পৃষ্ঠাসমূহ

১ম বর্ষ লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
১ম বর্ষ লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
লোকযাত্রা  
১ম বর্ষ, ২য় সংখ্যা, ডিসেম্বর ২০০৯ 
সূচি
.
.
লিও টলস্টয়
অনুবাদঃ দ্বিজেন্দ্রলাল নাথ
ওয়াহিদ সুজন  
.
মাসউদুর রহমান 
.
রাফসান গালিব 
মঈদ উদ্দিন তৌহিদ 
.
আসবাবীর রাফসান  
.

সম্পাদকীয় ১ম বর্ষ, ২য় সংখ্যা, ডিসেম্বর ২০০৯



মানব অস্তিত্বের ‘অনন্যতা’ কী? ‘মানুষ’ যদি পশুরই এক পদের নাম বলে কেউ মনে করেন, তবে তাকে ভিন্ন অন্যদের পুঁছি, মানুষের ‘অনন্যতা’ কী? মানুষ গান গাইতে পারে, পশু পারে না; মানুষ নাটকের সংলাপ মুখস্ত বলতে পারে, পশুর মুখস্ত বিদ্যা নেই; মানুষ ছবি আঁকে, পশু আঁকে না- এই কি মানুষের অনন্যতা? মানুষের অনন্যতা হলো- সে শিল্পী, সে তার দৈনন্দিন কাজের মধ্যে শিল্প ফুটিয়ে তুলতে পারে। আর গান, নাটক, কবিতা কিংবা চিত্রকলা নিছক সেই শিল্পকে প্রকাশের বাহন বৈ ভিন্ন কিছু নয়। কিন্তু সকলেই তো স্বীয় কাজে শিল্পের প্রকাশ ঘটাতে পারেন না, কিছু কিছু মানুষ পারেন। আবার সবাই সেই শিল্পকে দেখতেও পান না। তাই শিল্পী আর সাধারণ মানুষের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। তিনি সাধারণের মধ্যে থেকেও তার দৃষ্টিভঙ্গি, চিন্তাধারা ও মননের কারণে সবার থেকে অসাধারণ। মানুষের দৈনন্দিন কাজগুলোর মধ্যে হঠাৎ হঠাৎ শিল্পের জন্ম নেয়। শিল্পীর দৃষ্টিটা কেমন? 
.
অগুনতি মাথা দেখে আমি বলি কালো 
তুমি বলো দূরে দেখো চিল  
ডানা মেলা চিল, দেখো কালো ডানা চিল 
আকাশে ভাসে চিল। 
.
শিল্পীর দৃষ্টিটা মনে হয় এ রকম। তবে অবশ্যই তা অনর্থক ব্যাঙের মধ্যে সাপের অস্তিত্ব খুঁজে দেখার দৃষ্টি নয়। সৃজনশীল কোন কিছুই অহেতুক অনর্থক হতে পারে কি? প্রশ্নটা নিজেদের জন্য করে রাখলাম। আবার মানুষের সকল সৃজনশীল কর্মকাণ্ডকে কি শিল্প বলা যায়? সিগারেট কোম্পানীর স্পন্সরে যখন আমরা মুক্ত, আমরা স্বাধীন, আমরা স্মাটর্, আমরা ধূমপান করি না টাইপের সঙ্গীত রচিত হয়, সৃজনশীলতা এবং নন্দনের মাপকাঠিতে তা যতই উৎরে যাক, তাকে ঠিক কোন অর্থে শিল্প বলা যায়? আমরা তাকে শিল্প বলতে নারাজ। একে সর্বোচ্চ একটা উৎকৃষ্ট ঠাট্টা বলা যেতে পারে।  
.
শিল্প প্রসঙ্গে আমাদের ভাবনাগুলো এভাবেই পথ খুঁজে পাচ্ছে। এ সংখ্যায় প্রকাশিত লেখাগুলো শিল্প সম্পর্কে আমাদের সিদ্ধান্তকে প্রকাশ করছে না, বরং শিল্প নিয়ে আমাদের নিরন্তর জিজ্ঞাসার যাত্রা মাত্র। লোকযাত্রার পরবর্তী সংখ্যাগুলোতেও আমাদের অনুসন্ধান অব্যাহত রাখার ইচ্ছা পোষণ করি। 
.
বিনীত 
মাসউদুর রহমান 
সাইফ শাওন 
ডিসেম্বর ২০০৯

সম্পাদকীয় ১ম বর্ষ, ১ম সংখ্যা, জুন ২০০৯



আমরা জানি যে, আমরা জানি না...  
প্রদর্শ কলা, শিল্পের দায়, আমাদের ব্রত
.
আমাদের প্রচেষ্টা যখন আমরা শুরু করেছি, ততক্ষণে বাংলাদেশের নাটকের ‘স্তর বিবর্তন’ ঘটেছে বেশ। সঙ্গীতের ধারা বিবর্তন হয়েছে। একই কথা চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রেও সত্য। এই বিবর্তন যতটা আঙ্গিক, ততটাই ভাবগত। পাশ্চাত্যের নন্দনে ও অলংকারে সজ্জিত হয়েছে আমাদের শিল্প নানাভাবে কিন্তু প্রাচ্যের প্রজ্ঞা থেকে দিনে দিনে ঠিক ততটাই যেন দূরে সরে দাঁড়িয়েছে। শিল্পের আবার প্রজ্ঞা কি? শিল্প মাত্রেরই প্রজ্ঞার সম্পর্ক থাকে। প্রদর্শ-কলা, যা শিল্পের বাহ্যিক প্রকাশ, শিল্পের প্রজ্ঞা সেই প্রকাশে যতটা সম্ভব মূর্ত হয়ে ধরা দেয়। প্রজ্ঞাহীন যে শিল্প, তার প্রকাশে, শিল্প হয় বিকৃত এবং বিক্রিত। তাহলে শিল্পের দায় কোথায় গেলো? সার্বজনীনতার নামে নির্দায় কিংবা নির্মেরু শিল্প সাময়িক ভোগের প্রয়োজন পূরণ করতে পারে কিন্তু তার সত্যিকার সার্বজনীন উপভোগ্যতা কই? আমাদের বিবেচনায় প্রদর্শ-শিল্প নির্দায় হতে পারে না। বহুদিনের বিনা ব্যবহারে ঐতিহাসিক তাত্ত্বিক যে ফাঁক এখানে সৃষ্টি হয়েছে, আমরা তা অনুভব করতে পারছি। তার অনুসন্ধানই আমাদের ব্রত। আমরা দেখেছি, সমাজের মননশীল মানুষের এক বৃহৎ অংশ অনেকতর রূপে শিল্পের ‘প্রদর্শকলা’ (Performing art)-এর যুক্তিতে নিবিষ্ট। আমাদের বিশ্বাস মানুষের মনোগ্রন্থির এই শৃঙ্খলটিকে অবজ্ঞা না করে তার কল্যাণ উপযোগ প্রশ্রয় ও পরিচর্যায় ও সভ্যতার কাম্য পরিবর্তনে ভূমিকা রাখা সম্ভব।  
.
শিল্পের জন্য শিল্পের রিফরমেশন  
.
আমরা স্বপ্ন দেখি, ঐতিহ্যকে পুনরুদ্ধারের। সেখানে নির্মাণ, বিনির্মাণ, সংগঠন, সংস্করণ, সন্ধানের মিশেলে সম্ভব হবে সভ্যতার কাম্য পরিবর্তন। আড় ভাষায় কেউ ব্যাখ্যা খুঁজতে চেষ্টা করতে পারেন। পড়ে-পড়ে, তথ্যে-তত্ত্বে দার্শনিক হয়ে উঠা ক’একজন পুঁছ করতে পারেন, “আপনাদের রিফরমেশনটা কি? তার আগে ফর্মটা কি?” আমরা নড়েচড়ে বসি। আমাদের শিল্পকে প্লেটো, ফুয়েরবাখ, র্মাক্স আর হেগেলের দর্শন দিয়ে ধর্ষণ চেষ্টায় কিছুটা বিড়ম্বিত হই। সারাদিন ঝিমিয়ে ঝিমিয়ে তথ্যসমৃদ্ধ তত্ত্ব কপচানোর পর যারা অ্যারাবিয়ান বা ইউরোপিয়ান কান্ট্রিগুলোর অনুদানের ভর্তুকির টাকার চালগুলো নিশ্চিন্তে গিলতে যান, তাদের অযোগ্য ইনফরমেটিভ থিওরীগুলোর ভেতরের অবিশুদ্ধ নিয়ত ঠাহর করি। পালকী আমাদের ঐতিহ্য, তাই রাস্তা থেকে রিক্সাগুলো তুলে দিয়ে ছয়বেহারার পালকী চালু করা উচিত কি? আমাদের ক্ষুদ্র অভিজ্ঞতা বলে যে, তত্ত্বে, তথ্যে আর বাস্তবে অনেক ফারাক। শিল্পের কোন প্রমিত আদর্শ রূপ থাকে না, বরং উৎকর্ষতা থাকে, প্রচলিত প্রদর্শ-শিল্প’র একটা রিফরমেশন প্রয়োজন এটা আমরা উপলব্ধি করি। এই রিফরমেশন ভাষায়, বিষয়ে, ভাবনায় এবং নিয়তে। ঐতিহ্য রক্ষার নামে মধ্যযুগে ফিরে যাওয়া এই শিল্পচর্চার উদ্দেশ্য নয়। তাহলে এই রিফরমেশনের স্বরূপটা কি? আগে থেকে তার কিছুই বলা যাবে না। তার কারণ এটা একটা প্রায়োগিক এবং ব্যবহারিক জায়গা। সমাজ, রাজনীতি, জনগণ, অর্থনীতি, রাষ্ট্রের কর্ণধার, ক্ষমতার বিবর্তন, ধর্ম এসব থেকে তা (রিফরমেশন) নিরাবেগ, নিস্পৃহ এবং নির্মোহ থাকবে না, এতটুকু বলতে পারি। তাই এই রিফরমেশন রেভুলুশন হতে পারে, ডিফরমেশন কিংবা ডিকনস্ট্রাকশন কিংবা অন্য কিছুও হতে পারে।  
.
নিছক শিল্পের জন্য শিল্পচর্চা আর মাঝ নদীতে মাঝিবিহীন ময়ূরপঙ্খী নৌকা এ দুইয়ের মধ্যে খুব একটা পার্থক্য নেই। রাষ্ট্র পারিপার্শ্বিকতা শিল্প জরুরী অবস্থা, ধর-পাকড়, দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল, সাজা, সাজাপ্রাপ্ত আসামীদের জামিনে বেরিয়ে আসা, বিডিআর-নাসাকার মুখোমূখী অবস্থান-সেক্টর কমান্ডারদের নিরবতা, বিদ্রোহের ছদ্মনামে সামরিক বাহিনীতে হত্যাযজ্ঞ, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়ার ধীর গতি রাষ্ট্র সংবিধান এবং ন্যায় বিচারের ঘোরতর দূর্দিনে শিল্প তার শিল্পের চর্চায় ব্যস্ত থাকে। এহেন পারিপার্শ্ব অস্পৃশ্যতা আমাদের পীড়া দেয়। কিন্তু এহেন অস্পষ্ট সময় শিল্পের আরো, আরো স্পষ্ট চেতনা দাবী করে। এ রকম ঘোর সংকটে নিছক শিল্পচর্চা আর সত্যকে পাশ কাটিয়ে যাওয়া, একই কথা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর কালে কোন রাষ্ট্রের পক্ষে অন্য কোন স্বাধীন রাষ্ট্র দখল করে উপনিবেশ স্থাপন করা সম্ভব নয়। কিন্তু কোন স্বাধীন রাষ্ট্রের উপর রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে নয়া উপনিবেশ ঠিকই সম্ভব। আমরা এখন শঙ্কিত: নতুন কোন পলাশী দরজায় কড়া নাড়ছে না তো!  
.
রাষ্ট্র শিরোনামে দুঃখজনক হলেও সত্য, আমরা আমেরিকা, ভারত কিংবা ইউরোপের না হয়ে, হয়েছি বাংলাদেশী। এ দুঃখের উৎস বাংলাদেশী হওয়ায় নয়, বরং বাংলাদেশকে ভালোবাসায়। তাই এই প্রচেষ্টা নিঃস্বার্থ নিরাবেগ নিঃশঙ্ক এবং নিঃসাহসী নয়।  
.
প্রসঙ্গঃ লোকযাত্রা  
.
আমাদের উপরোক্ত উপলব্ধি এবং তৎসঞ্জাত সক্রিয়তা কেবল আমাদের নিজেদের জন্য নয় (নব্য একটি স¤প্রদায়, পার্টি, গোষ্ঠী হিসেবে আত্মপ্রকাশ আমাদের উদ্দেশ্য নয়), এর প্রকাশ ও বিস্তার চাই আমরা সাধারণ মানুষের মধ্যে। লোকযাত্রা আমাদের এবং পাঠকের যোগাযোগ মাধ্যম। বলাবাহুল্য, লোকযাত্রা-কর্মীবৃন্দ সকলে থিয়েটার কর্মী। তাই এতে প্রকাশিত লেখাগুলো থিয়েটারের প্রতি অনিচ্ছাকৃত পক্ষপাতদুষ্ট হতে পারে। তবে লেখক-পাঠকদের সহযোগিতা আমাদের এই দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করবে।  
.
প্রসঙ্গত: লোকযাত্রা নামটি এবং Performing art এর বঙ্গানুবাদ ‘প্রদর্শ কলা’ করে দিয়েছেন কবি সৈয়দ আহমদ শামীম, তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা। নিবেদন পরিশেষে নিবেদন, আমরা কারা? যারা জানে যে, তারা জানে না আমরা তাদের নবীন সহযাত্রী।  
.
বিনীত মাসউদুর রহমান  
সাইফ শাওন


