ (Performing art)-এর যুক্তিতে নিবিষ্ট। আমাদের বিশ্বাস মানুষের মনোগ্রন্থির এই শৃঙ্খলটিকে অবজ্ঞা না করে তার কল্যাণ উপযোগ প্রশ্রয় ও পরিচর্যায় ও সভ্যতার কাম্য পরিবর্তনে ভূমিকা রাখা সম্ভব।
.
.
শিল্পের জন্য শিল্পের রিফরমেশন
.
.
আমরা স্বপ্ন দেখি, ঐতিহ্যকে পুনরুদ্ধারের। সেখানে নির্মাণ, বিনির্মাণ, সংগঠন, সংস্করণ, সন্ধানের মিশেলে সম্ভব হবে সভ্যতার কাম্য পরিবর্তন। আড় ভাষায় কেউ ব্যাখ্যা খুঁজতে চেষ্টা করতে পারেন। পড়ে-পড়ে, তথ্যে-তত্ত্বে দার্শনিক হয়ে উঠা ক’একজন পুঁছ করতে পারেন, “আপনাদের রিফরমেশনটা কি? তার আগে ফর্মটা কি?” আমরা নড়েচড়ে বসি। আমাদের শিল্পকে প্লেটো, ফুয়েরবাখ, র্মাক্স আর হেগেলের দর্শন দিয়ে ধর্ষণ চেষ্টায় কিছুটা বিড়ম্বিত হই। সারাদিন ঝিমিয়ে ঝিমিয়ে তথ্যসমৃদ্ধ তত্ত্ব কপচানোর পর যারা অ্যারাবিয়ান বা ইউরোপিয়ান কান্ট্রিগুলোর অনুদানের ভর্তুকির টাকার চালগুলো নিশ্চিন্তে গিলতে যান, তাদের অযোগ্য ইনফরমেটিভ থিওরীগুলোর ভেতরের অবিশুদ্ধ নিয়ত ঠাহর করি। পালকী আমাদের ঐতিহ্য, তাই রাস্তা থেকে রিক্সাগুলো তুলে দিয়ে ছয়বেহারার পালকী চালু করা উচিত কি? আমাদের ক্ষুদ্র অভিজ্ঞতা বলে যে, তত্ত্বে, তথ্যে আর বাস্তবে অনেক ফারাক। শিল্পের কোন প্রমিত আদর্শ রূপ থাকে না, বরং উৎকর্ষতা থাকে, প্রচলিত প্রদর্শ-শিল্প’র একটা রিফরমেশন প্রয়োজন এটা আমরা উপলব্ধি করি। এই রিফরমেশন ভাষায়, বিষয়ে, ভাবনায় এবং নিয়তে। ঐতিহ্য রক্ষার নামে মধ্যযুগে ফিরে যাওয়া এই শিল্পচর্চার উদ্দেশ্য নয়। তাহলে এই রিফরমেশনের স্বরূপটা কি? আগে থেকে তার কিছুই বলা যাবে না। তার কারণ এটা একটা প্রায়োগিক এবং ব্যবহারিক জায়গা। সমাজ, রাজনীতি, জনগণ, অর্থনীতি, রাষ্ট্রের কর্ণধার, ক্ষমতার বিবর্তন, ধর্ম এসব থেকে তা (রিফরমেশন) নিরাবেগ, নিস্পৃহ এবং নির্মোহ থাকবে না, এতটুকু বলতে পারি। তাই এই রিফরমেশন রেভুলুশন হতে পারে, ডিফরমেশন কিংবা ডিকনস্ট্রাকশন কিংবা অন্য কিছুও হতে পারে।
.
.
নিছক শিল্পের জন্য শিল্পচর্চা আর মাঝ নদীতে মাঝিবিহীন ময়ূরপঙ্খী নৌকা এ দুইয়ের মধ্যে খুব একটা পার্থক্য নেই। রাষ্ট্র পারিপার্শ্বিকতা শিল্প জরুরী অবস্থা, ধর-পাকড়, দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল, সাজা, সাজাপ্রাপ্ত আসামীদের জামিনে বেরিয়ে আসা, বিডিআর-নাসাকার মুখোমূখী অবস্থান-সেক্টর কমান্ডারদের নিরবতা, বিদ্রোহের ছদ্মনামে সামরিক বাহিনীতে হত্যাযজ্ঞ, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়ার ধীর গতি রাষ্ট্র সংবিধান এবং ন্যায় বিচারের ঘোরতর দূর্দিনে শিল্প তার শিল্পের চর্চায় ব্যস্ত থাকে। এহেন পারিপার্শ্ব অস্পৃশ্যতা আমাদের পীড়া দেয়। কিন্তু এহেন অস্পষ্ট সময় শিল্পের আরো, আরো স্পষ্ট চেতনা দাবী করে। এ রকম ঘোর সংকটে নিছক শিল্পচর্চা আর সত্যকে পাশ কাটিয়ে যাওয়া, একই কথা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর কালে কোন রাষ্ট্রের পক্ষে অন্য কোন স্বাধীন রাষ্ট্র দখল করে উপনিবেশ স্থাপন করা সম্ভব নয়। কিন্তু কোন স্বাধীন রাষ্ট্রের উপর রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে নয়া উপনিবেশ ঠিকই সম্ভব। আমরা এখন শঙ্কিত: নতুন কোন পলাশী দরজায় কড়া নাড়ছে না তো!
.
.
রাষ্ট্র শিরোনামে দুঃখজনক হলেও সত্য, আমরা আমেরিকা, ভারত কিংবা ইউরোপের না হয়ে, হয়েছি বাংলাদেশী। এ দুঃখের উৎস বাংলাদেশী হওয়ায় নয়, বরং বাংলাদেশকে ভালোবাসায়। তাই এই প্রচেষ্টা নিঃস্বার্থ নিরাবেগ নিঃশঙ্ক এবং নিঃসাহসী নয়।
.
.
প্রসঙ্গঃ লোকযাত্রা
.
.
আমাদের উপরোক্ত উপলব্ধি এবং তৎসঞ্জাত সক্রিয়তা কেবল আমাদের নিজেদের জন্য নয় (নব্য একটি স¤প্রদায়, পার্টি, গোষ্ঠী হিসেবে আত্মপ্রকাশ আমাদের উদ্দেশ্য নয়), এর প্রকাশ ও বিস্তার চাই আমরা সাধারণ মানুষের মধ্যে। লোকযাত্রা আমাদের এবং পাঠকের যোগাযোগ মাধ্যম। বলাবাহুল্য, লোকযাত্রা-কর্মীবৃন্দ সকলে থিয়েটার কর্মী। তাই এতে প্রকাশিত লেখাগুলো থিয়েটারের প্রতি অনিচ্ছাকৃত পক্ষপাতদুষ্ট হতে পারে। তবে লেখক-পাঠকদের সহযোগিতা আমাদের এই দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করবে।
.
.
প্রসঙ্গত: লোকযাত্রা নামটি এবং Performing art এর বঙ্গানুবাদ ‘প্রদর্শ কলা’ করে দিয়েছেন কবি সৈয়দ আহমদ শামীম, তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা। নিবেদন পরিশেষে নিবেদন, আমরা কারা? যারা জানে যে, তারা জানে না আমরা তাদের নবীন সহযাত্রী।
.
.
বিনীত মাসউদুর রহমান
সাইফ শাওন
সাইফ শাওন
জুন ২০০৯
সূচি
.
সাম্প্রতিক নাটকের একটি সমস্যা
ঋত্বিককুমার ঘটক
.
অচলায়তনে পাণ্ডুলিপির সচল আড্ডা
সাইফ শাওন
.
বাংলাদেশের নাটক : ক্ষুদ্রের পর্যবেক্ষণ
রাফসান গালিব
.
সংগীত অথবা অকূল সমুদ্দুরে অবগাহন
ওয়াহিদ সুজন
সূচি
.