সাম্প্রতিক নাটকের একটি সমস্যা

সাম্প্রতিক নাটকের একটি সমস্যা  
ঋত্বিককুমার ঘটক  
.
একটি নাটকের কাগজ পরিচালনা করতে গিয়ে আমি নানারকম নাটকের সম্মুখীন হয়েছি। এগুলো দেখে আমার মোটামুটি ধারণা জন্মেছে নবীনরা যা করছেন, তার অধিকাংশই গজভুক্ত কপিত্থবৎ। দেশজ ঘটনাগুলোকে এঁরা সম্পূর্ণভাবে গ্রহণ এবং অনুশীলন করতে পারেন বলে আমার মনে হয়নি।  
.
এঁদের কেউ কেউ একটা ফরাসী ব্যাপার অনুসরণ করছেন, যাকে এঁরা নাম দিয়েছেন অ্যাবসার্ড ড্রামা। ব্যাপারটা ঠিক আমি বুঝে উঠতে পারি না। ফরাসীদের একটা স্বভাব আছে, বদভ্যাসই বলতে পারেন। শিল্পীরা কাজ আরম্ভ করেই একটা ম্যানিফেস্টো বের করেন। জাঁ আনউই এই অ্যাবসার্ড ড্রামা কথাটির জন্ম দিয়েছেন। এ ব্যাপারটাই আসলে অ্যাবসার্ড। স্ট্রীন্ডবের্গের এক্সপ্রেশনিস্ট ড্রামা যাঁরা পড়েছেন, তাঁরা জানেন আনউই নতুন কিছু করেননি। বেকেট সম্পর্কেও একথা প্রযোজ্য। আজকালকার ছেলেরা স্ট্রীন্ডবের্গ বা ইবসেনের শেষদিকের কাজগুলো পড়েননি বলেই মনে হয়। এখনকার আনউই আর বেকেট এঁদেরকে নিয়ে এত নাচানাচি তা হলে হত না।  
.
আসলে ঘটনাটা হচ্ছে, আমাদের অধিকাংশ সা¤প্রতিক নাটকে মানব জীবন থেকে দূরে সরে যাওয়ার একটা ব্যাপার ঘটছে। প্রতিটি শিল্পীর কাছে মানুষের সঙ্গে ওতপ্রোত হয়ে যাবার একটা প্রশ্ন আছে। সেই জায়গা থেকে বিচ্যুত হলে পরে নানা কিসিমের উদ্ভট জিনিসের ব্যবস্থা করতে হয়, যাতে করে সস্তায় কিস্তিমাত করা যায়। আমাদের তরুণদের অনেকে তাই করছেন। বাংলাদেশে এখন দুটো দিকের ব্যাপার ঘটছে। একদিকে আমাদের গ্রামীন জীবনযাত্রা প্রচণ্ডভাবে বদলানের জন্য সি. আই. এ.-এর টাকা; আর-এক দিকে কিছু সৎ মানুষ সৎ উদ্দেশ্য নিয়ে কিছু চেষ্টাচরিত্তির করছেন কিন্তু তাঁদের ক্ষমতা নেই। সত্যিই ঘটনাটা গুলিয়ে গেছে। নজরুলের ভাষায় বলতে হয়, “দে গরুর গা ধুইয়ে।” ব্যাপারটা হয়েছে তাই। কিন্তু কথা হচ্ছে, দেশ এগোচ্ছে। নতুন শিশুদের জন্ম হচ্ছে এবং তারা নতুন জগৎ দেখছে। তাদের সম্বন্ধে তাদের বোধগম্য ভাষায় কথা বলতে হবে। আজকের বাংলাদেশের যে দুঃখ-দুর্দশা আমরা মাঠে ঘাটে দেখি, সেটি কলকাতা শহরে বসে অনুভব করা সম্ভব নয়। তাকে ভাষা দেওয়ার একটা প্রশ্ন আছে। সেই ভাষা ফুটিয়ে তোলার পক্ষে মঞ্চ হচ্ছে সবচেয়ে সহজ রাস্তা। সেখানে নিছক অনুবাদ আর অনুকরণ আর অনুসরণ দিয়ে নিছক মানুষের মন ভোলানো চোখ ধাঁধাঁনো পাপ বিশেষ। আজকের তরুণ নাট্যকাররা এই কথাটি যেন দয়া করে মনে রাখেন। আমার দেশ প্রচণ্ড দেশ। এদেশের মানুষের তুলনা নেই। এদের দেখলে প্রাণের মধ্য থেকে আমার ভালোবাসা উথলে ওঠে। সাধারণ গ্রামীণ মানুষ, তাদেরকে যখন আমি খাটতে দেখি আমার মন তখন ভালোবাসায় উদবেল হয়ে ওঠে।  
.
এঁদের জীবনযাত্রাকে প্রকট করার কি কোনো রাস্তাই পাওয়া যাবে না? তাহলে আমরা কীসের শিল্পী? শিল্পী বলে গৌরব করার আমাদের কী আছে? আমরা কী করেছি? কিছু করতে পারিনি। নাটক একটা অত্যন্ত শক্তিশালী মাধ্যম। তার মধ্য দিয়ে আমরা অনেক কথা বলতে পারতাম। পারিনি।  
.
আমি নিজে স্বীকার করছি যে আমার যেটুকু করণীয় ছিল তা আমি করে উঠিনি। অনেক হারিয়েছে। কিন্তু তরুণরা, যাঁরা দাবী করেন নাটকের ব্যাপারে খুব কিছু একটা করছেন তাঁরা কি একবারও গোটা ব্যাপারটাকে ভেবে দেখবেন না? দেশের মানুষকে ছেড়ে তাঁরা কেন এইসব আজেবাজে টেকনিকের মধ্যে ঢুকলেন (টেকনিক সম্পর্কে অবশ্য এঁদের অনেকেই কিছু বোঝেন না)। কেন এঁদের অনেকেই শুধু মন ভোলানো চোখ ধাঁধাঁনো নাটক করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন? এই তরুনদের মধ্যে সত্যিই কি মেরুদণ্ডশালী কেউ নেই যিনি সত্যিকারের কাজের কাজ করতে পারেন? দেখুন, সব শিল্পই শেষে গিয়ে পৌঁছয় কবিতাতে। এবং সে কবিতা হয় মেহনতি মানুষের দুঃখ-দুর্দশার ঘামে ভেজা কবিতা। এ ছাড়া কোনো শিল্পের শেষ অবধি টেঁকার কোনো ব্যাপার থাকে না, কোনোদিন থাকেনি। বলতে দুঃখ হচ্ছে যে এই পোড়া বাংলা দেশে এইসব বহু পুরাতন কথা আজ আমাকেই আবার বলতে হচ্ছে। কিন্তু কথাটা হচ্ছে, এই কথাগুলো আজ আবার বেশ চেঁচিয়ে বলা দরকার।  
.
রবীন্দ্রনাথের ভাষায়, “মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারানো পাপ।” আমিও মানুষকে অবিশ্বাস করার মতো অবস্থায় পৌঁছইনি। আমি জানি এই শিশু, এই ছেলেপুলে, এই তরুণদের মধ্য থেকেই আবার মানুষ উঠবে এবং বাংলা দেশকে তারাই আবার তুলে ধরবে। এদের ওপরই ভরসা। এরাই নাটককে কোন নতুন দিকে মোড় ফেরাবে। এরাই সেই ব্যাপারটা করে ফেলবে, যেটা আমরা এখনো ধরতেও পারছি না। এদের ভরসাতেই আশা করা যায়। ১৯৫১ সালে সাংবাদিক হিসেবে কলকাতা শহরে এক মাসে মোট ৩৬টি আত্মহত্যার ঘটনা আমাকে রিপোর্ট করতে হয়েছিল। কিন্তু ব্যাপারটা নিয়ে নাটক না লেখা পর্যন্ত আমার নিজের জ্বালা মিটল না। ব্যাপারটা কি? মৃত্যুর পর ৬টি চরিত্র একটা কাল্পনিক জায়গায় মিলিত হয়েছে। তারা কথাবার্তা বলে বুঝল সংসারে ছেলেপিলেরা তো আছে। ও আত্মহত্যা-ফত্যা কোনো কাজের কথা নয়, কোনো পথ নয়। তখন পৃথিবীতে তারা খবর পাঠাল যে, ‘সবাই বাঁয়ে হঠো।’  
.
ঋত্বিক কুমার ঘটক, চলচ্চিত্রকার হিসেবে যাঁর পরিচিতি, অবস্থান অতি উচ্চে। কিন্তু ভারতীয় গণ-নাট্য আন্দোলনের তিনি ছিলেন প্রধান ব্যক্তিত্ব। এই আন্দোলনের মূলনীতির খসড়াও তিনি তৈরী করেন। সমকালীন তরুণ প্রজন্মের নাট্যচেতনা নিয়ে লেখা তাঁর এই প্রবন্ধটি আজও সমকালীনতা হারায়নি। তাই তা পুনর্মুদ্রণ করা হলো।