সাম্প্রতিক নাটকের একটি সমস্যা
ঋত্বিককুমার ঘটক
.
অচলায়তনে পাণ্ডুলিপির সচল আড্ডা
সাইফ শাওন
.
বাংলাদেশের নাটক : ক্ষুদ্রের পর্যবেক্ষণ
রাফসান গালিব
.
সংগীত অথবা অকূল সমুদ্দুরে অবগাহন
ওয়াহিদ সুজন
অচলায়তনে পাণ্ডুলিপির সচল আড্ডা
অচলায়তনে পাণ্ডুলিপির সচল আড্ডা
গত সেপ্টেম্বরের এক বিকালে আই আর এ টি কার্যালয়ে ‘নাটকের পাণ্ডুলিপি বিশেষণ’ শীর্ষক একটি আড্ডা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে উপস্থিত ছিলেন রাফসান গালিব, সাইফ শাওন, মাহফুজুর রহমান, মঈদ উদ্দীন তৌহিদ ও মাসউদুর রহমান। সেই আড্ডার উপর ভিত্তি করে এ লেখাটি লিখেছেন সাইফ শাওন।
.
রোজামুখে উদরশূন্য আলোচনা শিল্পীর কাছে শিল্পচর্চা করা হলো নেশা। আর এই নেশা পূরণের জন্য সে যে কোন ত্যাগ স্বীকার করতে প্রস্তুত থাকে। এই উপলব্ধি যার ভেতর আসে হয়তো সে-ই হলো প্রকৃত শিল্পী। কিন্তু সবাই কি প্রকৃত শিল্পী হতে পারে? কেউ শিল্পচর্চাকে বেছে নিয়েছে বিলাসিতার অন্যতম মাধ্যম হিসেবে। তার কাছে শিল্পচর্চা হলো এক প্রকারের বিলাসিতা। বর্তমানে শিল্পচর্চা হলো কারো কাছে পেশাদারিত্বের, কারো কাছে সময় কাটানোর মাধ্যম। তাই এই বাজারে সৃজনশীল কিছু চিন্তা করাটা হাস্যকর ব্যাপার... এ রকম কিছু আলাপ আলোচনার মধ্য দিয়েই আমরা ক’জন উপলব্ধি করলাম আমরা শিল্প, বিশেষতঃ ‘প্রদর্শ’ শিল্প নিয়ে আড্ডা দেবো।
.
আমাদের বিবেচনায় একজন আদর্শ থিয়েটার কর্মীকে অনেক যোগ্যতার অধিকারী হতে হয়। এর মধ্যে অতি গুরুত্বপূর্ণ হলো স্ক্রীপ্ট বিশে ষণের যোগ্যতা। এই বিশেষণ যতটা ব্যাকরণ নির্ভর তার চেয়ে বেশী সৃজনশীল। যেহেতু আমরা সবাই থিয়েটার কর্মী তাই এ বিষয়েই আমাদের প্রথম আড্ডাটা আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেয়া হলো। আলোচনার সুবিধার্থে আমরা হাতে নিলাম দু’টি স্ক্রীপ্ট। একটি হলো রবীন্দ্রনাথের‘অচলায়তন’ এবং অন্যটি আন্তন চেখভের ‘প্রতিশোধ’। আমরা ঠিক করলাম আজ এই স্ক্রীপ্টগুলো পড়বো আর আলোচনা করবো। তবে যেহেতু রোজার মাস সেহেতু ইফতারটা একসাথেই করতে হয়। তাই ঠিক হলো প্রত্যেকে চাঁদা দিয়ে ইফতারের আয়োজন হবে (যদিও চাঁদা আদায় করতে অনেক কষ্ট হয়েছিল)।
.
যাই হোক, শুরু হলো অচলায়তন পড়া। সবাই পড়ছে খুব মনোযোগ দিয়ে। চার দেয়ালে বদ্ধ ঘরটাতে অল্প সময়ের মধ্যেই গভীর নিরবতা নেমে এলো। কিছুক্ষণের জন্য পাঁচজন মানুষ যেন একান্ত একাকী ‘স্থবিরপত্তন’ রাজ্যের শ্রীবিদ্যানিকেতন ‘অচলায়তন’-এ ধ্যানমগ্ন হলাম। দাদাঠাকুরের সাথে পাহাড়ে, দর্ভকপল ীতে ঘুরে বেড়াতে লাগলাম...
.
এ সময় এক কাপ চা হলে মন্দ হতো না,’ ঙ নিরবতা ভাঙলো। কথাটা শুনে মনে পড়লো এতক্ষণ আমরা পাঁচজন একসাথে একটা রুমে আছি। গ বেচারা খুব মনোযোগ দিয়ে পড়ছিল, তাই অভিমানের সুরে বলে উঠলো, ‘নিরবতাটা ভালোই উপভোগ করছিলাম’। ‘আমরা মনে হয় এবার আলোচনা শুরু করতে পারি’- খ এর প্রস্তাবে সমর্থন দিয়ে ঙ বলল, ‘হ্যাঁ, ক কে দিয়েই শুরু করা যাক। তবে তার আগে একটু বলে নিই, আমরা আমাদের আজকের আলোচনাকে দুই ভাগে ভাগ করবো। প্রথম অংশে আমরা সবাই যার যার আলোচনা উপস্থাপন করবো এবং দ্বিতীয় অংশে তর্ক-বিতর্ক এবং একে অন্যের আলোচনা নিয়ে কথা বলবো।’
.
পরীক্ষাগারে পাণ্ডুলিপির ব্যবচ্ছেদ শুরু
.
ক শুরু করল ‘আসলে আমি অতটা পড়–য়া মানুষ নই। তারপরও যতটুকু উপলব্ধি করি তা হলো পাণ্ডুলিপি বিশে ষণের জন্য একটি নাটকের পটভূমি জানাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমাদেরকে জানতে হবে একটি নাটকের সময়কাল। প্রতিটি নাটকই কোন না কোন ঘটনার বর্ণনা। তাই নাটকের পটভূমি জানতে পারলে তার ঘটনা বোঝাটা অনেক সহজ হয়ে যায়। তবে পটভূমি জানার চাইতে ‘উপলব্ধি’ করা জরুরি। যেমনঅচলায়তন নাটকটি এমন একটি পটভূমিতে রচিত যার অস্তিত্ব রবীন্দ্রনাথের কল্পনারাজ্যে, দেখে, অভিজ্ঞতা নিয়ে যা জানা সম্ভব নয় কিন্তু উপলব্ধি করা সম্ভব। নাটকটির পটভূমি এমন এক বিদ্যায়তনে যে বিদ্যায়তন সব দিক থেকে আবদ্ধ, বাইরের বাতাসও যেখানে ঢুকতে দেয়া হয় না। আবার প্রতিশোধ নাটকটি রুশ পটভূমিতে ঊণবিংশ শতকের সময়কালকে প্রতিনিধিত্ব করে, বই ঘেঁটে, পড়াশোনা করে সেই সময়কাল ও পটভূমিকে জানা সম্ভব। এরপর দেখতে হবে নাটকটি কোন ভাষায় রচিত। অর্থাৎ নাটকের ভাষা কেমন। তা আঞ্চলিক হতে পারে আবার শুদ্ধ বাংলায়ও হতে পারে। তারপর চরিত্র নিয়ে ভাবতে হবে। এছাড়াও নাটকটি ঠিক কি ধরণের নাটক সে বিষয়টি বিবেচনায় রাখতে হবে। এভাবে খণ্ড খণ্ড ভাবে একটা পাণ্ডুলিপি নিয়ে কাজ করতে পারলে মোটামুটিভাবে একটা নাটক সম্পর্কে ভাল করে ভাবতে পারা যায়’ ক থামলো।
.