অচলায়তনে পাণ্ডুলিপির সচল আড্ডা

অচলায়তনে পাণ্ডুলিপির সচল আড্ডা  
গত সেপ্টেম্বরের এক বিকালে আই আর এ টি কার্যালয়ে ‘নাটকের পাণ্ডুলিপি বিশেষণ’ শীর্ষক একটি আড্ডা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে উপস্থিত ছিলেন রাফসান গালিব, সাইফ শাওন, মাহফুজুর রহমান, মঈদ উদ্দীন তৌহিদ ও মাসউদুর রহমান। সেই আড্ডার উপর ভিত্তি করে এ লেখাটি লিখেছেন সাইফ শাওন
.
রোজামুখে উদরশূন্য আলোচনা শিল্পীর কাছে শিল্পচর্চা করা হলো নেশা। আর এই নেশা পূরণের জন্য সে যে কোন ত্যাগ স্বীকার করতে প্রস্তুত থাকে। এই উপলব্ধি যার ভেতর আসে হয়তো সে-ই হলো প্রকৃত শিল্পী। কিন্তু সবাই কি প্রকৃত শিল্পী হতে পারে? কেউ শিল্পচর্চাকে বেছে নিয়েছে বিলাসিতার অন্যতম মাধ্যম হিসেবে। তার কাছে শিল্পচর্চা হলো এক প্রকারের বিলাসিতা। বর্তমানে শিল্পচর্চা হলো কারো কাছে পেশাদারিত্বের, কারো কাছে সময় কাটানোর মাধ্যম। তাই এই বাজারে সৃজনশীল কিছু চিন্তা করাটা হাস্যকর ব্যাপার... এ রকম কিছু আলাপ আলোচনার মধ্য দিয়েই আমরা ক’জন উপলব্ধি করলাম আমরা শিল্প, বিশেষতঃ ‘প্রদর্শ’ শিল্প নিয়ে আড্ডা দেবো।
.
আমাদের বিবেচনায় একজন আদর্শ থিয়েটার কর্মীকে অনেক যোগ্যতার অধিকারী হতে হয়। এর মধ্যে অতি গুরুত্বপূর্ণ হলো স্ক্রীপ্ট বিশে ষণের যোগ্যতা। এই বিশেষণ যতটা ব্যাকরণ নির্ভর তার চেয়ে বেশী সৃজনশীল। যেহেতু আমরা সবাই থিয়েটার কর্মী তাই এ বিষয়েই আমাদের প্রথম আড্ডাটা আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেয়া হলো। আলোচনার সুবিধার্থে আমরা হাতে নিলাম দু’টি স্ক্রীপ্ট। একটি হলো রবীন্দ্রনাথের‘অচলায়তন’ এবং অন্যটি আন্তন চেখভের ‘প্রতিশোধ’। আমরা ঠিক করলাম আজ এই স্ক্রীপ্টগুলো পড়বো আর আলোচনা করবো। তবে যেহেতু রোজার মাস সেহেতু ইফতারটা একসাথেই করতে হয়। তাই ঠিক হলো প্রত্যেকে চাঁদা দিয়ে ইফতারের আয়োজন হবে (যদিও চাঁদা আদায় করতে অনেক কষ্ট হয়েছিল)।
.
যাই হোক, শুরু হলো অচলায়তন পড়া। সবাই পড়ছে খুব মনোযোগ দিয়ে। চার দেয়ালে বদ্ধ ঘরটাতে অল্প সময়ের মধ্যেই গভীর নিরবতা নেমে এলো। কিছুক্ষণের জন্য পাঁচজন মানুষ যেন একান্ত একাকী ‘স্থবিরপত্তন’ রাজ্যের শ্রীবিদ্যানিকেতন ‘অচলায়তন’-এ ধ্যানমগ্ন হলাম। দাদাঠাকুরের সাথে পাহাড়ে, দর্ভকপল ীতে ঘুরে বেড়াতে লাগলাম...  

এ সময় এক কাপ চা হলে মন্দ হতো না,’ ঙ নিরবতা ভাঙলো। কথাটা শুনে মনে পড়লো এতক্ষণ আমরা পাঁচজন একসাথে একটা রুমে আছি। গ বেচারা খুব মনোযোগ দিয়ে পড়ছিল, তাই অভিমানের সুরে বলে উঠলো, ‘নিরবতাটা ভালোই উপভোগ করছিলাম’। ‘আমরা মনে হয় এবার আলোচনা শুরু করতে পারি’- খ এর প্রস্তাবে সমর্থন দিয়ে ঙ বলল, ‘হ্যাঁ, ক কে দিয়েই শুরু করা যাক। তবে তার আগে একটু বলে নিই, আমরা আমাদের আজকের আলোচনাকে দুই ভাগে ভাগ করবো। প্রথম অংশে আমরা সবাই যার যার আলোচনা উপস্থাপন করবো এবং দ্বিতীয় অংশে তর্ক-বিতর্ক এবং একে অন্যের আলোচনা নিয়ে কথা বলবো।’ 
.
পরীক্ষাগারে পাণ্ডুলিপির ব্যবচ্ছেদ শুরু 
.
ক শুরু করল ‘আসলে আমি অতটা পড়–য়া মানুষ নই। তারপরও যতটুকু উপলব্ধি করি তা হলো পাণ্ডুলিপি বিশে ষণের জন্য একটি নাটকের পটভূমি জানাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমাদেরকে জানতে হবে একটি নাটকের সময়কাল। প্রতিটি নাটকই কোন না কোন ঘটনার বর্ণনা। তাই নাটকের পটভূমি জানতে পারলে তার ঘটনা বোঝাটা অনেক সহজ হয়ে যায়। তবে পটভূমি জানার চাইতে ‘উপলব্ধি’ করা জরুরি। যেমনঅচলায়তন নাটকটি এমন একটি পটভূমিতে রচিত যার অস্তিত্ব রবীন্দ্রনাথের কল্পনারাজ্যে, দেখে, অভিজ্ঞতা নিয়ে যা জানা সম্ভব নয় কিন্তু উপলব্ধি করা সম্ভব। নাটকটির পটভূমি এমন এক বিদ্যায়তনে যে বিদ্যায়তন সব দিক থেকে আবদ্ধ, বাইরের বাতাসও যেখানে ঢুকতে দেয়া হয় না। আবার প্রতিশোধ নাটকটি রুশ পটভূমিতে ঊণবিংশ শতকের সময়কালকে প্রতিনিধিত্ব করে, বই ঘেঁটে, পড়াশোনা করে সেই সময়কাল ও পটভূমিকে জানা সম্ভব। এরপর দেখতে হবে নাটকটি কোন ভাষায় রচিত। অর্থাৎ নাটকের ভাষা কেমন। তা আঞ্চলিক হতে পারে আবার শুদ্ধ বাংলায়ও হতে পারে। তারপর চরিত্র নিয়ে ভাবতে হবে। এছাড়াও নাটকটি ঠিক কি ধরণের নাটক সে বিষয়টি বিবেচনায় রাখতে হবে। এভাবে খণ্ড খণ্ড ভাবে একটা পাণ্ডুলিপি নিয়ে কাজ করতে পারলে মোটামুটিভাবে একটা নাটক সম্পর্কে ভাল করে ভাবতে পারা যায়’ ক থামলো। 
.
আলোচনা অনেকটা আনুষ্ঠানিক নিয়মে আবর্তিত হচ্ছিল। এবারে চাকা এসে থামলো খ এর কাছে। সে শুরু করলো ‘ধন্যবাদ ক কে। অনেক কথাই চলে আসলো নাটকের পাণ্ডুলিপি সম্পর্কে। কিন্তু আমি ব্যক্তিগতভাবে কিছু ব্যাপার অনুভব করি। প্রথমত, নাটক নির্বাচনটা অবশ্যই সময়োপযোগী হতে হবে এবং নির্বাচনের সময় নাট্যকারের মানসিক দিকটা বিশে ষণ করতে হবে। আমরা সবাই নাটক করি এবং বিভিন্ন নাটক পড়ি। কিন্তু সব নাট্যকারকে অনেকেই চিনি না, তাদের ব্যক্তিগত বোধ, বিশ্বাস কি তা জানি না। যদি নাট্যকারের জীবনী সম্পর্কে ভাল ভাবে জানতাম তাহলে হয়তো আরো ভালো করে নাটকটাকে উপলব্ধি করতে পারতাম। তাই আমি ব্যক্তিগতভাবে অনুভব করি যে, একটি নাটককে ভালো করে উপলব্ধি করতে চাইলে নাট্যকারের জীবনী নিয়েও আমাদের পড়াশোনা করা উচিৎ। তাহলে অন্তত নাটকের পরিপ্রেক্ষিত ও পটভূমি সম্পর্কে পাশাপাশি নাটকের মূল থিম সম্পর্কে সঠিক ধারণা পাওয়া সম্ভব। দ্বিতীয়ত, নাটক অনুবাদ করার সময় যেন মূল আবেদনের কোন পরিবর্তন না হয়ে যায়। কেননা নাটকের মাধ্যমে নাট্যকারের মূল আবেদন দর্শকদের কাছে তুলে ধরতে হবে। আরেকটি যে বিষয় আমাদের গুরুত্ব সহকারে চিন্তা করা উচিৎ তা হলো, কোন নাটক মঞ্চস্থ করার আগে নির্দেশকের উচিৎ সহশিল্পীদের কাছে সেই নাটকটি ভাল করে বিশে ষণ করা। তাহলে অভিনেতা অভিনেত্রীরা অনেক কিছু ধারণা পায় এবং তখনই তারা নির্দিষ্ট চরিত্রটা নিজের ভেতর ফুটিয়ে তুলতে পারে সহজে। আমি আপাতত এখানে বিরতি দিচ্ছি।’ 
.
পুরো আলোচনায় অনেকটা অদৃশ্য শ্রোতার মত অবস্থান করা ঘ নড়ে চড়ে বসলো। খ ইতি টানতেই অনেকটা তাড়াহুড়া করেই শুরু করলো, ‘আমি একটু আগেই বলে ফেলি। যদিও এখন আমার পালা নয়। কারণ আমি দেখতে পাচ্ছি, আমার কথাগুলো সব অন্যরা আগে আগে বলে বাসি করে দিচ্ছেন। 
.
কথার শুরুতে জানার পরিধির সীমাবদ্ধতার কথা অকপটে স্বীকার করছি। এতক্ষণ পর্যন্ত যে আলোচনা হলো এবং আমার যতটুকু উপলব্ধি তার উপর ভিত্তি করে মোটা দাগে যে বিষয়গুলোর কথা বলতে পারি- চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য, নাটকের পটভূমি, সময়কাল, ভাষারীতি, নাটকের মূল আবেদন বা সুর ইত্যাদি। নাটকের চরিত্রগুলোকে বোঝা মানে হলো নাটকের সংলাপে যে ইঙ্গিত পাওয়া যায় তার ভিত্তিতে পুরো চরিত্রটিকে বা মানুষটিকে কিভাবে সৃষ্টি করা যায় তার কৌশল। শরীর এবং মন দিয়ে সে চরিত্রটিকে উপলব্ধি করতে হয়। এরপর যেটা যোগ করতে চাই, সেটা হলো নাটকে আমাদের স্বাভাবিক সত্ত্বার বাইরে অন্য এক সত্ত্বাকে নিজের মধ্যে ধারণ করি অভিনয় বা চরিত্রের প্রয়োজনে। উদাহরণস্বরূপ, যদি কেউ প্রতিশোধ নাটকের ফিওডর সিগায়েফ এর ভূমিকায় অভিনয় করে তখন সে তার নিজের মুখোশটা নামিয়ে ফিওডরের মুখোশটা পরে। আসলে নামিয়েও ঠিক রাখে না, পুরোটা আসলে নামানো যায় না, মূলত অভিনেতা তার নিজের মুখোশের উপর ফিওডরের মুখোশটি চাপিয়ে দেয়। তাই আমার কাছে অভিনয় হলো পরোক্ষ অর্থে মুখোশ পরা। আর পাণ্ডুলিপির ক্ষেত্রে একটা কথা আমার মনে হয়, নির্দেশক চাইলেই সময়োপযোগীতার বিচারে পাণ্ডুলিপির কোন অংশ পরিবর্তন বা পরিমার্জন করতে পারেন। তবে এতে নাট্যকারের মূল বক্তব্য যাতে ফিকে না হয়ে যায় সেদিকেও লক্ষ্য রাখা দরকার মনে করি।’ এই পর্যন্ত এসে ঘ থামলো। এবার গ এর পালা। সে শুরু করলো। 
.
আমি প্রথমেই সবাইকে ধন্যবাদ জানাই এত সুন্দর সুন্দর আলোচনা তুলে ধরার জন্য। তার পাশাপাশি বলে রাখতে চাই এসব বিষয়ে আমার জ্ঞানটা অনেক সীমিত। আমি এ বিষয় চর্চা করছি অল্প কিছুদিন ধরে। আসলে রবীন্দ্রনাথের অচলায়তন পড়ে আমি খুবই মুগ্ধ। রবীঠাকুরের লেখা পড়লেই বুঝা যায় তিনি কেন বিশ্বসেরা। অচলায়তনও তেমন একটি নাটক। তার নাটকটিতে ধর্মীয় গোঁড়ামির কথা সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে। আর ‘অচলায়তন’ নামের এই বিদ্যায়তনটি সেই ধর্মীয় গোঁড়ামির বিষয়টিই মনে করিয়ে দেয়। নাটকের মূলসুরও বোধহয় এই ধর্মীয় গোঁড়ামির বিরোধিতা। একটা ব্যাপার যেটা এই নাটকটাতে উঠে এসেছে, স্রষ্টার সাথে সৃষ্টির সম্পর্কটা কোন নিয়ম মেনে চলে না। নিয়ম মেনে কারুর আধ্যাত্মিক উৎকর্ষতাও সম্ভব নয়। যেটা দাদাঠাকুরের বেলায় সত্য আবার অচলায়তনের আচার্য, উপাধ্যায়, মহাপঞ্চককে ছাড়িয়ে সেটা সাধারণ এক ছাত্র পঞ্চকের বেলায়ও সত্য। আর তার পক্ষে এটা সম্ভব হয়েছে মূলত অচলায়তনের নিয়ম ভেঙ্গে বেরিয়ে আসতে পারার কারণে। নাটকটির আলোচনায় এই বিষয়টিও আসা উচিৎ মনে করি। আবার নাটক পড়ার সময় আমাদের লক্ষ্য রাখা উচিৎ, নাটকটির উপর বিশ্বসাহিত্যের কোন প্রভাব আছে কিনা। আরেকটি বিষয় আমি বলব, যদিও অপ্রাসঙ্গিক, তাহলো, শিল্পের জন্য শিল্পচর্চা এ বিষয়টা আমাদের বাদ দেয়া উচিৎ। প্রতিটি নাট্যকর্মীকে চিন্তা করতে হবে শিল্পচর্চার মাধ্যমে তার দর্শকের মাঝে কোন বার্তা পৌঁছে দেয়া। অনেক পরিশ্রম, অর্থ ব্যয় করে যদি এমন কোন প্রযোজনা করা হয় যা সত্যিকার অর্থে সাধারণ মানুষের কোন কাজে না লাগে বা সামাজিক কোন সমস্যা বা সম্ভাবনার কোন নির্দেশ থাকবে না, দর্শকের মনে কোন উৎসাহ বা প্রেরণা সৃষ্টি হবে না, এমন কোন প্রযোজনার আদৌ প্রয়োজন আছে বলে আমি মনে করি না।’ 
.