আলোচনা অনেকটা আনুষ্ঠানিক নিয়মে আবর্তিত হচ্ছিল। এবারে চাকা এসে থামলো খ এর কাছে। সে শুরু করলো ‘ধন্যবাদ ক কে। অনেক কথাই চলে আসলো নাটকের পাণ্ডুলিপি সম্পর্কে। কিন্তু আমি ব্যক্তিগতভাবে কিছু ব্যাপার অনুভব করি। প্রথমত, নাটক নির্বাচনটা অবশ্যই সময়োপযোগী হতে হবে এবং নির্বাচনের সময় নাট্যকারের মানসিক দিকটা বিশে ষণ করতে হবে। আমরা সবাই নাটক করি এবং বিভিন্ন নাটক পড়ি। কিন্তু সব নাট্যকারকে অনেকেই চিনি না, তাদের ব্যক্তিগত বোধ, বিশ্বাস কি তা জানি না। যদি নাট্যকারের জীবনী সম্পর্কে ভাল ভাবে জানতাম তাহলে হয়তো আরো ভালো করে নাটকটাকে উপলব্ধি করতে পারতাম। তাই আমি ব্যক্তিগতভাবে অনুভব করি যে, একটি নাটককে ভালো করে উপলব্ধি করতে চাইলে নাট্যকারের জীবনী নিয়েও আমাদের পড়াশোনা করা উচিৎ। তাহলে অন্তত নাটকের পরিপ্রেক্ষিত ও পটভূমি সম্পর্কে পাশাপাশি নাটকের মূল থিম সম্পর্কে সঠিক ধারণা পাওয়া সম্ভব। দ্বিতীয়ত, নাটক অনুবাদ করার সময় যেন মূল আবেদনের কোন পরিবর্তন না হয়ে যায়। কেননা নাটকের মাধ্যমে নাট্যকারের মূল আবেদন দর্শকদের কাছে তুলে ধরতে হবে। আরেকটি যে বিষয় আমাদের গুরুত্ব সহকারে চিন্তা করা উচিৎ তা হলো, কোন নাটক মঞ্চস্থ করার আগে নির্দেশকের উচিৎ সহশিল্পীদের কাছে সেই নাটকটি ভাল করে বিশে ষণ করা। তাহলে অভিনেতা অভিনেত্রীরা অনেক কিছু ধারণা পায় এবং তখনই তারা নির্দিষ্ট চরিত্রটা নিজের ভেতর ফুটিয়ে তুলতে পারে সহজে। আমি আপাতত এখানে বিরতি দিচ্ছি।’
.
পুরো আলোচনায় অনেকটা অদৃশ্য শ্রোতার মত অবস্থান করা ঘ নড়ে চড়ে বসলো। খ ইতি টানতেই অনেকটা তাড়াহুড়া করেই শুরু করলো, ‘আমি একটু আগেই বলে ফেলি। যদিও এখন আমার পালা নয়। কারণ আমি দেখতে পাচ্ছি, আমার কথাগুলো সব অন্যরা আগে আগে বলে বাসি করে দিচ্ছেন।
.
কথার শুরুতে জানার পরিধির সীমাবদ্ধতার কথা অকপটে স্বীকার করছি। এতক্ষণ পর্যন্ত যে আলোচনা হলো এবং আমার যতটুকু উপলব্ধি তার উপর ভিত্তি করে মোটা দাগে যে বিষয়গুলোর কথা বলতে পারি- চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য, নাটকের পটভূমি, সময়কাল, ভাষারীতি, নাটকের মূল আবেদন বা সুর ইত্যাদি। নাটকের চরিত্রগুলোকে বোঝা মানে হলো নাটকের সংলাপে যে ইঙ্গিত পাওয়া যায় তার ভিত্তিতে পুরো চরিত্রটিকে বা মানুষটিকে কিভাবে সৃষ্টি করা যায় তার কৌশল। শরীর এবং মন দিয়ে সে চরিত্রটিকে উপলব্ধি করতে হয়। এরপর যেটা যোগ করতে চাই, সেটা হলো নাটকে আমাদের স্বাভাবিক সত্ত্বার বাইরে অন্য এক সত্ত্বাকে নিজের মধ্যে ধারণ করি অভিনয় বা চরিত্রের প্রয়োজনে। উদাহরণস্বরূপ, যদি কেউ প্রতিশোধ নাটকের ফিওডর সিগায়েফ এর ভূমিকায় অভিনয় করে তখন সে তার নিজের মুখোশটা নামিয়ে ফিওডরের মুখোশটা পরে। আসলে নামিয়েও ঠিক রাখে না, পুরোটা আসলে নামানো যায় না, মূলত অভিনেতা তার নিজের মুখোশের উপর ফিওডরের মুখোশটি চাপিয়ে দেয়। তাই আমার কাছে অভিনয় হলো পরোক্ষ অর্থে মুখোশ পরা। আর পাণ্ডুলিপির ক্ষেত্রে একটা কথা আমার মনে হয়, নির্দেশক চাইলেই সময়োপযোগীতার বিচারে পাণ্ডুলিপির কোন অংশ পরিবর্তন বা পরিমার্জন করতে পারেন। তবে এতে নাট্যকারের মূল বক্তব্য যাতে ফিকে না হয়ে যায় সেদিকেও লক্ষ্য রাখা দরকার মনে করি।’ এই পর্যন্ত এসে ঘ থামলো। এবার গ এর পালা। সে শুরু করলো।
.
আমি প্রথমেই সবাইকে ধন্যবাদ জানাই এত সুন্দর সুন্দর আলোচনা তুলে ধরার জন্য। তার পাশাপাশি বলে রাখতে চাই এসব বিষয়ে আমার জ্ঞানটা অনেক সীমিত। আমি এ বিষয় চর্চা করছি অল্প কিছুদিন ধরে। আসলে রবীন্দ্রনাথের অচলায়তন পড়ে আমি খুবই মুগ্ধ। রবীঠাকুরের লেখা পড়লেই বুঝা যায় তিনি কেন বিশ্বসেরা। অচলায়তনও তেমন একটি নাটক। তার নাটকটিতে ধর্মীয় গোঁড়ামির কথা সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে। আর ‘অচলায়তন’ নামের এই বিদ্যায়তনটি সেই ধর্মীয় গোঁড়ামির বিষয়টিই মনে করিয়ে দেয়। নাটকের মূলসুরও বোধহয় এই ধর্মীয় গোঁড়ামির বিরোধিতা। একটা ব্যাপার যেটা এই নাটকটাতে উঠে এসেছে, স্রষ্টার সাথে সৃষ্টির সম্পর্কটা কোন নিয়ম মেনে চলে না। নিয়ম মেনে কারুর আধ্যাত্মিক উৎকর্ষতাও সম্ভব নয়। যেটা দাদাঠাকুরের বেলায় সত্য আবার অচলায়তনের আচার্য, উপাধ্যায়, মহাপঞ্চককে ছাড়িয়ে সেটা সাধারণ এক ছাত্র পঞ্চকের বেলায়ও সত্য। আর তার পক্ষে এটা সম্ভব হয়েছে মূলত অচলায়তনের নিয়ম ভেঙ্গে বেরিয়ে আসতে পারার কারণে। নাটকটির আলোচনায় এই বিষয়টিও আসা উচিৎ মনে করি। আবার নাটক পড়ার সময় আমাদের লক্ষ্য রাখা উচিৎ, নাটকটির উপর বিশ্বসাহিত্যের কোন প্রভাব আছে কিনা। আরেকটি বিষয় আমি বলব, যদিও অপ্রাসঙ্গিক, তাহলো, শিল্পের জন্য শিল্পচর্চা এ বিষয়টা আমাদের বাদ দেয়া উচিৎ। প্রতিটি নাট্যকর্মীকে চিন্তা করতে হবে শিল্পচর্চার মাধ্যমে তার দর্শকের মাঝে কোন বার্তা পৌঁছে দেয়া। অনেক পরিশ্রম, অর্থ ব্যয় করে যদি এমন কোন প্রযোজনা করা হয় যা সত্যিকার অর্থে সাধারণ মানুষের কোন কাজে না লাগে বা সামাজিক কোন সমস্যা বা সম্ভাবনার কোন নির্দেশ থাকবে না, দর্শকের মনে কোন উৎসাহ বা প্রেরণা সৃষ্টি হবে না, এমন কোন প্রযোজনার আদৌ প্রয়োজন আছে বলে আমি মনে করি না।’
.
আলোচনা খুব সুন্দর ও ভাবগাম্ভীর্যের সাথে এগিয়ে যাচ্ছে। ভাবছি, এরকম আনুষ্ঠানিকতারও প্রয়োজন আছে। এমনি এমনি সবাই মিলে কত আড্ডা দিয়ে বেড়াই, অথচ এই আড্ডাতে একটা আনুষ্ঠানিকতা থাকায় কত সুন্দর সুন্দর আলোচনার সৃষ্টি হচ্ছে, আবার অনেক বিষয়ও খুব গুরুত্বের সাথে উঠে আসছে। এরই মধ্যে গ তার কাগজপত্র ঘাটতে ঘাটতে বলে উঠলো, ‘ যে কোন নাটকের পাণ্ডুলিপিতে হাত দেয়া কতটা যুক্তিসঙ্গত। নির্দেশক চাইলেই কি নাটকের স্ক্রীপ্টে হাত দিতে পারে কিনা এ ব্যাপারে প্রশ্ন থাকলো।’
.
মূল আলোচনায় এবার সব শেষ পালা ঙ এর। অনেকক্ষণ সে চুপচাপ সবার কথা শুনছিল এবং নোট করছিল কিছু কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যাই হোক, অত্যন্ত আনন্দভরা চেহারায় শুরু করলো, যেন খুব মজা পাচ্ছে সে সবার আলোচনায়। ‘ আসলে খুব ভালো লাগছে এরকম আড্ডায় বসে আলোচনা শুনতে। অনেক কথাই চলে এসেছে তাই আমি সংক্ষেপে কিছু কথা বলেই আমাদের আলোচনার দ্বিতীয় অংশে চলে যাব। একটি নাটকের পাণ্ডুলিপি বিশ্লেষণের জন্য প্রথমেই যা প্রয়োজন, তা হলো পাণ্ডুলিপির প্রাসঙ্গিকতা বিচার করা, এতেই নাটকের পটভূমি হতে শুরু করে অন্যান্য বিষয়গুলো চলে আসে। এরপর নাটকের উৎস বিচার করা, পরিণাম ও ফলাফল এবং নাটকের ভাষা নিয়ে চিন্তা করা। আমার মনে হয় এসব মাথায় রেখেই একটা পাণ্ডুলিপি হাতে নিলে চলে।
.
যাই হোক আলোচনার দ্বিতীয় অংশটা আমি ক এর কথা ধরেই শুরু করছি। একটা নাটক কি ধরণের তা বিচার করার কথা ক অনেক পরে বলেছে। কিন্তু আমি মনে করি, কি ধরণের নাটক অর্থাৎ সেটা কি রিয়ালিস্টিক, ন্যাচারালিস্টিক না থিয়েট্রিকেল অথবা অ্যাবসার্ড, সেটা সবার আগেই বিবেচনায় রাখতে হবে। তাহলে নাটকটা নিয়ে কাজ করতে অনেক সুবিধা হয়। যেমন, অচলায়তন নাটকটিতে যে শ্রীবিদ্যানিকেতন অচলায়তনের কথা বলা হচ্ছে, সে রকম কোন বিদ্যালয় আমরা বাস্তবে দেখি না, আইডিয়াটা অ্যাবসার্ড এবং রূপক, গ এর কথাই ঠিক, অচলায়তন বিদ্যালয়টি আসলে ধর্মীয় গোঁড়ামির প্রতিনিধিত্ব করে। কিন্তু সত্যিকার অর্থে আমার কাছে মনে হয় যে, তারপরেও এর মধ্যে একটা রিয়ালিস্টিক আবহ আছে। এর সেট, এর গুরু-শিষ্যদের পোষাক পরিকল্পনায় বাস্তববাদের ছোঁয়া অবশ্যই থাকা প্রয়োজন। ইওরোপিয় অ্যাবসার্ড নাটকের মতো পোশাকেও অ্যাবসার্ডিটি আসবে না। এই জায়গাতে এসে নাটকটি অ্যাবসার্ড হয়েও অ্যাবসার্ড না আবার রিয়েলিস্টিক হয়েও রিয়েলিস্টিক না। আবার কেন জানি দু’টির মিশেলও বলতে পারছিনা। আরেকটা ব্যাপার লক্ষ্য করার মতো এই নাটকে। তা হলো নামগুলো। যেমন রাজ্যের নাম স্থবিরপত্তন, রাজার নাম মন্থরগুপ্ত, বিদ্যায়তনের নাম অচলায়তন ইত্যাদি নামগুলো কিন্তু নাটকের মূল থিমকেই নির্দেশ করছে ধর্মীয় গোঁড়ামি। এর সাথে আমরা ইওরোপিয় নাটকের প্রথম দিককার যে গড়ৎধষরঃু চষধু -এর প্রচলন ছিল তার একটা মিল পাই, যেখানে চরিত্র ও পটভূমির নাম হতো মানুষের গুণ বা দোষের নামে। অর্থাৎ কোন চরিত্রের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ভাল হলে তার নাম হতো ভাল গুণের নামে, খারাপ হলে খারাপ গুণের নামে। যেমন, কোন নাটকের নায়কের নাম হয়তো ছিল গধহশরহফ বা মানবতা, তাকে আক্রমণকারী খলনায়কের নাম হতো ঈড়হভষরপঃ বা সংঘাত। এর মধ্যেই নাটকের মূল থিমের একটা সংকেত দেয়া থাকে। অচলায়তন নাটকটি অনেকটা সে রকম গড়ৎধষরঃু চষধু ধাঁচের।
.
গ এর কথাটা একটু বলি, সে নাটকের স্ক্রীপ্টে হাত দেয়া নিয়ে একটা কথা বলেছিল। আসলে নাটকের স্ক্রীপ্টে হাত দেয়া যেন তেন কথা নয়। এখানে নিরপেক্ষতার প্রসঙ্গটা চলে আসে। লেখকের মূল বক্তব্যের ব্যাপারে একশ’ ভাগ নিরপেক্ষ না থাকলে নাট্যকারের উপর অবিচার হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তবে সংলাপ, বক্তব্য এবং ভাবকে বোধগম্য করার জন্য স্ক্রীপ্টে হাত দেয়া যেতে পারে বলে আমি মনে করি। কিন্তু খেয়াল রাখতে হবে যাতে নাট্যকারের মূল দৃষ্টিভঙ্গি এবং আবেদনটা পরিবর্তন হয়ে না যায়। আর নাটকের একটা চরিত্রের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের ব্যাপারে সবাই বলেছে। আসলে একটি চরিত্রের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য কি তা নিরূপন করার চাইতে কি হওয়া উচিৎ তা বিবেচনায় রাখা দরকার।
.
খ একটা বিষয়ের অবতারণা করেছিল নাট্যকারের জীবনী জানার ব্যাপারে। আসলে আমার মনে হয়, একজন অভিনেতার সব নাটকের পাণ্ডুূলিপি বিশে ষণের জন্য নাট্যকারের জীবনী খুব বেশি জানার প্রয়োজন নেই। তবে নাটকের সাহিত্যমান বিশেষণের জন্য সেটা একটা দিক হতে পারে।’ এটুকু বলেই ঙ থামলো।
.