আলোচনা খুব সুন্দর ও ভাবগাম্ভীর্যের সাথে এগিয়ে যাচ্ছে। ভাবছি, এরকম আনুষ্ঠানিকতারও প্রয়োজন আছে। এমনি এমনি সবাই মিলে কত আড্ডা দিয়ে বেড়াই, অথচ এই আড্ডাতে একটা আনুষ্ঠানিকতা থাকায় কত সুন্দর সুন্দর আলোচনার সৃষ্টি হচ্ছে, আবার অনেক বিষয়ও খুব গুরুত্বের সাথে উঠে আসছে। এরই মধ্যে গ তার কাগজপত্র ঘাটতে ঘাটতে বলে উঠলো, ‘ যে কোন নাটকের পাণ্ডুলিপিতে হাত দেয়া কতটা যুক্তিসঙ্গত। নির্দেশক চাইলেই কি নাটকের স্ক্রীপ্টে হাত দিতে পারে কিনা এ ব্যাপারে প্রশ্ন থাকলো।’ 
.
মূল আলোচনায় এবার সব শেষ পালা ঙ এর। অনেকক্ষণ সে চুপচাপ সবার কথা শুনছিল এবং নোট করছিল কিছু কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যাই হোক, অত্যন্ত আনন্দভরা চেহারায় শুরু করলো, যেন খুব মজা পাচ্ছে সে সবার আলোচনায়। ‘ আসলে খুব ভালো লাগছে এরকম আড্ডায় বসে আলোচনা শুনতে। অনেক কথাই চলে এসেছে তাই আমি সংক্ষেপে কিছু কথা বলেই আমাদের আলোচনার দ্বিতীয় অংশে চলে যাব। একটি নাটকের পাণ্ডুলিপি বিশ্লেষণের জন্য প্রথমেই যা প্রয়োজন, তা হলো পাণ্ডুলিপির প্রাসঙ্গিকতা বিচার করা, এতেই নাটকের পটভূমি হতে শুরু করে অন্যান্য বিষয়গুলো চলে আসে। এরপর নাটকের উৎস বিচার করা, পরিণাম ও ফলাফল এবং নাটকের ভাষা নিয়ে চিন্তা করা। আমার মনে হয় এসব মাথায় রেখেই একটা পাণ্ডুলিপি হাতে নিলে চলে। 
.
যাই হোক আলোচনার দ্বিতীয় অংশটা আমি ক এর কথা ধরেই শুরু করছি। একটা নাটক কি ধরণের তা বিচার করার কথা ক অনেক পরে বলেছে। কিন্তু আমি মনে করি, কি ধরণের নাটক অর্থাৎ সেটা কি রিয়ালিস্টিক, ন্যাচারালিস্টিক না থিয়েট্রিকেল অথবা অ্যাবসার্ড, সেটা সবার আগেই বিবেচনায় রাখতে হবে। তাহলে নাটকটা নিয়ে কাজ করতে অনেক সুবিধা হয়। যেমন, অচলায়তন নাটকটিতে যে শ্রীবিদ্যানিকেতন অচলায়তনের কথা বলা হচ্ছে, সে রকম কোন বিদ্যালয় আমরা বাস্তবে দেখি না, আইডিয়াটা অ্যাবসার্ড এবং রূপক, গ এর কথাই ঠিক, অচলায়তন বিদ্যালয়টি আসলে ধর্মীয় গোঁড়ামির প্রতিনিধিত্ব করে। কিন্তু সত্যিকার অর্থে আমার কাছে মনে হয় যে, তারপরেও এর মধ্যে একটা রিয়ালিস্টিক আবহ আছে। এর সেট, এর গুরু-শিষ্যদের পোষাক পরিকল্পনায় বাস্তববাদের ছোঁয়া অবশ্যই থাকা প্রয়োজন। ইওরোপিয় অ্যাবসার্ড নাটকের মতো পোশাকেও অ্যাবসার্ডিটি আসবে না। এই জায়গাতে এসে নাটকটি অ্যাবসার্ড হয়েও অ্যাবসার্ড না আবার রিয়েলিস্টিক হয়েও রিয়েলিস্টিক না। আবার কেন জানি দু’টির মিশেলও বলতে পারছিনা। আরেকটা ব্যাপার লক্ষ্য করার মতো এই নাটকে। তা হলো নামগুলো। যেমন রাজ্যের নাম স্থবিরপত্তন, রাজার নাম মন্থরগুপ্ত, বিদ্যায়তনের নাম অচলায়তন ইত্যাদি নামগুলো কিন্তু নাটকের মূল থিমকেই নির্দেশ করছে ধর্মীয় গোঁড়ামি। এর সাথে আমরা ইওরোপিয় নাটকের প্রথম দিককার যে গড়ৎধষরঃু চষধু -এর প্রচলন ছিল তার একটা মিল পাই, যেখানে চরিত্র ও পটভূমির নাম হতো মানুষের গুণ বা দোষের নামে। অর্থাৎ কোন চরিত্রের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ভাল হলে তার নাম হতো ভাল গুণের নামে, খারাপ হলে খারাপ গুণের নামে। যেমন, কোন নাটকের নায়কের নাম হয়তো ছিল গধহশরহফ বা মানবতা, তাকে আক্রমণকারী খলনায়কের নাম হতো ঈড়হভষরপঃ বা সংঘাত। এর মধ্যেই নাটকের মূল থিমের একটা সংকেত দেয়া থাকে। অচলায়তন নাটকটি অনেকটা সে রকম গড়ৎধষরঃু চষধু ধাঁচের। 
.
গ এর কথাটা একটু বলি, সে নাটকের স্ক্রীপ্টে হাত দেয়া নিয়ে একটা কথা বলেছিল। আসলে নাটকের স্ক্রীপ্টে হাত দেয়া যেন তেন কথা নয়। এখানে নিরপেক্ষতার প্রসঙ্গটা চলে আসে। লেখকের মূল বক্তব্যের ব্যাপারে একশ’ ভাগ নিরপেক্ষ না থাকলে নাট্যকারের উপর অবিচার হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তবে সংলাপ, বক্তব্য এবং ভাবকে বোধগম্য করার জন্য স্ক্রীপ্টে হাত দেয়া যেতে পারে বলে আমি মনে করি। কিন্তু খেয়াল রাখতে হবে যাতে নাট্যকারের মূল দৃষ্টিভঙ্গি এবং আবেদনটা পরিবর্তন হয়ে না যায়। আর নাটকের একটা চরিত্রের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের ব্যাপারে সবাই বলেছে। আসলে একটি চরিত্রের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য কি তা নিরূপন করার চাইতে কি হওয়া উচিৎ তা বিবেচনায় রাখা দরকার। 
.
খ একটা বিষয়ের অবতারণা করেছিল নাট্যকারের জীবনী জানার ব্যাপারে। আসলে আমার মনে হয়, একজন অভিনেতার সব নাটকের পাণ্ডুূলিপি বিশে ষণের জন্য নাট্যকারের জীবনী খুব বেশি জানার প্রয়োজন নেই। তবে নাটকের সাহিত্যমান বিশেষণের জন্য সেটা একটা দিক হতে পারে।’ এটুকু বলেই ঙ থামলো। 
.
এবার ক শুরু করলো, ‘খ যে প্রসঙ্গটা উত্থাপন করেছে, সে প্রসঙ্গে বলি, নাটক নির্বাচনে নাট্যকারের মানসিক দিক বিচার করতে গেলে অনেকের নাটকই হয়তো গ্রহন করা যাবে না। তাই আমাদের বোধহয় একজন ব্যক্তির সৃষ্টিটা কতটুকু গ্রহনযোগ্য তা বিচার করেই নাটক নির্বাচন করা দরকার। আর গ এর কথা ধরে বলতে চাই, শিল্পের জন্যই শিল্পচর্চা করা উচিৎ বলে আমি মনে করি। দর্শকের কাছে নাটকের মাধ্যমে কোন না কোন বার্তা পৌঁছে যাবে, সেটা স্বাভাবিক। যেহেতু একদল শিল্পী নাটকের মাধ্যমে সেই বার্তা পৌঁছে দেবে, সেহেতু এখানে শৈল্পিকতার প্রয়োজন আছে। তাই এই শৈল্পিকতা তৈরীর জন্যই শিল্পচর্চা করতে হবে।’ ঙ দ্বিমত পোষণ করে বলল, ‘না, না, এটা ঠিক না। প্রত্যেক শিল্পেরই কোন না কোন উদ্দেশ্য আছে এমনটা যদি ধরে নেওয়া হয়, তাহলে এর আড়ালে মূলত শিল্পকে উদ্দেশ্যহীন করে ফেলা হয়। শিল্পের যিনি স্রষ্টা অর্থাৎ লেখক, যিনি শিল্পের বাহক অর্থাৎ শিল্পী, তাঁরাই যদি তার উদ্দেশ্যকে সঠিকভাবে বুঝতে না পারেন বা নির্দেশ করতে না পারেন বা সৃষ্টির মূহুর্তে যদি উদ্দেশ্যহীনভাবেই শিল্পের যাত্রা শুরু হয় তাহলে দর্শকের কাছে তা আর কি-ই বা বার্তা নিয়ে যাবে। শিল্পচর্চার জন্য তাই নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য থাকতে হবে। তাহলে তার যাত্রা, উৎকর্ষতার গতি একটি নির্দিষ্ট দিকে হবে, তাই না। যাই হোক, আমরা অনেকক্ষণ আলোচনা করেছি। এখন কারো যদি বিশেষ কোন কথা না থাকে তো, আমরা শেষ করতে পারি।’ সবাই আলোচনা শেষ করার প্রস্তুতি নিলাম। 
.
সোনার ফসল তুলি 
.
একটি নাটকের পাণ্ডুলিপি বিশে ষণ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। পাণ্ডুলিপি বিশে ষণ হতে পারে বিভিন্ন আঙ্গিকে পরিচালক, অভিনেতা, লাইট এবং সেট ডিজাইনার প্রত্যেকের বিশে ষণটা হতে হবে নিজ নিজ কর্মক্ষেত্র এবং দৃষ্টিভঙ্গিকে কেন্দ্র করে। কিন্তু সবদিক থেকে চিন্তা করলে, পাণ্ডুলিপি বিশে ষণের জন্য অবশ্যই করণীয় কিছু বিষয় পাওয়া যায়- 
.
১. প্রথমেই এটি কোন ধরণের নাটক, নাটকের প্রাসঙ্গিকতা, পটভূমি ও সময়কাল বিবেচনা করা উচিৎ।  
২. নাটকটির উৎস বিচার করতে হবে। তা মঞ্চায়নের জন্য সময়োপযোগী কিনা, দেখতে হবে।  
৩. প্রত্যেকটি নাটকই কোন না কোন ঘটনার বর্ণনা। তাই পাণ্ডুলিপি পড়তে গেলে ঘটনার বর্ণনা ভালভাবে বিশে ষণ করতে হবে।  
৪. পরিণাম বা ফলাফল সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা জন্মাতে হবে। একটি নাটকের পরিণাম পুরো নাটকের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করে দেয়।  
৫. নাটকের ভাষা নিয়ে চিন্তা করা।  
৬. একটি নাটকের সংলাপ পড়ে, তার আঙ্গিক থেকে সহজেই বুঝে নেয়া যায় নাটকের চরিত্র কেমন হবে। চরিত্রের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য সেখান থেকেই খুঁজে নিতে হবে। 
.
নাটক মূলত কোন রাষ্ট্র, সমাজ বা জনগোষ্ঠীর অবয়ব বা আয়না। তাই নাটকের মূল আবেদনকে উপলব্ধি করতে হলে প্রয়োজন গভীর অধ্যয়ন, একই সাথে বিশেষণ। অন্যথায় ভুল বুঝার সম্ভাবনাই বেশি থাকে।