এবার ক শুরু করলো, ‘খ যে প্রসঙ্গটা উত্থাপন করেছে, সে প্রসঙ্গে বলি, নাটক নির্বাচনে নাট্যকারের মানসিক দিক বিচার করতে গেলে অনেকের নাটকই হয়তো গ্রহন করা যাবে না। তাই আমাদের বোধহয় একজন ব্যক্তির সৃষ্টিটা কতটুকু গ্রহনযোগ্য তা বিচার করেই নাটক নির্বাচন করা দরকার। আর গ এর কথা ধরে বলতে চাই, শিল্পের জন্যই শিল্পচর্চা করা উচিৎ বলে আমি মনে করি। দর্শকের কাছে নাটকের মাধ্যমে কোন না কোন বার্তা পৌঁছে যাবে, সেটা স্বাভাবিক। যেহেতু একদল শিল্পী নাটকের মাধ্যমে সেই বার্তা পৌঁছে দেবে, সেহেতু এখানে শৈল্পিকতার প্রয়োজন আছে। তাই এই শৈল্পিকতা তৈরীর জন্যই শিল্পচর্চা করতে হবে।’ ঙ দ্বিমত পোষণ করে বলল, ‘না, না, এটা ঠিক না। প্রত্যেক শিল্পেরই কোন না কোন উদ্দেশ্য আছে এমনটা যদি ধরে নেওয়া হয়, তাহলে এর আড়ালে মূলত শিল্পকে উদ্দেশ্যহীন করে ফেলা হয়। শিল্পের যিনি স্রষ্টা অর্থাৎ লেখক, যিনি শিল্পের বাহক অর্থাৎ শিল্পী, তাঁরাই যদি তার উদ্দেশ্যকে সঠিকভাবে বুঝতে না পারেন বা নির্দেশ করতে না পারেন বা সৃষ্টির মূহুর্তে যদি উদ্দেশ্যহীনভাবেই শিল্পের যাত্রা শুরু হয় তাহলে দর্শকের কাছে তা আর কি-ই বা বার্তা নিয়ে যাবে। শিল্পচর্চার জন্য তাই নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য থাকতে হবে। তাহলে তার যাত্রা, উৎকর্ষতার গতি একটি নির্দিষ্ট দিকে হবে, তাই না। যাই হোক, আমরা অনেকক্ষণ আলোচনা করেছি। এখন কারো যদি বিশেষ কোন কথা না থাকে তো, আমরা শেষ করতে পারি।’ সবাই আলোচনা শেষ করার প্রস্তুতি নিলাম।
.
সোনার ফসল তুলি
.
একটি নাটকের পাণ্ডুলিপি বিশে ষণ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। পাণ্ডুলিপি বিশে ষণ হতে পারে বিভিন্ন আঙ্গিকে পরিচালক, অভিনেতা, লাইট এবং সেট ডিজাইনার প্রত্যেকের বিশে ষণটা হতে হবে নিজ নিজ কর্মক্ষেত্র এবং দৃষ্টিভঙ্গিকে কেন্দ্র করে। কিন্তু সবদিক থেকে চিন্তা করলে, পাণ্ডুলিপি বিশে ষণের জন্য অবশ্যই করণীয় কিছু বিষয় পাওয়া যায়-
.
১. প্রথমেই এটি কোন ধরণের নাটক, নাটকের প্রাসঙ্গিকতা, পটভূমি ও সময়কাল বিবেচনা করা উচিৎ।
২. নাটকটির উৎস বিচার করতে হবে। তা মঞ্চায়নের জন্য সময়োপযোগী কিনা, দেখতে হবে।
৩. প্রত্যেকটি নাটকই কোন না কোন ঘটনার বর্ণনা। তাই পাণ্ডুলিপি পড়তে গেলে ঘটনার বর্ণনা ভালভাবে বিশে ষণ করতে হবে।
৪. পরিণাম বা ফলাফল সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা জন্মাতে হবে। একটি নাটকের পরিণাম পুরো নাটকের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করে দেয়।
৫. নাটকের ভাষা নিয়ে চিন্তা করা।
৬. একটি নাটকের সংলাপ পড়ে, তার আঙ্গিক থেকে সহজেই বুঝে নেয়া যায় নাটকের চরিত্র কেমন হবে। চরিত্রের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য সেখান থেকেই খুঁজে নিতে হবে।
.
নাটক মূলত কোন রাষ্ট্র, সমাজ বা জনগোষ্ঠীর অবয়ব বা আয়না। তাই নাটকের মূল আবেদনকে উপলব্ধি করতে হলে প্রয়োজন গভীর অধ্যয়ন, একই সাথে বিশেষণ। অন্যথায় ভুল বুঝার সম্ভাবনাই বেশি থাকে।
গত সেপ্টেম্বরের এক বিকালে আই আর এ টি কার্যালয়ে ‘নাটকের পাণ্ডুলিপি বিশেষণ’ শীর্ষক একটি আড্ডা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে উপস্থিত ছিলেন রাফসান গালিব, সাইফ শাওন, মাহফুজুর রহমান, মঈদ উদ্দীন তৌহিদ ও মাসউদুর রহমান। সেই আড্ডার উপর ভিত্তি করে এ লেখাটি লিখেছেন সাইফ শাওন।
.
রোজামুখে উদরশূন্য আলোচনা শিল্পীর কাছে শিল্পচর্চা করা হলো নেশা। আর এই নেশা পূরণের জন্য সে যে কোন ত্যাগ স্বীকার করতে প্রস্তুত থাকে। এই উপলব্ধি যার ভেতর আসে হয়তো সে-ই হলো প্রকৃত শিল্পী। কিন্তু সবাই কি প্রকৃত শিল্পী হতে পারে? কেউ শিল্পচর্চাকে বেছে নিয়েছে বিলাসিতার অন্যতম মাধ্যম হিসেবে। তার কাছে শিল্পচর্চা হলো এক প্রকারের বিলাসিতা। বর্তমানে শিল্পচর্চা হলো কারো কাছে পেশাদারিত্বের, কারো কাছে সময় কাটানোর মাধ্যম। তাই এই বাজারে সৃজনশীল কিছু চিন্তা করাটা হাস্যকর ব্যাপার... এ রকম কিছু আলাপ আলোচনার মধ্য দিয়েই আমরা ক’জন উপলব্ধি করলাম আমরা শিল্প, বিশেষতঃ ‘প্রদর্শ’ শিল্প নিয়ে আড্ডা দেবো।
.
আমাদের বিবেচনায় একজন আদর্শ থিয়েটার কর্মীকে অনেক যোগ্যতার অধিকারী হতে হয়। এর মধ্যে অতি গুরুত্বপূর্ণ হলো স্ক্রীপ্ট বিশে ষণের যোগ্যতা। এই বিশেষণ যতটা ব্যাকরণ নির্ভর তার চেয়ে বেশী সৃজনশীল। যেহেতু আমরা সবাই থিয়েটার কর্মী তাই এ বিষয়েই আমাদের প্রথম আড্ডাটা আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেয়া হলো। আলোচনার সুবিধার্থে আমরা হাতে নিলাম দু’টি স্ক্রীপ্ট। একটি হলো রবীন্দ্রনাথের‘অচলায়তন’ এবং অন্যটি আন্তন চেখভের ‘প্রতিশোধ’। আমরা ঠিক করলাম আজ এই স্ক্রীপ্টগুলো পড়বো আর আলোচনা করবো। তবে যেহেতু রোজার মাস সেহেতু ইফতারটা একসাথেই করতে হয়। তাই ঠিক হলো প্রত্যেকে চাঁদা দিয়ে ইফতারের আয়োজন হবে (যদিও চাঁদা আদায় করতে অনেক কষ্ট হয়েছিল)।
.
যাই হোক, শুরু হলো অচলায়তন পড়া। সবাই পড়ছে খুব মনোযোগ দিয়ে। চার দেয়ালে বদ্ধ ঘরটাতে অল্প সময়ের মধ্যেই গভীর নিরবতা নেমে এলো। কিছুক্ষণের জন্য পাঁচজন মানুষ যেন একান্ত একাকী ‘স্থবিরপত্তন’ রাজ্যের শ্রীবিদ্যানিকেতন ‘অচলায়তন’-এ ধ্যানমগ্ন হলাম। দাদাঠাকুরের সাথে পাহাড়ে, দর্ভকপল ীতে ঘুরে বেড়াতে লাগলাম...
.
এ সময় এক কাপ চা হলে মন্দ হতো না,’ ঙ নিরবতা ভাঙলো। কথাটা শুনে মনে পড়লো এতক্ষণ আমরা পাঁচজন একসাথে একটা রুমে আছি। গ বেচারা খুব মনোযোগ দিয়ে পড়ছিল, তাই অভিমানের সুরে বলে উঠলো, ‘নিরবতাটা ভালোই উপভোগ করছিলাম’। ‘আমরা মনে হয় এবার আলোচনা শুরু করতে পারি’- খ এর প্রস্তাবে সমর্থন দিয়ে ঙ বলল, ‘হ্যাঁ, ক কে দিয়েই শুরু করা যাক। তবে তার আগে একটু বলে নিই, আমরা আমাদের আজকের আলোচনাকে দুই ভাগে ভাগ করবো। প্রথম অংশে আমরা সবাই যার যার আলোচনা উপস্থাপন করবো এবং দ্বিতীয় অংশে তর্ক-বিতর্ক এবং একে অন্যের আলোচনা নিয়ে কথা বলবো।’
.
পরীক্ষাগারে পাণ্ডুলিপির ব্যবচ্ছেদ শুরু
.
ক শুরু করল ‘আসলে আমি অতটা পড়–য়া মানুষ নই। তারপরও যতটুকু উপলব্ধি করি তা হলো পাণ্ডুলিপি বিশে ষণের জন্য একটি নাটকের পটভূমি জানাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমাদেরকে জানতে হবে একটি নাটকের সময়কাল। প্রতিটি নাটকই কোন না কোন ঘটনার বর্ণনা। তাই নাটকের পটভূমি জানতে পারলে তার ঘটনা বোঝাটা অনেক সহজ হয়ে যায়। তবে পটভূমি জানার চাইতে ‘উপলব্ধি’ করা জরুরি। যেমনঅচলায়তন নাটকটি এমন একটি পটভূমিতে রচিত যার অস্তিত্ব রবীন্দ্রনাথের কল্পনারাজ্যে, দেখে, অভিজ্ঞতা নিয়ে যা জানা সম্ভব নয় কিন্তু উপলব্ধি করা সম্ভব। নাটকটির পটভূমি এমন এক বিদ্যায়তনে যে বিদ্যায়তন সব দিক থেকে আবদ্ধ, বাইরের বাতাসও যেখানে ঢুকতে দেয়া হয় না। আবার প্রতিশোধ নাটকটি রুশ পটভূমিতে ঊণবিংশ শতকের সময়কালকে প্রতিনিধিত্ব করে, বই ঘেঁটে, পড়াশোনা করে সেই সময়কাল ও পটভূমিকে জানা সম্ভব। এরপর দেখতে হবে নাটকটি কোন ভাষায় রচিত। অর্থাৎ নাটকের ভাষা কেমন। তা আঞ্চলিক হতে পারে আবার শুদ্ধ বাংলায়ও হতে পারে। তারপর চরিত্র নিয়ে ভাবতে হবে। এছাড়াও নাটকটি ঠিক কি ধরণের নাটক সে বিষয়টি বিবেচনায় রাখতে হবে। এভাবে খণ্ড খণ্ড ভাবে একটা পাণ্ডুলিপি নিয়ে কাজ করতে পারলে মোটামুটিভাবে একটা নাটক সম্পর্কে ভাল করে ভাবতে পারা যায়’ ক থামলো।
.
আলোচনা অনেকটা আনুষ্ঠানিক নিয়মে আবর্তিত হচ্ছিল। এবারে চাকা এসে থামলো খ এর কাছে। সে শুরু করলো ‘ধন্যবাদ ক কে। অনেক কথাই চলে আসলো নাটকের পাণ্ডুলিপি সম্পর্কে। কিন্তু আমি ব্যক্তিগতভাবে কিছু ব্যাপার অনুভব করি। প্রথমত, নাটক নির্বাচনটা অবশ্যই সময়োপযোগী হতে হবে এবং নির্বাচনের সময় নাট্যকারের মানসিক দিকটা বিশে ষণ করতে হবে। আমরা সবাই নাটক করি এবং বিভিন্ন নাটক পড়ি। কিন্তু সব নাট্যকারকে অনেকেই চিনি না, তাদের ব্যক্তিগত বোধ, বিশ্বাস কি তা জানি না। যদি নাট্যকারের জীবনী সম্পর্কে ভাল ভাবে জানতাম তাহলে হয়তো আরো ভালো করে নাটকটাকে উপলব্ধি করতে পারতাম। তাই আমি ব্যক্তিগতভাবে অনুভব করি যে, একটি নাটককে ভালো করে উপলব্ধি করতে চাইলে নাট্যকারের জীবনী নিয়েও আমাদের পড়াশোনা করা উচিৎ। তাহলে অন্তত নাটকের পরিপ্রেক্ষিত ও পটভূমি সম্পর্কে পাশাপাশি নাটকের মূল থিম সম্পর্কে সঠিক ধারণা পাওয়া সম্ভব। দ্বিতীয়ত, নাটক অনুবাদ করার সময় যেন মূল আবেদনের কোন পরিবর্তন না হয়ে যায়। কেননা নাটকের মাধ্যমে নাট্যকারের মূল আবেদন দর্শকদের কাছে তুলে ধরতে হবে। আরেকটি যে বিষয় আমাদের গুরুত্ব সহকারে চিন্তা করা উচিৎ তা হলো, কোন নাটক মঞ্চস্থ করার আগে নির্দেশকের উচিৎ সহশিল্পীদের কাছে সেই নাটকটি ভাল করে বিশে ষণ করা। তাহলে অভিনেতা অভিনেত্রীরা অনেক কিছু ধারণা পায় এবং তখনই তারা নির্দিষ্ট চরিত্রটা নিজের ভেতর ফুটিয়ে তুলতে পারে সহজে। আমি আপাতত এখানে বিরতি দিচ্ছি।’
.
পুরো আলোচনায় অনেকটা অদৃশ্য শ্রোতার মত অবস্থান করা ঘ নড়ে চড়ে বসলো। খ ইতি টানতেই অনেকটা তাড়াহুড়া করেই শুরু করলো, ‘আমি একটু আগেই বলে ফেলি। যদিও এখন আমার পালা নয়। কারণ আমি দেখতে পাচ্ছি, আমার কথাগুলো সব অন্যরা আগে আগে বলে বাসি করে দিচ্ছেন।
.
কথার শুরুতে জানার পরিধির সীমাবদ্ধতার কথা অকপটে স্বীকার করছি। এতক্ষণ পর্যন্ত যে আলোচনা হলো এবং আমার যতটুকু উপলব্ধি তার উপর ভিত্তি করে মোটা দাগে যে বিষয়গুলোর কথা বলতে পারি- চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য, নাটকের পটভূমি, সময়কাল, ভাষারীতি, নাটকের মূল আবেদন বা সুর ইত্যাদি। নাটকের চরিত্রগুলোকে বোঝা মানে হলো নাটকের সংলাপে যে ইঙ্গিত পাওয়া যায় তার ভিত্তিতে পুরো চরিত্রটিকে বা মানুষটিকে কিভাবে সৃষ্টি করা যায় তার কৌশল। শরীর এবং মন দিয়ে সে চরিত্রটিকে উপলব্ধি করতে হয়। এরপর যেটা যোগ করতে চাই, সেটা হলো নাটকে আমাদের স্বাভাবিক সত্ত্বার বাইরে অন্য এক সত্ত্বাকে নিজের মধ্যে ধারণ করি অভিনয় বা চরিত্রের প্রয়োজনে। উদাহরণস্বরূপ, যদি কেউ প্রতিশোধ নাটকের ফিওডর সিগায়েফ এর ভূমিকায় অভিনয় করে তখন সে তার নিজের মুখোশটা নামিয়ে ফিওডরের মুখোশটা পরে। আসলে নামিয়েও ঠিক রাখে না, পুরোটা আসলে নামানো যায় না, মূলত অভিনেতা তার নিজের মুখোশের উপর ফিওডরের মুখোশটি চাপিয়ে দেয়। তাই আমার কাছে অভিনয় হলো পরোক্ষ অর্থে মুখোশ পরা। আর পাণ্ডুলিপির ক্ষেত্রে একটা কথা আমার মনে হয়, নির্দেশক চাইলেই সময়োপযোগীতার বিচারে পাণ্ডুলিপির কোন অংশ পরিবর্তন বা পরিমার্জন করতে পারেন। তবে এতে নাট্যকারের মূল বক্তব্য যাতে ফিকে না হয়ে যায় সেদিকেও লক্ষ্য রাখা দরকার মনে করি।’ এই পর্যন্ত এসে ঘ থামলো। এবার গ এর পালা। সে শুরু করলো।
.