বাংলাদেশের নাটক : ক্ষুদ্রের পর্যবেক্ষণ

বাংলাদেশের নাটক : ক্ষুদ্রের পর্যবেক্ষণ  
রাফসান গালিব .
সত্যকে প্রতিনিধিত্ব করার একটি বিশেষ ক্ষমতা নাটকের আছে। আর তাই সত্যকে আঁকড়ে ধরেই সমাজের প্রতি সৃষ্টি হয়েছে তার বিশেষ দায়বদ্ধতা। তাই নাটকে সেই আদিকাল থেকে কোন না কোনভাবে সমাজের কথা গণমানুষের কথা উঠে আসে। কখনো সখনো উঠে আসে সমাজের শ্রেণীবৈষম্যের কথা। কোথাও গৌণভাবে, কোথাও মূখ্যভাবে। বিভিন্ন সময় বিভিন্নভাবে যেমন- রাজা-প্রজা, ধনী-গরীব, জমিদার-কৃষক, মালিক-শ্রমিক, প্রভু-দাস এমনকি নারী-পুরুষ ইত্যাদি প্রসঙ্গ চলে আসে খুব অনায়াসেই। তাই গণমানুষের কথা, তাদের ন্যায্য পাওনার কথা, তাদের সুবিধা-অসুবিধার কথা, অন্যায়-অত্যাচার, সেই সাথে প্রতিরোধের কথাও ঘুরে ফিরে ধরা দেয় পৃথিবীর নাট্যমঞ্চে। আমরা যদি উপমহাদেশের বিভিন্ন জাতি উপজাতি ও তাদের রাজনৈতিক সাংস্কৃতিক ইতিহাস পর্যালোচনা করি তাহলে দেখা যায়, ব্রিটিশের দুঃশাসন, নবাবী প্রতিরোধ, সিপাহী আন্দোলন, ফরায়েজী ও ফকীর আন্দোলন, স্বদেশী আন্দোলন তারপরে দেশভাগ এসব পরিস্থিতিই আমাদের ইতিহাসের জীবন্ত কিছু মূহুর্ত। যদিও এসব ঘটনার পেছনে অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছিল ভৌগলিক, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কারণসমূহ। কিন্তু মূলভিত্তি ছিল অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং কিছুটা জাতীয়তা ও 
সা¤প্রদায়িকতাবোধ। যা আরো পরে গণমানুষের প্রাণের আন্দোলন- স্বাধীনতা আন্দোলনে রূপ নেয়। .
বাংলাদেশে স্বল্প পরিসরে গড়ে উঠা নাট্য আন্দোলনের ইতিহাসও গণমানুষের এই ঘটনাবহুল ইতিহাসের প্রভাব সম্পূর্ণরূপে এড়িয়ে যেতে পারেনি। কারণ ইতিহাসের ঘটনা পরম্পরায় নাটকের আঙ্গিক এবং বিষয়বস্তুর পরিবর্তন লক্ষণীয়। ব্রিটিশ ভারতে কলকাতাকেন্দ্রিক হেরেশিম লেবেদেফ প্রবর্তিত নাটক আর ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের উত্তাল সময়ের নাটকের বিষয়বস্তুতে ফারাক বিস্তর। কারণ আমরা দেখি যে, এ সময় ইংরেজ সরকার কর্তৃক নাটক নিয়ন্ত্রন আইন নামক কালা কানুনটি তৈরী হয়। .
কিন্তু সমকালীন নাট্যচর্চা আমাদের কি দেখাচ্ছে? মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময়, বিশেষ করে ৮০/৯০-এর দশকে রাজনৈতিক আন্দোলনের পট পরিবর্তিত হওয়ার সাথে সাথে পরিবর্তন আসে দেশের নাট্য আন্দোলনের মেজাজেও। রাজনৈতিক চিন্তাধারার বিভক্তির সাথে সাথে নাট্য আন্দোলনের মুক্তচিন্তায়ও পার্থক্য পরিলক্ষিত হয় এ সময়। যার কারণে মঞ্চে ম্রিয়মান হয়ে পড়ে আমাদের জাতীয় পরিচয়ের শেকড় সন্ধানের বা শেকড় আঁকড়ে ধরার চেষ্টা। ম্রিয়মান হয়ে পড়ে সমাজ পরিবর্তনের আশা আকাঙ্খা। মূলতঃ এ সময় থেকে আমাদের নাট্যমঞ্চগুলো অনেকটা দখল হয়ে যায় বিদেশী সাহিত্যের অনুবাদ নাটক দ্বারা, যাদের ঐতিহ্য সংস্কৃতির সাথে এদেশের মানুষ খুব একটা পরিচিত নয় (সেলিম আল দীন, মমতাজউদ্দিন আহমদকে এ হিসেবের বাইরে রাখতে হবে)। তাছাড়া অধিকাংশ নাটকের অনুবাদ, ভাবানুবাদের জটিলতার কারণে দর্শকরা নাটকের বিষয়বস্তু বুঝতে গিয়ে হিমশিম খেয়ে যায়। এতে কিন্তু নাটক গণ-সম্পৃক্ততা হারিয়ে ফেলছে। চিন্তা করুন, ঢাকার জনসংখ্যা এক কোটি ছাড়িয়ে গেছে অনেক আগেই, সে হিসেবে পাঁচ হাজার নিয়মিত দর্শক পাওয়া যাবে না, গ্র“পগুলোতে প্রচুর সেলিব্রেটি/তারকা সদস্যের উপস্থিতি সত্ত্বেও। ঢাকার বাইরের কথা আপাতত হিসেবের মধ্যে না আনলাম। কিন্তু পরিসংখ্যান যদি এরূপ হয় তাহলে নাট্য আন্দোলনও বা এগিয়ে যাবে কিভাবে? আপামর জনসাধারণের ধ্যান-ধারণা বাদ দিয়ে কোন আন্দোলন এগিয়ে যেতে পারে না। তাছাড়া আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, নাট্য ‘আন্দোলন’ও কিন্তু এক ধরণের রাজনৈতিক আন্দোলন। .
নব্বই দশকের শেষ এবং শূন্য দশকের শুরুর সময়টায় বাংলাদেশের মিডিয়াতে একটা যুগান্তকারী পরিবর্তন সাধিত হয়। কিছু বহুজাতিক কোম্পানীর আগমন এবং তাদের পৃষ্ঠ-পোষকতায় জাতির কৃষ্টি-কালচারের ধারক বাহক হয়ে ওঠে এই সব মিডিয়া। মঞ্চকর্মীরা অধিকতর ঝুঁকে পড়ে সেদিকে, সেই সাথে দর্শকরাও। যার কারণে এক সময় যে সকল সংস্কৃতি ও নাট্যবোদ্ধারা দেশের গণমানুষের চিন্তায় বিভোর থাকতেন, তারা মঞ্চকে পেছনে ফেলে মিডিয়ার দিকে ছুটেছে এবং গণমানুষের চিন্তাবহনকারীরা পরিণত হয়েছে উচ্চবিত্ত শ্রেণীতে। দুঃখজনক এবং হতাশাব্যাঞ্জক হলো, একই কথা অন্যান্য শিল্পের বেলায়ও প্রযোজ্য। এর প্রভাব আমাদের নাট্যান্দোলনেও পড়েছে ব্যাপকভাবে। সমাজের নিম্ন এবং মধ্যবিত্তদের কথা, তাদের সুবিধা-অসুবিধা কিংবা দাবীর কথা, সরাসরি এখন আর আসে না আমাদের নাট্যমঞ্চগুলোতে। বরং নাটক হয়ে পড়েছে সমাজের বিত্তশালীদের এন্টারটেইনমেন্টের বিষয়। .
এই যদি হয় সমকালীন নাট্যচর্চা, তাহলে যে কারণে এখনো নাট্য ‘আন্দোলনের’ কথা বলা হয়ে থাকে, বিভিন্ন উৎসব অনুষ্ঠানে অন্ধকারের বিরুদ্ধে আলোর জয়গান গেয়ে যে সব শ্লোগান আমরা পাই, তা কিসের জন্য বা কোন বিশেষ লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য?