আমি প্রথমেই সবাইকে ধন্যবাদ জানাই এত সুন্দর সুন্দর আলোচনা তুলে ধরার জন্য। তার পাশাপাশি বলে রাখতে চাই এসব বিষয়ে আমার জ্ঞানটা অনেক সীমিত। আমি এ বিষয় চর্চা করছি অল্প কিছুদিন ধরে। আসলে রবীন্দ্রনাথের অচলায়তন পড়ে আমি খুবই মুগ্ধ। রবীঠাকুরের লেখা পড়লেই বুঝা যায় তিনি কেন বিশ্বসেরা। অচলায়তনও তেমন একটি নাটক। তার নাটকটিতে ধর্মীয় গোঁড়ামির কথা সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে। আর ‘অচলায়তন’ নামের এই বিদ্যায়তনটি সেই ধর্মীয় গোঁড়ামির বিষয়টিই মনে করিয়ে দেয়। নাটকের মূলসুরও বোধহয় এই ধর্মীয় গোঁড়ামির বিরোধিতা। একটা ব্যাপার যেটা এই নাটকটাতে উঠে এসেছে, স্রষ্টার সাথে সৃষ্টির সম্পর্কটা কোন নিয়ম মেনে চলে না। নিয়ম মেনে কারুর আধ্যাত্মিক উৎকর্ষতাও সম্ভব নয়। যেটা দাদাঠাকুরের বেলায় সত্য আবার অচলায়তনের আচার্য, উপাধ্যায়, মহাপঞ্চককে ছাড়িয়ে সেটা সাধারণ এক ছাত্র পঞ্চকের বেলায়ও সত্য। আর তার পক্ষে এটা সম্ভব হয়েছে মূলত অচলায়তনের নিয়ম ভেঙ্গে বেরিয়ে আসতে পারার কারণে। নাটকটির আলোচনায় এই বিষয়টিও আসা উচিৎ মনে করি। আবার নাটক পড়ার সময় আমাদের লক্ষ্য রাখা উচিৎ, নাটকটির উপর বিশ্বসাহিত্যের কোন প্রভাব আছে কিনা। আরেকটি বিষয় আমি বলব, যদিও অপ্রাসঙ্গিক, তাহলো, শিল্পের জন্য শিল্পচর্চা এ বিষয়টা আমাদের বাদ দেয়া উচিৎ। প্রতিটি নাট্যকর্মীকে চিন্তা করতে হবে শিল্পচর্চার মাধ্যমে তার দর্শকের মাঝে কোন বার্তা পৌঁছে দেয়া। অনেক পরিশ্রম, অর্থ ব্যয় করে যদি এমন কোন প্রযোজনা করা হয় যা সত্যিকার অর্থে সাধারণ মানুষের কোন কাজে না লাগে বা সামাজিক কোন সমস্যা বা সম্ভাবনার কোন নির্দেশ থাকবে না, দর্শকের মনে কোন উৎসাহ বা প্রেরণা সৃষ্টি হবে না, এমন কোন প্রযোজনার আদৌ প্রয়োজন আছে বলে আমি মনে করি না।’
.
আলোচনা খুব সুন্দর ও ভাবগাম্ভীর্যের সাথে এগিয়ে যাচ্ছে। ভাবছি, এরকম আনুষ্ঠানিকতারও প্রয়োজন আছে। এমনি এমনি সবাই মিলে কত আড্ডা দিয়ে বেড়াই, অথচ এই আড্ডাতে একটা আনুষ্ঠানিকতা থাকায় কত সুন্দর সুন্দর আলোচনার সৃষ্টি হচ্ছে, আবার অনেক বিষয়ও খুব গুরুত্বের সাথে উঠে আসছে। এরই মধ্যে গ তার কাগজপত্র ঘাটতে ঘাটতে বলে উঠলো, ‘ যে কোন নাটকের পাণ্ডুলিপিতে হাত দেয়া কতটা যুক্তিসঙ্গত। নির্দেশক চাইলেই কি নাটকের স্ক্রীপ্টে হাত দিতে পারে কিনা এ ব্যাপারে প্রশ্ন থাকলো।’
.
মূল আলোচনায় এবার সব শেষ পালা ঙ এর। অনেকক্ষণ সে চুপচাপ সবার কথা শুনছিল এবং নোট করছিল কিছু কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যাই হোক, অত্যন্ত আনন্দভরা চেহারায় শুরু করলো, যেন খুব মজা পাচ্ছে সে সবার আলোচনায়। ‘ আসলে খুব ভালো লাগছে এরকম আড্ডায় বসে আলোচনা শুনতে। অনেক কথাই চলে এসেছে তাই আমি সংক্ষেপে কিছু কথা বলেই আমাদের আলোচনার দ্বিতীয় অংশে চলে যাব। একটি নাটকের পাণ্ডুলিপি বিশ্লেষণের জন্য প্রথমেই যা প্রয়োজন, তা হলো পাণ্ডুলিপির প্রাসঙ্গিকতা বিচার করা, এতেই নাটকের পটভূমি হতে শুরু করে অন্যান্য বিষয়গুলো চলে আসে। এরপর নাটকের উৎস বিচার করা, পরিণাম ও ফলাফল এবং নাটকের ভাষা নিয়ে চিন্তা করা। আমার মনে হয় এসব মাথায় রেখেই একটা পাণ্ডুলিপি হাতে নিলে চলে।
.
যাই হোক আলোচনার দ্বিতীয় অংশটা আমি ক এর কথা ধরেই শুরু করছি। একটা নাটক কি ধরণের তা বিচার করার কথা ক অনেক পরে বলেছে। কিন্তু আমি মনে করি, কি ধরণের নাটক অর্থাৎ সেটা কি রিয়ালিস্টিক, ন্যাচারালিস্টিক না থিয়েট্রিকেল অথবা অ্যাবসার্ড, সেটা সবার আগেই বিবেচনায় রাখতে হবে। তাহলে নাটকটা নিয়ে কাজ করতে অনেক সুবিধা হয়। যেমন, অচলায়তন নাটকটিতে যে শ্রীবিদ্যানিকেতন অচলায়তনের কথা বলা হচ্ছে, সে রকম কোন বিদ্যালয় আমরা বাস্তবে দেখি না, আইডিয়াটা অ্যাবসার্ড এবং রূপক, গ এর কথাই ঠিক, অচলায়তন বিদ্যালয়টি আসলে ধর্মীয় গোঁড়ামির প্রতিনিধিত্ব করে। কিন্তু সত্যিকার অর্থে আমার কাছে মনে হয় যে, তারপরেও এর মধ্যে একটা রিয়ালিস্টিক আবহ আছে। এর সেট, এর গুরু-শিষ্যদের পোষাক পরিকল্পনায় বাস্তববাদের ছোঁয়া অবশ্যই থাকা প্রয়োজন। ইওরোপিয় অ্যাবসার্ড নাটকের মতো পোশাকেও অ্যাবসার্ডিটি আসবে না। এই জায়গাতে এসে নাটকটি অ্যাবসার্ড হয়েও অ্যাবসার্ড না আবার রিয়েলিস্টিক হয়েও রিয়েলিস্টিক না। আবার কেন জানি দু’টির মিশেলও বলতে পারছিনা। আরেকটা ব্যাপার লক্ষ্য করার মতো এই নাটকে। তা হলো নামগুলো। যেমন রাজ্যের নাম স্থবিরপত্তন, রাজার নাম মন্থরগুপ্ত, বিদ্যায়তনের নাম অচলায়তন ইত্যাদি নামগুলো কিন্তু নাটকের মূল থিমকেই নির্দেশ করছে ধর্মীয় গোঁড়ামি। এর সাথে আমরা ইওরোপিয় নাটকের প্রথম দিককার যে গড়ৎধষরঃু চষধু -এর প্রচলন ছিল তার একটা মিল পাই, যেখানে চরিত্র ও পটভূমির নাম হতো মানুষের গুণ বা দোষের নামে। অর্থাৎ কোন চরিত্রের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ভাল হলে তার নাম হতো ভাল গুণের নামে, খারাপ হলে খারাপ গুণের নামে। যেমন, কোন নাটকের নায়কের নাম হয়তো ছিল গধহশরহফ বা মানবতা, তাকে আক্রমণকারী খলনায়কের নাম হতো ঈড়হভষরপঃ বা সংঘাত। এর মধ্যেই নাটকের মূল থিমের একটা সংকেত দেয়া থাকে। অচলায়তন নাটকটি অনেকটা সে রকম গড়ৎধষরঃু চষধু ধাঁচের।
.