সংগীত অথবা অকূল সমুদ্দুরে অবগাহন




সংগীত অথবা অকূল সমুদ্দুরে অবগাহ

ওয়াহিদ সুজন 

.

আমরা যখন কোনকিছু বলি-অর্থবোধকই বলি। যাতে অপরকে নিজের ভাব বুঝাতে পারি। শুধু তাই নয়, নিজের ভেতর সে অর্থের প্রতি এক ধরণের তাড়না থাকে। অর্থ মূলতঃ নির্দেশনামূলক। এই নির্দেশনা কোন ঘটনাকারে উপস্থিত হয়, যা একাধারে বস্তুকেন্দ্রিক আবার অনুভূতির সাথেও জড়িত। যখন আপনি কিছু বললেন, তা ধ্বনি আকারে অপরের কানে পৌঁছায়। তা বিশিষ্ট দ্যোতনা তৈরী করে। যেমন- আনন্দ। এর যে অর্থবোধকতা, রহস্যময় মনে হতে পারে, কেননা বস্তু আকারে এর নির্দেশনাটি কি? এই শব্দটি উচ্চারণের সাথে সাথে আপনার মনে উৎফুল তার যে ভাব আসে তা ভাষায় বা বস্তু দিয়ে দেখানোর নয়। এই হলো শব্দ ও অনুভূতির নিজস্ব সম্পর্ক। কোন নাম শুধু নিছক নামই নয়, অনুভূতির বাহকও, যার ব্যাপকতা অনির্ণীয়। এর চেয়ে আরো গুঢ় উদাহরণ হলো সংগীত। যদি বলেন সংগীত, মনে হবে অদৃশ্য কোন সুতোয় টান পড়ল বুঝি। হৃদয়তন্ত্রীতে সে টান কম্পন তৈরী করে- যার অনুরণন ঘটে সমগ্র সত্ত্বায়। 

.

মানুষকে দার্শনিক বা যুক্তিগ্রাহ্যরূপে বুঝাতে গেলে তার বুদ্ধিমত্তা বা কুশলতার কথা বলা হয়। একে স্বীকার করে নিতে হয়। কিস্তু মানুষের নান্দনিকতার কথায় আসলে সংগীতের কোন বিকল্প নাই। শিল্পের মধ্যে সংগীতের স্থান সবার উপরে। এতে যুক্তি বুদ্ধি মতা আছে বটে, তা আবার নতুন যুক্তিবোধ ও প্রকরণের স্থানে চলে আসে। যা নিয়মের ভেতর থেকে নিয়মের লঙ্ঘনও বটে। বুঝতে হবে এটাই সৃজনশীলতার ধরণ। আবার ব্যক্তির সংগীত রুচি থেকেও ব্যক্তি সম্পর্কে ধারণা করা যায়। ব্যক্তির বুদ্ধিবৃত্তির সাথে তার সংগীত রুচির সবিশেষ সম্পর্ক আছে। অথবা এই সম্পর্কে তার বলার কিছু আছে। একমাত্র সংগীতই সার্বজনীন শিল্প। বোধ করি সংগীত মানুষের বাইরের সাথে সাথে ভেতরকার কথা বলে দেয়। প্রতিটি মানুষই নিজেকে প্রকাশে ভাষা সংকটে ভুগে, পরম ভাষার অনুসন্ধান করে। জগতকে জানার বুঝার যে আকুলতা তাও এই ভেতর বাইরের সম্পর্ককে বুঝার বিষয়। এ অর্থে, সংগীত ভেতরকার সঙ্গতিও বটে। মানুষে মানুষে যোগাযোগে আমরা যদি নির্দেশনামূলক কোন কিছুর কথা না বলতে চাই - একমাত্র সংগীতই সার্বজনীন হয়ে উঠে। সে হিসেবে তার অবদান দেশ-কাল উর্ধ্বে। আমরা যখন কোন মহৎ কম্পোজিশন বা গান শুনি, তা আপনার মাঝে যে অনুভূতি এনে দেয়, দেখা যাবে শত মাইল দূরের একজনের ভেতরও কাছকাছি অনুভূতি তৈরী করে। কেন? 

.
সংগীতের অন্তর্নিহিত শক্তি যা অকৃত্রিম প্রাকৃতিক এবঙ মহাজাগতিক। মিথলজিতে, এমনকী ধর্মের ক্ষেত্রে সংগীতকে মানবকূল এবঙ প্রকৃতি জগতের সম্পর্কের যোগসূত্রের জায়গায় দেখানো হয়। প্রাকৃতিক জগতে ছড়িয়ে আছে সুরের বৈচিত্র্য লীলা। পাখির কলতান, ঝর্ণার কলকল ধ্বনি অথবা বাতাসে বৃক্ষের দুলুনীতে সকল কিছুতে পাওয়া যাবে সংগীতের সাতসুর। তার মানে এই নয় যে, সংগীতকে এত সহজে ব্যাখ্যা করা চলে, তারপরও ক্ষুদ্রজ্ঞান এবঙ মুগ্ধতার স্থান হতে কিছু কথা বলার চেষ্টা মাত্র। কেনই বা এই অপচেষ্টা করতে হয়!
.
সার্বিকভাবে, মানুষের যে কোন সৃজনীই মহৎ সৃজনী। সকল সৃজনীতে সুক্ষ্মতার ছাপ থাকে। তার অপরাপর কর্মের চেয়ে গুনগতভাবে একেবারে পৃথক। এবং অনুভূতির গভীরতম স্থানে এর অধিষ্ঠান। যদি মানুষের সকল ক্রিয়াশীলতাকে মোটা দাগে বিবেচনা করা হয়, তাহলে সৃজনীশক্তির প্রকাশ এবঙ বিকাশ সম্ভব নয়। আমরা প্রকৃতির ভেতর হতে যে সুর সম্ভার অনুভব করি না কেন, তাকে ধারণ করা বা লালন করা সহজ বিষয় নয়। 
.
একে শুধুমাত্র বিদ্যমান অপরাপর ঘটনা বা কার্যকারণ পরম্পরারূপে দেখলে চলে না। মানুষের মতো শিল্প নিজেও নানামাত্রায় বিকাশমান, যা মানুষের হাতে হওয়া না হওয়ার উপর নির্ভর করে না। মানুষ হলো অফুরন্ত সম্ভাবনার স্বার। সে সম্ভাবনাকে অনুধাবন করে বেড়ে উঠে অথবা যথার্থ হয়ে উঠে যথার্থ মানুষ। আরো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নিদেন পক্ষে তার সৃজনী শক্তির ক্ষেত্রে - যা তার অন্তর্নিহিত নয়, সে হয়তো তার সম্পর্কে চিন্তা করতে পারে, বুঝতে পারে কিন্তু ধারণ করতে পারে না। সংগীত যদি তার ভেতরকার বিষয় না হয়- সে হয়তো চর্চা করতে পারবে কিন্তু একে লালন বা এর সৃজনী বুঝতে অক্ষম। মানব অনুভূতির মধ্যে প্রধানতম হলো দুঃখবোধ, বিরহ। সংগীতের চেয়ে আর কে আছে যে এতো নিখুঁতভাবে এই বোধগুলোকে ফুটিয়ে তুলতে পারে। শুধু দুঃখবোধই নয় মানুষের অপরাপর অনুভূতিগুলোকেও সে সুক্ষ্মভাবে ধারণ করে। আরো, মনে রাখা দরকার সংগীত শুধুমাত্র বিশেষ অনুভূতিকে প্রকাশ করে তা-ই নয়, সে আমাদের অনুভূতিকে জাগিয়ে তোলে, শাণিত করে, নিরাময় গুণধারী এবঙ বাস্তব জগতের বিষয়। আকাশের অসীমতা, সাগরের বিশালতা, পাখির উড়ে যাওয়া, ঋতু পরিবর্তন, বিশেষ কোন লগ্ন সকল কিছুই এর মাধ্যমে প্রকাশ করা যায়।
.
একেবারে জাগতিক ঘটনাকারে সংগীত আমাদের সামনে বিপুল শক্তি সামর্থ্য নিয়ে হাজির হয়। আমাদের শ্রমের সাথে ঘামের সাথে। মাটি যেমন সোনা ফলায়, তেমনি মাটি থেকেই উঠে আসে মাটির গন্ধ মাখা সংগীত। এটাকে নিছক জাগতিক বললে ভুল বিবেচনার সুযোগ থাকে। কেননা আধ্যাত্মিক দ্যোতনা ছাড়া সংগীত সম্ভব না। জাগতিক অর্থে এ জন্য যে, এটা সরাসরি আমাদের কায়িক জীবনকে প্রভাবিত করে, সহজ করে তোলে। ফর্মের দিক হতে এদের উচ্চাঙ্গিকতাকে আলাদা করা যায় না। শুধুমাত্র অলৌকিক খোলস পড়ালেই সে মহৎ হয়ে উঠে না অথবা শ্রেণীগত চেতনায় ব্যাখ্যা করলে সংগীতকে তার নিখাদ স্থান হতে বিচ্যুত করা হয়। কারণ, ইতিহাসের উত্থান-পতন, মানব সভ্যতার ক্রমিক পরিবর্তনের ভেতর দিয়েও সংগীতকে উঠে আসতে হয়েছে। তাই এটি শুধুমাত্র অবসরের আনন্দ বিনোদনই নয়, সেই মানুষের এই মানুষ হয়ে উঠার স্বাক্ষী ও বটে। 
.
ভাব প্রকাশে সংগীতের অবদান সার্বজনীন। এই সার্বজনীনতা মানুষে মানুষে, মানুষের সাথে প্রকৃতি, মানূষের সাথে অধিসত্ত্বার যোগাযোগ। মানুষ যখন নিজের স্বরূপ অন্বেষণ করে, তখন সে যাকে দেখে, সে আসলে অপর। মানুষের গূঢ়তম, প্রাজ্ঞ এবঙ জটিল অনুভুতি। আমরা দেখি সংগীত কত সহজে এই অনুভূতি প্রেমে বিরহে মূর্ত করে তোলে। এইসব সম্পর্কের স্বরূপ নির্ণয়ে জগতের প্রায় সকল ধর্মে, দর্শনে সংগীতের দেখা মেলে। 
.
মানবসত্ত্বার সাথে অধিসত্ত্বার যে সম্পর্ক- মানুষের জগতে তার সব' চে’ মূর্তরূপগুলো আমরা পাই কাব্য এবঙ সংগীতে। কেউ কেউ বলে থাকেন, সেটাই সব' চে’ ভালো কবিতা যা গান হয়ে উঠতে পারে। সূফী সাধনায়, বাউল গানে, গীর্জার প্রার্থনা সংগীত সহজ উদাহরণ। মানুষ সত্ত্বা হিসেবে একই সাথে ইতিহাসে এবঙ অনৈতিহাসে, একই সাথে বস্তুরূপে আবার চিন্তারূপে। মানূষের এই দ্বৈতরূপ তার নিজের ভেতর পরম মানব আবার পরম সত্ত্বাকেও অনুসন্ধান করে। এই যে অনুসন্ধান তা কালে কালে সংগীতে প্রকাশিত হয়েছে। ভেদের মাঝে অভেদ, রূপের মাঝে অরূপ। 
.
সংগীতের সাথে নিখুঁত পরিমান জ্ঞান জড়িত। তাল লয় মাত্রার যে ধারণা- তা পুরোপুরি গাণিতিক। প্রাকৃতিক বিজ্ঞানে নিখুঁত জ্ঞানের জায়গাটা গণিতের দখলে। গণিতই বার বার একই ফলোৎপাদন করতে পারে। তাছাড়া সকল বিজ্ঞানের ব্যবহারিক বিন্যাস ঘটে গণিতের সাহায্যে। যখন কোন স্বরলিপি তৈরী করা হয়, তা প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের মতোই গণিতের সাথে সঙ্গতি রা করে। যার মধ্যে একচুল এদিক ওদিক হলে পুরো প্রক্রিয়াটা মূল লাইন থেকে বিচ্যুত হয়। উদ্দেশ্যবাদীতা বা অন্য কোন নির্দেশনার দিক হতে অথবা প্রাকৃতিক বিজ্ঞানে জগতকে দেখি আভ্যন্তরীণ সঙ্গতির নিপুণ বিন্যাসে। তেমনি সংগীত বরাবরই এমন কিছুর কথা বলে যায়। আবার তাল লয়ের যে ফর্ম তাকে ভেঙ্গে চুরে অসাধারণ সব কম্পোজিশন তৈরী হয়, যা আসলে নতুন নতুন গাণিতিক বিন্যাস। 
.
মানুষের যে কোন সৃজনীশক্তি তার প্রকৃতিগত। এখানে আরোপিত কিছু থাকে না। যদি কিছু আরোপ করা হয় মূল মতারই বিকৃতি ঘটে। শৈশবে সংগীত প্রতিভার স্ফুরণ ঘটে। সে আমাদের বাউল গানই হোক আর পাশ্চাত্যের মোজার্টের কথা আসুক। কিন্তু শুধু ব্যক্তির একার ঘটনা নয়, বরঙ সামষ্টিক দ্যোতনা বহমান। মানুষের নিজের যে কোন ক্ষমতার অনুধাবন, জানা, বুঝা, মূল্যায়ন, বিকাশ এবঙ অপরের সাথে ভাগ করে নেয়া পবিত্র দায়িত্ব। সংগীতের সুধা যদি মর্ত্যে ইন্দ্রজাল তৈরীর মতা রাখে তবে সে অপরকে এর থেকে বঞ্চিত রাখবে কেন? 
.
সংগীতকে জানা বুঝা অনুশীলন এবঙ এর সমঝদার হওয়া সদগুণের বিষয় বটে। সংগীত একাগ্র সাধনার বিষয়। সাধনার ভেতর দিয়েই স্থান করে নিতে হয়। চর্চা এবঙ সাধনার ভেতর দিয়ে এক একটি সিঁড়ি অতিক্রম করা আর এক একটি দরোজা খুলে যাওয়া। সাধনার মাধ্যমে কোন কলাকে সুক্ষ্মাতিসুক্ষ্ম অনুধাবন করা যায়। অর্থাৎ নির্দিষ্ট কিছুর মর্মে পৌঁছা। এর নিজের ভেতরের শক্তি হিসেবে অনুভব করা এবঙ এর সাথে একজন মানুষের বেঁচে থাকার স্বার্থকতা, প্রকৃতির মতাকে উপলব্ধির বিশাল যজ্ঞ ভর করে। একজন প্রকৃত কৃষক যে মাঠে ফসল ফলায়, সে আসলে অন্য সকলের মতো নয়। তার জীবনবোধ ঐ ফসলের জীবনচক্রের সাথে জড়িয়ে যায়, তার কাছে ঐ ফসলের মাঠ, ফসল হয়ে উঠে জীবন্ত সত্ত্বা, যার সাথে নিজের-সকলের সুখ দুঃখ ভাগ করে নেয়া যায়। একজন সংগীত সাধকের সংগীত এভাবেই জীবন্তরূপে হাজির। যা নানা কাল চক্রে নানা রূপে আবির্ভূত হয়। তাই সংগীত নিছকই শিল্পের জন্য শিল্প নয়, দুনিয়াবী ভেদ-অভেদ, ঘাত-প্রতিঘাত, পরিবর্তনের দৃষ্টান্ত। আমাদের বুঝতে হবে কেন মানুষ সংগীতের টানে ঘর ছাড়ে। পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে, অনেক ধর্ম সাধক সংগীতের মধ্য দিয়ে তাঁর সাধনা করে গেছেন। 
.
সংগীতের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত আছে বিনয় ভাব। সাধককে বিনয়ী হতে হয়, তাহলে সংগীত স্বমহিমায় তার কাছে ধরা পড়ে। (এখানে ভুল বুঝার কোন সুযোগ নাই, সংগীত আল্লাহ প্রদত্ত) বিনয় ছাড়া কোন শাস্ত্রেই প্রকৃত জ্ঞান অর্জন সম্ভব নয়। যদি আপনি কোন কিছুর মর্মে পৌঁছাতে চান, তবে আপনাকে বিনয়ী হতে হবে। বিনয়ই কোন কিছুকে বোধগম্য করে, এটা সাধনার অংশ। এমনকি আপনার অযোগ্যতা কখনো কখনো বিনয় ভাবের কারণে যোগ্যতার স্তরে উন্নীত হয়। সকল কিছুর মতো ভেদজ্ঞান সংগীতের মধ্যেও ক্রিয়াশীল। যদি বিনয়ে অনর্থ ঘটে, তখন ফারাকগুলো আপনি বুঝতে পারবেন না অর্থাৎ অর্থের চেয়ে অনর্থই বেশী। 
.
সাধনা, বিনয় এ শব্দ দু’টি আমাদের সহজ উপসংহারে পৌঁছে দেয়, গুরু ছাড়া কোন বিদ্যা অর্জনই হয় না। পথ চলার জন্য পথপ্রদর্শকের প্রয়োজন। জ্ঞানের সোপান গুরুই চিনিয়ে দেবেন। গুরু ছাড়া সংগীতের সাগরে অবগাহন সম্ভব নয়। যে কোন দেশ যে কোন কালে গুরুই আপনাকে পথ দেখাবে। আমরা সবাই কথা বলতে পারি, তার ভেতর স্বরবর্ণ ব্যঞ্জনবর্ণ সকলই আছে, তারপরও কি বর্ণমালা নিজে নিজে আয়ত্ব করার বিষয়? গুরু শিষ্যের পরম্পরায় সংগীতের মহান কীর্তিগুলো আমরা দেখি। এতক্ষণ যা হলো, এগুলো বাইরের কথা, ভেতরকার কথা ধ্যানে গিয়ে বুঝতে হবে। নতুবা আপনি এমন কিছুর কল্পনা করুন যার মধ্যে কোন সঙ্গতি খুঁজে পাবেন না। যেখানে প্রত্যেকে বিচ্ছিন্ন বিচ্ছিন্ন দ্বীপে বসবাস করেন, কেউ কারো ভাষা বুঝেন না

ক্রেডিট ১ম বর্ষ, ১ম সংখ্যা, জুন ২০০৯

সম্পাদক। মাসউদুর রহমান

সাইফ শাওন

প্রচ্ছদ। মোহাম্মদ তোয়াহা লোগো। মাসউদুর রহমান

প্রকাশক। আই আর এ টি - এর পক্ষে

কাজী মোঃ ইসমাঈল

যোগাযোগ। আই আর এ টি, ২৯ কাতালগঞ্জ (তৃতীয় তলা), পাঁচলাইশ, চট্টগ্রাম।

মোবাইল। ০১১৯৫১৮৪২২৯, ০১৯১৪০৭৮১২৫

Email: lokoyatra@gmail.co

Blog: http://lokoyatra.blogspot.com