গ এর কথাটা একটু বলি, সে নাটকের স্ক্রীপ্টে হাত দেয়া নিয়ে একটা কথা বলেছিল। আসলে নাটকের স্ক্রীপ্টে হাত দেয়া যেন তেন কথা নয়। এখানে নিরপেক্ষতার প্রসঙ্গটা চলে আসে। লেখকের মূল বক্তব্যের ব্যাপারে একশ’ ভাগ নিরপেক্ষ না থাকলে নাট্যকারের উপর অবিচার হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তবে সংলাপ, বক্তব্য এবং ভাবকে বোধগম্য করার জন্য স্ক্রীপ্টে হাত দেয়া যেতে পারে বলে আমি মনে করি। কিন্তু খেয়াল রাখতে হবে যাতে নাট্যকারের মূল দৃষ্টিভঙ্গি এবং আবেদনটা পরিবর্তন হয়ে না যায়। আর নাটকের একটা চরিত্রের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের ব্যাপারে সবাই বলেছে। আসলে একটি চরিত্রের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য কি তা নিরূপন করার চাইতে কি হওয়া উচিৎ তা বিবেচনায় রাখা দরকার।
.
খ একটা বিষয়ের অবতারণা করেছিল নাট্যকারের জীবনী জানার ব্যাপারে। আসলে আমার মনে হয়, একজন অভিনেতার সব নাটকের পাণ্ডুূলিপি বিশে ষণের জন্য নাট্যকারের জীবনী খুব বেশি জানার প্রয়োজন নেই। তবে নাটকের সাহিত্যমান বিশেষণের জন্য সেটা একটা দিক হতে পারে।’ এটুকু বলেই ঙ থামলো।
.
এবার ক শুরু করলো, ‘খ যে প্রসঙ্গটা উত্থাপন করেছে, সে প্রসঙ্গে বলি, নাটক নির্বাচনে নাট্যকারের মানসিক দিক বিচার করতে গেলে অনেকের নাটকই হয়তো গ্রহন করা যাবে না। তাই আমাদের বোধহয় একজন ব্যক্তির সৃষ্টিটা কতটুকু গ্রহনযোগ্য তা বিচার করেই নাটক নির্বাচন করা দরকার। আর গ এর কথা ধরে বলতে চাই, শিল্পের জন্যই শিল্পচর্চা করা উচিৎ বলে আমি মনে করি। দর্শকের কাছে নাটকের মাধ্যমে কোন না কোন বার্তা পৌঁছে যাবে, সেটা স্বাভাবিক। যেহেতু একদল শিল্পী নাটকের মাধ্যমে সেই বার্তা পৌঁছে দেবে, সেহেতু এখানে শৈল্পিকতার প্রয়োজন আছে। তাই এই শৈল্পিকতা তৈরীর জন্যই শিল্পচর্চা করতে হবে।’ ঙ দ্বিমত পোষণ করে বলল, ‘না, না, এটা ঠিক না। প্রত্যেক শিল্পেরই কোন না কোন উদ্দেশ্য আছে এমনটা যদি ধরে নেওয়া হয়, তাহলে এর আড়ালে মূলত শিল্পকে উদ্দেশ্যহীন করে ফেলা হয়। শিল্পের যিনি স্রষ্টা অর্থাৎ লেখক, যিনি শিল্পের বাহক অর্থাৎ শিল্পী, তাঁরাই যদি তার উদ্দেশ্যকে সঠিকভাবে বুঝতে না পারেন বা নির্দেশ করতে না পারেন বা সৃষ্টির মূহুর্তে যদি উদ্দেশ্যহীনভাবেই শিল্পের যাত্রা শুরু হয় তাহলে দর্শকের কাছে তা আর কি-ই বা বার্তা নিয়ে যাবে। শিল্পচর্চার জন্য তাই নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য থাকতে হবে। তাহলে তার যাত্রা, উৎকর্ষতার গতি একটি নির্দিষ্ট দিকে হবে, তাই না। যাই হোক, আমরা অনেকক্ষণ আলোচনা করেছি। এখন কারো যদি বিশেষ কোন কথা না থাকে তো, আমরা শেষ করতে পারি।’ সবাই আলোচনা শেষ করার প্রস্তুতি নিলাম।
.
সোনার ফসল তুলি
.
একটি নাটকের পাণ্ডুলিপি বিশে ষণ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। পাণ্ডুলিপি বিশে ষণ হতে পারে বিভিন্ন আঙ্গিকে পরিচালক, অভিনেতা, লাইট এবং সেট ডিজাইনার প্রত্যেকের বিশে ষণটা হতে হবে নিজ নিজ কর্মক্ষেত্র এবং দৃষ্টিভঙ্গিকে কেন্দ্র করে। কিন্তু সবদিক থেকে চিন্তা করলে, পাণ্ডুলিপি বিশে ষণের জন্য অবশ্যই করণীয় কিছু বিষয় পাওয়া যায়-
.
১. প্রথমেই এটি কোন ধরণের নাটক, নাটকের প্রাসঙ্গিকতা, পটভূমি ও সময়কাল বিবেচনা করা উচিৎ।
২. নাটকটির উৎস বিচার করতে হবে। তা মঞ্চায়নের জন্য সময়োপযোগী কিনা, দেখতে হবে।
৩. প্রত্যেকটি নাটকই কোন না কোন ঘটনার বর্ণনা। তাই পাণ্ডুলিপি পড়তে গেলে ঘটনার বর্ণনা ভালভাবে বিশে ষণ করতে হবে।
৪. পরিণাম বা ফলাফল সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা জন্মাতে হবে। একটি নাটকের পরিণাম পুরো নাটকের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করে দেয়।
৫. নাটকের ভাষা নিয়ে চিন্তা করা।
৬. একটি নাটকের সংলাপ পড়ে, তার আঙ্গিক থেকে সহজেই বুঝে নেয়া যায় নাটকের চরিত্র কেমন হবে। চরিত্রের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য সেখান থেকেই খুঁজে নিতে হবে।
.
নাটক মূলত কোন রাষ্ট্র, সমাজ বা জনগোষ্ঠীর অবয়ব বা আয়না। তাই নাটকের মূল আবেদনকে উপলব্ধি করতে হলে প্রয়োজন গভীর অধ্যয়ন, একই সাথে বিশেষণ। অন্যথায় ভুল বুঝার সম্ভাবনাই বেশি থাকে।
এতে সদস্যতা:
মন্তব্যসমূহ (Atom)